বিটিএসের প্রতিবাদ, গ্র্যামি বয়কটের ঘোষণা
বিশ্বখ্যাত কে–পপ ব্যান্ড বিটিএস গত ২৯ জুলাই ঘোষণা দেয়, তারা আগামী গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডসের জন্য নিজেদের কোনো গান জমা দেবে না। গ্র্যামির একটি নতুন ক্যাটাগরি বা বিভাগের প্রতিবাদ হিসেবেই তারা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ব্যান্ডটির মতে, এই নতুন বিভাগ সংগীতের সর্বজনীনতাকে একটি নির্দিষ্ট গণ্ডিতে আটকে দিচ্ছে।
ব্যান্ডের সাত সদস্য আর এম, সুগা, জে হোপ, জিমিন, ভি, জাংকুক ও জিন নিজেদের ইনস্টাগ্রামে এ ব্যাপারে কথাও বলেছেন। তাঁরা জানিয়েছেন, ‘আমরা ২০২৭ গ্র্যামিতে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমরা চাই, সংগীত যেন কোনো অঞ্চল বা ভাষার সীমানায় আটকে না থাকে; বরং মানুষ কেবল গান হিসেবেই তা শুনুক ও ভালোবাসুক।’
বিটিএসের এই বার্তা মূলত ৬৯তম গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডসের বিভাগ পরিবর্তনের একটি জবাব ছিল। গত জুনের মাঝামাঝি সময়ে গ্র্যামির আয়োজক প্রতিষ্ঠান ‘রেকর্ডিং একাডেমি’ পুরস্কারে নতুন কিছু বিভাগ যুক্ত করার কথা জানায়। এই ৬৯তম গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডসের মূল অনুষ্ঠানটি ২০২৭ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
নতুন যুক্ত করা বিভাগগুলোর একটি ছিল ‘বেস্ট এশিয়ান পপ মিউজিক পারফরম্যান্স’। আয়োজকদের মতে, এশীয় অঞ্চল ও ভাষার ব্যবহার রয়েছে, এমন পপ গানকে সম্মান জানাতেই এই বিভাগ যুক্ত করা হয়। এর মধ্যে কে–পপ, জে–পপ ও সি–পপ ছাড়াও এশিয়ার নানা ধরনের পপ সংগীত অন্তর্ভুক্ত ছিল।
বিটিএসের গ্র্যামি বর্জনের ঘোষণার পর এক বিবৃতিতে রেকর্ডিং একাডেমির প্রধান নির্বাহী (সিইও) হার্ভি মেসন জুনিয়র জানান, ব্যান্ডটির এই সিদ্ধান্তে তিনি ব্যথিত। তবে তিনি তাঁদের চিন্তাভাবনাকে সম্মান জানান এবং বোঝেন। পাশাপাশি নতুন বিভাগটি নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্ক নিয়েও তিনি কথা বলেন।
বিবৃতিতে হার্ভি মেসন স্পষ্ট করে বলেন, আলোচনার মধ্যে যে মূল বিষয়টি হারিয়ে যাচ্ছে, তা আমি পরিষ্কার করতে চাই। এশীয় পপ সংগীতের বৈচিত্র্য ও প্রসারকে উদ্যাপন করার জন্যই ‘এশিয়ান পপ’ বিভাগটি আনা হয়েছে, যাতে এই অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পীদের কাজ আলাদাভাবে সবার নজরে আসে। নতুন বিভাগ যুক্ত করার অর্থ হলো আরও বেশি শিল্পীর কাজের স্বীকৃতি পাওয়া। কাউকে আলাদা বা সীমিত রাখা এর উদ্দেশ্য নয়; বরং গ্র্যামির ১৫ হাজার ভোটারের স্বীকৃতির পরিধি বাড়িয়ে আরও বেশি শিল্পীকে সুযোগ দেওয়াই এর মূল লক্ষ্য।
এশিয়ান পপের মতো কোনো বিশেষ বিভাগে গান জমা দিলেও শিল্পীদের অন্য মূল বিভাগগুলোতে অংশ নেওয়ার সুযোগ বন্ধ হয়ে যাবে না; অর্থাৎ তাঁরা চাইলে সেরা গান (সং অব দ্য ইয়ার), সেরা অ্যালবাম বা সেরা রেকর্ডের মতো প্রধান পুরস্কারগুলোর জন্য বিবেচিত হবেন।
