হ্যারি পটার সিরিজের ডবির সমাধি বাঁচাতে সরাতে হলো ৫৮০ মিলিয়ন ডলারের বিদ্যুৎ প্রকল্প

যুক্তরাজ্য ও আয়ারল্যান্ডের মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য বিশাল এক কেব্‌লের পথ বদলে দেওয়া হয়েছে। কারণ, হ্যারি পটারভক্তদের দাবি, বিদ্যুতের এই লাইন মুভির জনপ্রিয় চরিত্র ডবি দ্য হাউস এলফের স্মৃতিচিহ্নের ওপর দিয়ে যাবে।

৫৮০ মিলিয়ন ডলার বাজেটের এই প্রকল্পের মাধ্যমে যুক্তরাজ্যের বিদ্যুৎ আয়ারল্যান্ডে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে ১২৫ মাইল লম্বা এই কেব্‌লের সংযোগ তৈরি করা হয় ওয়েলসের ফ্রেশওয়াটার ওয়েস্ট সৈকত পর্যন্ত। এই সৈকতেই হ্যারি পটার সিরিজের চরিত্র ডবির মৃত্যুর দৃশ্যটি শুট করা হয়েছিল।

সমুদ্রের নিচের এই লাইনের মূল কাজ ছিল দুই দেশের মধ্যে অতিরিক্ত পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ ভাগাভাগি করা; কিন্তু এটি সরাসরি ডবির সেই প্রতীকী সমাধির ক্ষতি করত, যেখানে হ্যারি পটারভক্তরা এখনো পাথর দিয়ে হাতে লেখা ভালোবাসার বার্তা রেখে আসেন।

ডবি দ্য হাউস এলফ

বিষয়টি জানার পর ক্ষুব্ধ ভক্তরা একের পর এক ফোন করতে থাকেন। প্রকল্প পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের প্রধান সাইমন লুডলাম জানান, ভক্তদের শত শত ফোন পেয়ে তাঁরা বাধ্য হয়েই কেব্‌লের পথ বদলে দেন। তিনি আরও জানান, পুরো ঘটনা দেখে তিনি প্রথমে বেশ অবাক হয়েছিলেন। এমনকি এক সহকর্মী যখন তাঁকে বললেন, কেব্‌লটি সোজা ডবির স্মৃতিচিহ্নের ওপর দিয়ে যাচ্ছে, তখন তিনি বুঝে উঠতেই পারেননি এই ডবি আসলে কে।

আরও পড়ুন

সহকর্মী বুঝিয়ে বলার পরেও লুডলাম পুরো বিষয়টি বুঝতে পারছিলেন না। এক পডকাস্টে তিনি বলেন, আমি বলেছিলাম, ডবি তো বইয়ের কাল্পনিক চরিত্র। বইয়ের সবকিছুই তো কাল্পনিক, তাহলে এই স্মৃতিচিহ্ন এল কোথা থেকে? কিন্তু সহকর্মী যখন বললেন, ব্যাপারটা খুবই গুরুতর, কেবল তখনই লুডলাম সমস্যার গুরুত্ব বুঝতে পারেন। এরপরই তাঁর পুরো দল ডবির সেই প্রতীকী স্মৃতিচিহ্নটিকে রক্ষা করতে বিদ্যুতের কেব্‌লের পথ বদলে দেওয়ার কাজ শুরু করে।

সাইমন লুডলাম মজা করে বলেন, ‘আমাদের এই সিদ্ধান্তে অনেকেই খুব খুশি হয়েছেন। প্রকল্পটি এখন সুন্দরভাবে এগিয়ে চলছে; আর নিশ্চয়ই ডবি নিজেও এখন বেশ খুশি। প্রকল্পের কর্তারা বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়ায় স্বস্তি পেয়েছেন হ্যারি পটারভক্ত জ্যাক নিকোলাস। ২০ বছর বয়সী নিকোলাস ওয়েলসের ওই এলাকারই বাসিন্দা, যেখানে ডবির স্মৃতিচিহ্নটি রয়েছে। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও বানিয়ে নিজের এলাকার সুন্দর স্থানগুলো সবার সামনে তুলে ধরেন।

