২০২৬ সালের পরিকল্পনা সফলভাবে করবে যেভাবে
নতুন বছর শুরু হলো। নতুন লক্ষ্য ঠিক করা বা নতুন কিছু শুরু করার এটিই সবচেয়ে ভালো সময়। নিজের জীবনে পরিবর্তন আনার জন্য এটি দারুণ একটি সুযোগ। কিন্তু অনেকেই বছরের প্রথম ২-৩ মাস লক্ষ্য ধরে রাখে, তারপর আবার ছেড়ে দেয়।
মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে দেখলে এই হঠাৎ পাওয়া মোটিভেশন আসলে সাময়িক ভালো লাগা। এতে মনে হয় আমরা কিছু করছি। কিছু সময়ের জন্য লক্ষ্যচ্যুত হয়ে যাওয়া স্বাভাবিক। সবার সঙ্গেই কোনো না কোনো সময় এমন হয়। কিন্তু এবার অন্তত নিজের লক্ষ্য ধরে রাখাকে গুরুত্ব দাও।
সেটি কীভাবে সম্ভব? শুধু মোটিভেশনের ওপর ভরসা না করে নিজের ইচ্ছাগুলোকে শৃঙ্খলায় (ডিসিপ্লিন) বদলে ফেললে তুমি ঠিক পথে এগোবে। এ লেখায় এমন সহজ কিছু উপায় বলা আছে, যেগুলো মানলে তুমি নিজের লক্ষ্য পূরণ করতে পারবে। তোমার একটুও ক্লান্ত লাগবে না।
ওয়ান পার্সেন্ট রুল
এই নিয়ম ‘ওয়ান পারসেন্ট এভরিডে’ রুল নামেও পরিচিত। এ নিয়মের মূল কথা হলো, যা কিছুই ঘটুক না কেন, প্রতিদিন তোমাকে তোমার লক্ষ্য পূরণের জন্য ১ শতাংশ চেষ্টা করতে হবে। সেটা হতে পারে প্রতিদিন একটি বাক্য হলেও তোমার হোমওয়ার্ক খাতায় লেখা। এতে তুমি একটু একটু করে প্রতিদিনই তোমার লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাবে।
আমি বলব, যখনই পারো প্রতিদিন চেষ্টা আরও বাড়িয়ে দাও। কিন্তু যে দিনগুলোতে তোমার সত্যিই ক্লান্ত লাগে, তখন চেষ্টার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে এই ওয়ান পারসেন্ট রুল বেশ কাজে আসে। কারণ, মোটেও কোনো চেষ্টা না করার চেয়ে একটু হলেও করা উপকারী। এই নিয়ম অনুসরণ করলে নিজের লক্ষ্যে স্থির থাকার ক্ষেত্রে তুমি কিছু অগ্রগতি দেখতে পাবে।
ভিশন বোর্ড
ভিশন বোর্ডের ট্রেন্ড হয়তো তুমি তোমার পেজ অথবা ইউটিউব ফিডে দেখেছ। এটি কিন্তু সত্যিই কাজ করে। এই বোর্ডগুলো তৈরি করা শুধু মজারই নয়। এগুলো তোমার মনকে পুরো বছরের জন্য একধরনের দিকনির্দেশনা দেয়।
ভিশন বোর্ডের ছবিগুলো দিয়ে মনে মনে একটি চেক লিস্ট তৈরি করে নাও। এটি তোমাকে লক্ষ্যগুলো অর্জনে সাহায্য করবে। ভিশন বোর্ড প্রিন্ট করে তোমার পড়ার টেবিলের সামনে রাখতে পারো। চাইলে তোমার ফোন বা ল্যাপটপের ব্যাকগ্রাউন্ডেও ভিশন বোর্ড তৈরি করতে পারো।
বছরের শেষ নাগাদ, তুমি দেখতে পাবে যে তুমি যা কিছু অর্জনের আশা করেছিলে, তার বেশির ভাগই অর্জন করতে পেরেছ। কোনো লক্ষ্য হয়তো পুরোপুরি অর্জন করতে না-ও পারো। যতটুকু পারবে ততটুকুই তোমাকে লক্ষ্য পূরণের পথে কয়েক ধাপ এগিয়ে নেবে। মনে রাখবে, মোটে না আগানোর চেয়ে কিছুটা আগানোও ভালো। কিছুটা এগিয়ে যাওয়াও প্রমাণ করে যে তুমি একদিন লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারো।
বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ করা
আমি তোমাকে নিরুৎসাহিত করছি না। আমি বলতে চাইছি না যে তুমি যা চাও, তা তুমি অর্জন করতে পারবে না। খুব সম্ভবত তুমি আসলেই পারবে। যাহোক, যে লক্ষ্য পূরণ করতে বছরের পর বছর লেগে যায়, তা এক বছরে পূরণ করার পরিকল্পনা করা অনুচিত। একটি সফল বছরের শুরু এভাবে হবে না।
