কিছু বিজ্ঞানী কেন মনে করে আমরা ব্ল্যাকহোলের মধ্যে বাস করছি
মহাকাশের সবচেয়ে অদ্ভুত জিনিসের নাম হয়তো ব্ল্যাকহোল। বিজ্ঞানীরা এই রহস্যময় বস্তু নিয়ে অনেক কিছুই জানেন, আবার অনেক কিছু জানেন না। এই না জানা বিষয়গুলো মেলাতে গিয়ে মাঝেমধ্যে এমন সব মাথা নষ্ট করা থিওরি সামনে আসে, যেগুলো শুনলে বিশ্বাসই হতে চায় না।
তেমনই এক আজব দাবি করছেন কিছু পদার্থবিজ্ঞানী। তাঁরা বলছেন, আমরা হয়তো আসলে একটা বিশাল ব্ল্যাকহোলের ভেতরে বসবাস করছি! এমনকি আমাদের এই পুরো মহাবিশ্বটাই হয়তো একটা হলোগ্রাম!
ব্যাপারটা শুনে তোমাদের চোখ কপালে ওঠার দশা, তাই তো? চলো, বিষয়টা একটু সহজ করে বলি।
প্রথমেই বোঝার চেষ্টা করি, ব্ল্যাকহোল কী? সহজ কথায়, ব্ল্যাকহোল হলো মহাকাশের এমন একটা জায়গা, যেখানে মহাকর্ষ বল এতটাই শক্তিশালী যে আলো পর্যন্ত সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না। বিশাল কোনো নক্ষত্র যখন তার জ্বালানি ফুরিয়ে চুপসে যায়, তখন সে ব্ল্যাকহোলে পরিণত হয়। এর খিদে প্রচুর। আশপাশে যা পায়, গপগপ করে গিলে ফেলে।
কিন্তু এই সবকিছু খেয়ে ফেলার মধ্যে একটা সমস্যা আছে। পদার্থবিজ্ঞানের একটা নিয়ম হলো, কোনো তথ্য কখনো হারিয়ে যায় না। ধরো, তুমি একটা কাগজ পুড়িয়ে ফেললে। কাগজটা ছাই হয়ে গেল ঠিকই, কিন্তু তাত্ত্বিকভাবে ওই ছাই আর ধোঁয়া বিশ্লেষণ করে কাগজটা কেমন ছিল তা বের করা সম্ভব। অর্থাৎ তথ্যটা রূপ বদলালেও হারিয়ে যায়নি। আবারও বলছি, বিষয়টা শুধু তাত্ত্বিকভাবে সম্ভব, বাস্তবে ছাই ও ধোঁয়া বিশ্লেষণ করে হয়তো কাগজের ব্যাপারে কিছুই জানা যাবে না। যে জিনিস বাস্তবে সম্ভব নয়, তা কেন তাত্ত্বিকভাবে সম্ভব, সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ। আজ সেদিকে যাব না।
তাহলে মূল ব্যাপারটা দাঁড়াল, পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম অনুসারে কোনো তথ্য চিরতরে হারিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু ব্ল্যাকহোলের পেটে কিছু ঢুকলে তা আর বের হয় না! আবার বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং দেখিয়েছিলেন, ব্ল্যাকহোল থেকেও একধরনের বিকিরণ বের হয় এবং একসময় ব্ল্যাকহোলটা বাষ্প হয়ে উবে যায়। তাহলে প্রশ্ন হলো, ব্ল্যাকহোলটা যদি উবে যায়, তবে তার পেটের ভেতর যেসব জিনিস ঢুকেছিল, সেগুলোর তথ্য কোথায় গেল? সেগুলো কি হারিয়ে গেল? যদি হারিয়ে যায়, তবে তো পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম ভেঙে পড়ে! এটাকে বলা হয় ব্ল্যাকহোল ইনফরমেশন প্যারাডক্স।
কিন্তু এর সমাধান কী? এই সমস্যার সমাধান করতে জেরার্ড টি’হুফ্ট নামের এক বিজ্ঞানী দারুণ এক বুদ্ধি বের করলেন। তিনি বললেন, ব্ল্যাকহোল যখন কোনো কিছু গিলে ফেলে, তখন সেই জিনিসের তথ্য হারিয়ে যায় না। বরং সেই তথ্যগুলো ব্ল্যাকহোলের ওপরের পৃষ্ঠে জমা থাকে। বিজ্ঞানের ভাষায় ব্ল্যাকহোলের ওপরের পৃষ্ঠকে বলে ইভেন্ট হরাইজন।