নিকোলাস জানান, ডবির এই সমাধির কারণেই ইতালি, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দূরদূরান্তের দেশ থেকেও প্রচুর মানুষ এই সৈকতে ঘুরতে আসেন। সেখানে রাখা নানা রকম পাথরে বিদেশি ভক্তদের হাতে লেখা বার্তাই প্রমাণ করে, মানুষ কতটা দূর থেকে শুধু এই ডবিকে দেখতে আসে। পর্যটন এই এলাকার অন্যতম প্রধান ব্যবসা। তাই বিদেশি পর্যটকেরা এলে স্থানীয় ব্যবসার বেশ লাভ হয়।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ওয়েলসের উপকূলীয় অঞ্চল পেমব্রোকশায়ারের পর্যটন খাত থেকে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ আয় হয়। প্রতিবছর ৬০ লাখের বেশি পর্যটক এখানে আসেন, যা এলাকার প্রায় ২৩ শতাংশ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করে।

আরও পড়ুন

সোফি পিয়ার্স একজন ওয়েলস ট্রাভেল ব্লগার। তিনি বইয়ের গল্প বা ইতিহাসের সঙ্গে মিল থাকা জায়গাগুলো দেখতে বিশ্ব ঘুরে বেড়ান। তিনি জানান, ফ্রেশওয়াটার ওয়েস্ট হলো অদ্ভুত এক সুন্দর ও নির্জন সৈকত। সেখানে ডবির উদ্দেশে ভালোবাসার বার্তা লেখা অসংখ্য রঙিন পাথর রাখা আছে। প্রথমবার দেখার পর তিনি বহুবার এই জায়গায় ফিরে এসেছেন এবং প্রতিবারই এটি তাঁকে অবাক করেছে।

সিনেমার হ্যারি পটার, হারমায়োনি গ্রেঞ্জার ও রন উইজলি
ছবি: সংগৃহীত

তবে বিদ্যুতের কেব্‌লের পথ ঘুরিয়ে দেওয়ায় নতুন একটি ঝামেলা তৈরি হয়েছে। লাইনটি এখন ব্রোঞ্জ যুগের কিছু প্রাচীন ঐতিহাসিক ধ্বংসাবশেষের একদম কাছাকাছি চলে এসেছে। হ্যারি পটারভক্তরা ডবির এই স্মৃতিচিহ্ন রক্ষায় এগিয়ে এসেছেন, এমন ঘটনা অবশ্য এটিই প্রথম নয়। ২০১০ সালে হ্যারি পটার অ্যান্ড দ্য ডেথলি হ্যালোস: পার্ট ১ মুভিটি আসার পর থেকেই ভক্তরা সৈকতে ডবির স্মরণে এই প্রতীকী কবরটি বানিয়েছিলেন।

এরপর ২০২২ সালে ওই জায়গার মালিক সংস্থা ন্যাশনাল ট্রাস্ট ভক্তদের সঙ্গে কথা বলে স্মৃতিচিহ্নটি সেখানে রাখার অনুমতি দেয়। তবে তারা সৈকতে আর বাড়তি কোনো জিনিসে স্থানটি ময়লা না করার শর্ত দেয়।

হ্যারি পটার সিরিজে আমরা দেখি, পোশাক পাওয়ার মাধ্যমেই হাউস এলফরা মনিবের শাসন থেকে ছাড়া পায়। তাই ডবির শান্তির জন্য ও তাঁকে মুক্ত করার প্রতীক হিসেবে ভক্তরা সেই স্মৃতির স্থানে কাপড়ের মোজা রেখে যান। তবে সমুদ্রসৈকতের পরিবেশ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় পরবর্তী সময়ে পর্যটকদের সেখানে মোজা বা অন্যান্য জামাকাপড় ফেলতে নিষেধ করা হয়।

সূত্র: সিএনএন, নিউইয়র্ক টাইমস
আরও পড়ুন