রিভিউতে ১ স্টার দেওয়া কি অভদ্রতা

মা–বাবাকে বুঝিয়ে দারুণ একটা ওয়াটার পার্ক রিসোর্টে গেলে ছুটি কাটাতে। ইন্টারনেটে তাদের বিজ্ঞাপন দেখে মনে হয়েছিল, এর চেয়ে সুন্দর জায়গা আর হতেই পারে না। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর দেখলে, পার্কিং লট একদম খাঁ খাঁ করছে। এমন নয় যে অফ সিজন বলে ভিড় কম, বরং পরিবেশটা এমন যেন শেষ অতিথিরা কোনো এক রহস্যময় কারণে পালিয়েছে। হয়তো অনেক দিন এখানে কেউ আসার সাহস পায়নি!

লবির কার্পেটগুলো জায়গায় জায়গায় ছেঁড়া, করিডরগুলো অন্ধকার ও ভুতুড়ে। সেই যে বিজ্ঞাপনে চকচকে স্লাইড দেখে আনন্দে মেতে উঠেছিলে, বাস্তবে সেখানে আছে পানিবিহীন শুকনো একটা সুইমিং পুল। তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে একটা ভাঙাচোরা স্লাইড! রিসেপশনিস্ট বেশ হাসিমুখেই তোমাদের বললেন, ‘যেকোনো একটা রুম পছন্দ করে ঢুকে পড়ুন।’ পরিস্থিতি এতটাই গা–ছমছমে যে রাতে ঘুমানোর আগে বাধ্য হয়ে দরজার পেছনে ভারী একটা আলমারি ঠেলে দিলে, যাতে হুট করে উটকো লোকজন ঢুকে পড়তে না পারে। আর পরদিন সকালেই সেখান থেকে পগার পার!

যে কাহিনি এতক্ষণ বললাম, তা কোনো বানানো গল্প নয়। জনপ্রিয় লেখক শার্লট হিলটন অ্যান্ডারসনের জীবনে ঠিক এমনটাই ঘটেছিল। তিনি রাগে গজগজ করতে করতে জীবনে প্রথম ও শেষবার ‘এক’ স্টার দিয়েছিলেন। সঙ্গে জুড়ে দিয়েছিলেন রিসোট সম্পর্কে সত্যিকারের রিভিউ। পুরো দুই পৃষ্ঠার সেই রিভিউতে কোনো রাগ ঢাকেননি তিনি। সঙ্গে প্রমাণ হিসেবে জুড়ে দিয়েছিলেন কিছু ছবিও। কয়েক মাস পরে কৌতূহল নিয়ে দেখতে চেয়েছিলেন, তারা কোনো উত্তর দিয়েছে কি না। ওয়েবসাইটে ঢুকে দেখেন, পার্কটা চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে! তার পর থেকে শার্লটের মনে হয়েছে, তাঁর রিভিউটাই কি তবে কফিনের শেষ পেরেক ছিল?

সে যা হওয়ার হোক। খারাপ রিসোর্ট বন্ধ হয়ে গেছে, সেটাই ভালো। কিন্তু শার্লট কি কাজটা ঠিক করেছিলেন? মানে রিভিউতে ১ স্টার দেওয়া কি ঠিক ছিল? টাকা খরচ করে বাজে অভিজ্ঞতা হলে ইন্টারনেটে সব সত্যি বলে দেওয়া উচিত কি না, এটা নিয়ে সবার মনেই একটা দ্বন্দ্ব কাজ করে। চলো, ব্যাপারটা একটু তলিয়ে দেখা যাক।

আরও পড়ুন

কেন ১ স্টার রিভিউ দেওয়া উচিত

সবচেয়ে বড় যুক্তি হলো, তুমি টাকা দিয়েছ এবং তোমার অভিজ্ঞতা জঘন্য হয়েছে। এদিকে গুগল আবার জানতে চাইছে, ওখানে ঘুরে তোমার কেমন লেগেছে। সত্যি কথা বলাটা তো তোমার নাগরিক দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে! তথ্য–উপাত্তও কিন্তু তা-ই বলে। ৯৪ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, তাঁরা কোনো জায়গার নেগেটিভ রিভিউ দেখলে সেখানে আর যান না।

রিভিউ হলো এমন এক জিনিস, যার মাধ্যমে অচেনা মানুষেরা একে অপরকে বিপদের হাত থেকে বাঁচান। বিজ্ঞাপন দিয়ে ভালো ভালো জিনিস দেখিয়ে একটা শুকনো পুল আর ভাঙা স্লাইড ধরিয়ে দেওয়াটা কোনো ছোটখাটো ভুল নয়, সরাসরি প্রতারণা। তা ছাড়া তোমার সৎ রিভিউ অনেক সময় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্যও ভালো। সবাই যদি অভিযোগ করে যে তাদের খাবার বারবার ঠান্ডা পরিবেশন করা হচ্ছে, তাহলে রেস্তোরাঁর মালিক সেটা শুধরে নেওয়ার সুযোগ পাবেন। এ ক্ষেত্রে চুপ থাকাটা কোনো ভদ্রতা নয়, বরং বোকামি।