বিষয়টা সহজভাবে বোঝার জন্য একটা পেপসি ক্যানের কথা কল্পনা করতে পারো। পানীয় আছে ক্যানের ভেতরে, কিন্তু ওই পানীয়তে কী কী উপাদান আছে, তা লেখা আছে ক্যানের বাইরের গায়ে লাগানো লেবেলে।
বিজ্ঞানীরা ভাবলেন, ব্ল্যাকহোলের বাইরের দেয়ালে যদি ভেতরের সব তথ্য লেখা থাকে, তাহলে হয়তো আমাদের মহাবিশ্বটাও এমন! আমরা যা কিছু দেখছি, সবই হয়তো মহাবিশ্বের শেষ সীমানায় কোনো এক দ্বিমাত্রিক তলে লেখা তথ্যের ছায়া। ঠিক যেমন ক্রেডিট কার্ডের ওপরের হলোগ্রাম সমতল হওয়া সত্ত্বেও নাড়ালে থ্রিডি মনে হয়, অনেকটা সে রকম। একেই বলে হলোগ্রাফিক ইউনিভার্স থিওরি। এই বিষয়গুলো অবশ্য এতটা সহজ নয়। কিন্তু তোমাদের বোঝার সুবিধার জন্য অতি সহজভাবে বলছি। বাস্তবে পদার্থবিজ্ঞানের এসব বিষয় আরও অনেক অনেক জটিল।
যাহোক, মূল আলোচনায় ফিরি। কিছু বিজ্ঞানী এই ভাবনাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিলেন। তাঁরা বললেন, যদি আমাদের এই ত্রিমাত্রিক জগৎ কোনো দ্বিমাত্রিক তলের ছায়া হয়, তাহলে হতে পারে আমাদের পুরো মহাবিশ্বটাই কোনো ব্ল্যাকহোলের ভেতরে আছে! আর সেই ব্ল্যাকহোলটা হয়তো আরও বড় কোনো মহাবিশ্বের অংশ! শুনতে হয়তো পাগলের প্রলাপের মতো লাগছে, কিন্তু কোনো বিজ্ঞানী তো আর যুক্তি ছাড়া এমনি এমনি একটা উদ্ভট কথা বলে দেবেন না!
তাহলে প্রশ্ন ওঠে, বিজ্ঞানীরা কেন এমনটা ভাবছেন? এটা কি শুধুই বিজ্ঞানীদের কল্পনা? নাকি কোনো প্রমাণ আছে? মজার ব্যাপার হলো, গাণিতিক কিছু হিসাব-নিকাশ কিন্তু এই অদ্ভুত দাবির পক্ষে কথা বলে।
আমাদের দৃশ্যমান মহাবিশ্বের যে ব্যাসার্ধ, আর আমাদের মহাবিশ্বের মোট ভরকে যদি ব্ল্যাকহোলে পরিণত করা হতো তবে তার যে আকার হতো—এই দুটো সংখ্যা অবিশ্বাস্যভাবে কাছাকাছি!
এটা কি শুধুই কাকতালীয়, নাকি সত্যিই আমরা কোনো ব্ল্যাকহোলের মধ্যে আছি? ভয়ের কিছু নেই। এখনই ভয়ে অস্থির হয়ে যেও না। এটি এখনো একটি গাণিতিক ধারণা বা হাইপোথিসিস মাত্র। আমাদের বর্তমান পদার্থবিজ্ঞান দিয়ে সাধারণ মহাবিশ্বকে এখনো সবচেয়ে ভালো ব্যাখ্যা করা যায়। তবে বিজ্ঞান মানেই তো অজানাকে জানা। কে জানে, হয়তো অদূর ভবিষ্যতে আমরা জানতে পারব, আমরা আসলে বিশাল এক কসমিক হলোগ্রামের বাসিন্দা!
বিজ্ঞানে তো আর শতভাগ নিশ্চিত করে কিছু বলা যায় না! তাই আমরা এই মূহূর্তে আমাদের জানা পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মেই মহাবিশ্বকে জানি। কিন্তু ওই বিজ্ঞানীদের কল্পনাকেও একদম পাগলের বকবক বলে উড়িয়ে দিও না। কারণ, একসময় মানুষ মনে করত সূর্য পৃথিবীর চারপাশে ঘোরে। তখন যারা এর বিরোধিতা করেছিল, মানুষ তাদের পাগল বলত। কিন্তু আজ আমরা জানি, সেই তথাকথিত পাগলেরাই ঠিক ছিলেন। তাই বিজ্ঞান কোনো কিছুকে একেবারে অসম্ভব বলে উড়িয়ে দেয় না!
সূত্র: আইএফএল সায়েন্স