যেমন অনেকের লক্ষ্য বিলিয়নিয়ার হওয়া। এটা হওয়াও সম্ভব। কিন্তু কিশোর বয়সে তোমার এক বছরের মধ্যে বিলিয়নিয়ার হওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা উচিত নয়। বরং বড় হয়ে বিলিয়নিয়ার হওয়ার জন্য কিছু কাজকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। বিলিয়নিয়ার হওয়ার লক্ষ্যটিকেই ছোট ছোট লক্ষ্যে ভাগ করে ফেল। যেমন কোন বিষয়ে ক্যারিয়ার গড়লে তুমি বিলিয়নিয়ার হতে পারবে, সেটি খুঁজে বের করো। অথবা কয়েক বছরের মাথায় বিলিয়নিয়ার হতে বছরে কত আয় করতে হবে, সেটি নির্ণয় করো এবং সেই অনুযায়ী কাজ করতে থাকো।
ভবিষ্যতে ধনী হতে হলে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে হবে। সেটা হলো, কিছু পুরোনো অভ্যাস পাল্টে নতুন ভালো অভ্যাস গড়ে তোলা। তোমার লক্ষ্য বা স্বপ্ন যা–ই হোক না কেন, সেগুলোর সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারলে তুমি ভেতর থেকে ভালো মানুষ হয়ে উঠবে। এতে তোমার ব্যক্তিত্বের উন্নতি হবে।
তখন তুমি যা পেয়েছ, সেটার মূল্য বুঝবে এবং কৃতজ্ঞ হতে শিখবে।
আর যদি নিজের কাজের পাশাপাশি অন্যদের সাহায্য করো, তাহলে জীবনের ছোট ছোট জিনিসের মধ্যেও সুখ খুঁজে পাবে।
স্মার্ট লক্ষ্য
এই পরামর্শগুলো স্মার্ট লক্ষ্য ধারণার সঙ্গে মিলিয়ে তৈরি করা হয়েছে।
স্মার্ট মানে হলো লক্ষ্য হতে হবে স্পষ্ট, পরিমাপযোগ্য, বাস্তবসম্মত, প্রাসঙ্গিক ও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পূরণযোগ্য। এভাবে লক্ষ্য ঠিক করলে নিজের জীবনে ভালো পরিবর্তন আনা সহজ হয়।
স্পষ্টতা
লক্ষ্যটা পরিষ্কার হতে হবে—তুমি ঠিক কী অর্জন করতে চাও। এতে বোঝা যায়, তুমি কোন দিকে এগোচ্ছ।
যেমন ‘আমি জীববিজ্ঞানে এ প্লাস পেতে চাই।’
পরিমাপযোগ্য
লক্ষ্য পূরণে তুমি কী কী করবে, তা স্পষ্টভাবে জানা দরকার। এতে তুমি ঠিক পথে থাকবে এবং নিজের দায়িত্ব বুঝতে পারবে।
যেমন, আমি সব অ্যাসাইনমেন্ট সময়মতো করব এবং প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট পড়াশোনা করব।
বাস্তবসম্মত
লক্ষ্য এমন হতে হবে, যা সত্যিই করা সম্ভব। অবাস্তব লক্ষ্য নির্ধারণ করলে হতাশা আসে।
যেমন সপ্তাহে ২ ঘণ্টা কাজ করে এক রাতেই এক হাজার ডলার আয় করা সম্ভব নয়। বরং কয়েক সপ্তাহ বা মাস ধরে বেশি শিফটে কাজ করে টাকা জমানো বাস্তবসম্মত লক্ষ্য।
প্রাসঙ্গিক
লক্ষ্যটি তোমার বর্তমান উদ্দেশ্যের সঙ্গে মিলতে হবে।
যদি তুমি ফিটনেস বাড়াতে চাও, তাহলে ভ্রমণ নিয়ে অনেক লক্ষ্য ঠিক না করে স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া ও নিয়মিত ব্যায়ামের লক্ষ্য ঠিক করা ভালো।
সময় ঠিক করা
লক্ষ্যের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় থাকতে হবে। এতে তুমি গুরুত্বসহকারে কাজ করো।
যেমন, এক বছরে বিশ্বজুড়ে ব্যবসা ছড়ানো কঠিন, কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নির্দিষ্ট পরিমাণ লাভ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা বেশি বাস্তবসম্মত।
ওপরের টিপস অনুসরণ করলে তুমি নিজেকে বেশি কষ্ট না দিয়েই বছরের লক্ষ্যগুলো পূরণ করতে পারবে। কিশোর বয়সে অন্যদের সঙ্গে নিজেকে তুলনা করলে মন খারাপ হয়, বিশেষ করে বন্ধুদের সাফল্য দেখলে।
কিন্তু মনে রাখতে হবে, এটা তোমার নিজের জীবন, তোমার নিজের গল্প। অন্যরা কী করছে তা দেখে নিজেকে ছোট ভাবার দরকার নেই। তোমার একমাত্র তুলনা হওয়া উচিত গতকালের নিজের সঙ্গে।
আজ থেকে একটু হলেও ভালো হওয়ার চেষ্টা করো। ধরো ১ শতাংশ। ভবিষ্যতে তুমি নিজেই এ জন্য নিজেকে ধন্যবাদ দেবে।
সূত্র: দ্য টিন ম্যাগাজিন ডটকম