কেন ১ স্টার রিভিউ দেওয়া উচিত নয়

গল্পের অন্য একটা দিকও আছে। তোমার ওই একটা এক স্টারের রিভিউ কোনো ছোট ব্যবসাকে চিরতরে পথে বসিয়ে দিতে পারে। হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের এক বিখ্যাত গবেষণায় দেখা গেছে, ইয়েলপে রেটিং এক স্টার কমে গেলে একটা রেস্তোরাঁর আয় ৫ থেকে ৯ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়! জানলে অবাক হবে, ওই একটা নেগেটিভ রিভিউয়ের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে তাদের প্রায় ৪০টা পজিটিভ রিভিউয়ের দরকার হয়। ছোট একটা ক্যাফে বা রেস্তোরাঁর জন্য এ আয় কমে যাওয়ার মানে কর্মচারীদের বেতন আটকে যাওয়া বা দোকান ভাড়ার টাকা জোগাড় করতে না পারা।

তা ছাড়া অনেক সময় যে সমস্যা তুমি সামলাচ্ছ, সেটার জন্য হয়তো ওই কর্মচারী দায়ীই নন। হয়তো সেদিন কিচেনে লোক কম ছিল বা কোনো সিস্টেম ক্র্যাশ করেছিল। একটা খারাপ দিনের ওপর ভিত্তি করে কাউকে ইন্টারনেটে আজীবনের জন্য দাগিয়ে দেওয়াটা অনেক সময় শাস্তির চেয়ে অবিচার বেশি মনে হয়।

আরও পড়ুন

রিভিউ যখন সাইবার বুলিংয়ে পরিণত হয়

অনলাইন রিভিউ কালচারের একটা ভীষণ কুৎসিত দিক আছে, যার সঙ্গে সত্যের কোনো সম্পর্ক নেই। ২০২৫ সালের একটা ঘটনা বলি। সান ফ্রান্সিসকোর এক বিখ্যাত শেফ এক টিকটকারের সঙ্গে ঝামেলায় জড়িয়ে পড়েন। ঘটনাটা ভাইরাল হতেই ওই টিকটকারের লাখ লাখ ফ্যান সেই শেফের রেস্তোরাঁর গুগল পেজে গিয়ে ইচ্ছেমতো ১ স্টার রিভিউ দিতে শুরু করেন। অথচ তাঁদের কেউ কোনো দিন ওই রেস্তোরাঁয় পা রাখেননি, খাবারও চেখে দেখেননি! ফল কী হলো? রেস্তোরাঁটা বন্ধ হয়ে গেল, অনেক মানুষ চাকরি হারালেন।

এটা কোনো রিভিউ নয়, এটা হলো সাইবার বুলিং। রিভিউয়ের মূল শর্তই হলো, নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা শেয়ার করা। তুমি যে দোকানে কোনো দিন যাওনি, সেখানে গিয়ে যখন তুমি ১ স্টার দিচ্ছ, তখন তুমি আসলে কোনো প্রতিবাদ করছ না, তুমি শুধু ঘৃণা ছড়াচ্ছ। রিভিউয়ের প্ল্যাটফর্ম কোনো অস্ত্র নয়, এটাকে সেভাবে ব্যবহার করলে তুমি হিরো হবে না, বরং তুমিই সবচেয়ে বড় অভদ্র প্রমাণিত হবে।

তাহলে কী করবে

ওয়ান-স্টার রিভিউ তখনই দেওয়া উচিত, যখন সমস্যাটা বিশাল এবং সেটা পরের মানুষের সঙ্গেও ঘটার প্রবল আশঙ্কা থাকে। শনিবারের ভিড়ে তোমার পিৎজাটা একটু ঠান্ডা এসেছে বলে বা ওয়েটারের মেজাজ একটু খিটখিটে ছিল বলে ওয়ান-স্টার দেওয়া ঠিক নয়। যখন তুমি দেখবে, তারা তোমার সঙ্গে পরিষ্কার প্রতারণা করেছে বা দিনের পর দিন একই ভুল করে যাচ্ছে, তখন এক স্টার দিলে তুমি মোটেও রূঢ় নও।

তবে রিভিউ লেখার সময় কিছু নিয়ম মেনে চলা ভালো। যেমন, কী ঘটেছিল, শুধু সেটা বলো। যে ওয়েটার তোমাকে সার্ভ করেছেন, তাঁকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করে কিছু লিখো না। রাগের মাথায় অনেক নেতিবাচক শব্দ লিখে প্রকাশ করা উচিত নয়। মাথা ঠান্ডা হলে গুছিয়ে লেখো। একটু সময় নাও। ইন্টারনেটে পোস্ট করার আগে পারলে ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলে দেখো। অনেক সময় এভাবেই সমস্যার সুন্দর সমাধান হয়ে যায়। তারা যদি তোমার কথায় পাত্তা না দেয়, তখন ১ স্টার দিলে তোমার নিজের কাছেও খারাপ লাগবে না।

একটা ১ স্টার রিভিউ দেওয়ার জন্য কারণটা এমন হওয়া উচিত নয় যে ‘আজ আমার দিনটা একটু খারাপ গেল’। কারণটা এর চেয়ে অনেক বড় হওয়া উচিত। তবে ওই ভুতুড়ে ওয়াটার পার্কের মতো কেউ যদি প্রতারণা করে, তাহলে অবশ্য ভিন্ন কথা। তুমি মাঝেমধ্যেই এমন ঝামেলায় পড়তে পারো। এখন বেশির ভাগ মানুষ অনলাইনে কেনাকাটা করে। তুমি যদি অনলাইনে ভালো জিনিসের বিজ্ঞাপন দেখে খুব খারাপ মানের জিনিস পাও, তাহলে তা তোমার জানানো উচিত। নাহলে অন্য অনেকে প্রতারণার শিকার হবে। এ ক্ষেত্রে তোমার রিভিউ হবে জনসেবা।

সূত্র: রিডার্স ডাইজেস্ট
আরও পড়ুন