২০২০ সালে জনপ্রিয় গান ‘ডায়নামাইট’-এর মাধ্যমে প্রথম কোরিয়ান ব্যান্ড হিসেবে গ্র্যামিতে মনোনীত হয়ে ইতিহাস গড়েছিল বিটিএস। এরপর লম্বা বিরতি শেষে চার্ট কাঁপানো অ্যালবাম নিয়ে ফিরে এসেও গ্র্যামিতে গান না পাঠানোর এই সিদ্ধান্ত সংগীতজগতে একটি বড় বার্তা দিচ্ছে। তবে ভবিষ্যতে তারা আবারও গ্র্যামিতে গান জমা দেবে কি না, তা নিয়ে এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না।
বিশ্বজুড়ে কে–পপের দিন দিন জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকায় মার্কিন সংগীত পুরস্কার সংস্থাগুলো সম্প্রতি নতুন নতুন বিভাগ চালু করেছে। ২০১৯ সালে এমটিভি ভিডিও মিউজিক অ্যাওয়ার্ডস চালু করে ‘বেস্ট কে–পপ’ বিভাগ। ২০২২ সালে আমেরিকান মিউজিক অ্যাওয়ার্ডস যোগ করে ‘ফেভারিট কে–পপ আর্টিস্ট’ পুরস্কার এবং ২০২৩ সালে বিলবোর্ড মিউজিক অ্যাওয়ার্ডস কে–পপ নিয়ে নতুন চারটি বিভাগ অন্তর্ভুক্ত করে।
বিটিএস ইতিমধ্যে আমেরিকান মিউজিক অ্যাওয়ার্ডস (এএমএ) এবং এমটিভি ভিডিও মিউজিক অ্যাওয়ার্ডসসহ (ভিএমএ) বিশ্বখ্যাত বেশ কিছু সংস্থা থেকে বহু পুরস্কার জিতেছে। গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডসে তারা ‘বেস্ট পপ ডুও/গ্রুপ পারফরম্যান্স’ বিভাগে তিনবার এবং ‘বেস্ট মিউজিক ভিডিও’ বিভাগে একবার মনোনীত হয়েছিল। এ ছাড়া ব্রিটিশ ব্যান্ড কোল্ডপ্লের ‘মিউজিক অব দ্য স্ফিয়ার্স’ অ্যালবামে বিটিএসের একটি গান ছিল, যা ২০২২ সালে ‘অ্যালবাম অব দ্য ইয়ার’ বিভাগে মনোনয়ন পায়। তারা গ্র্যামির মঞ্চে তিনবার পারফর্মও করেছে। তবে বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ বলে পরিচিত এই পুরস্কার তাঁরা এখনো একবারও জিততে পারেনি।
২০১৩ সালে আত্মপ্রকাশ করা এই ব্যান্ডই কিন্তু প্রথম ব্যান্ড নয়, যারা গ্র্যামি বর্জন করল। এর আগে ২০২১ সালে জনপ্রিয় গায়ক ‘দ্য উইকেন্ড’ নিজের গান গ্র্যামিতে না পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তিনি অভিযোগ তোলেন, গ্র্যামির একটি গোপন কমিটি মূল মনোনয়নের সিদ্ধান্ত নিজেদের মতো নিয়ন্ত্রণ করে। তবে পরবর্তী সময়ে রেকর্ডিং একাডেমি তাদের ভোটিং নীতিমালার সংস্কার করলে তিনি পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে আবারও পারফর্ম করেন।
২০২২ সালে বিটিএস সাময়িক বিরতিতে যায়। এ সময় ব্যান্ডের সদস্যরা নিজেদের একক কাজে মনোযোগ দেন ও দক্ষিণ কোরিয়ার নিয়ম অনুযায়ী বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা দেওয়া শুরু করেন। দক্ষিণ কোরিয়ায় ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী সক্ষম সকল পুরুষকে অন্তত ১৮ মাসের জন্য সামরিক বাহিনীতে দায়িত্ব পালন করতে হয়। কে–পপ তারকারাও এই নিয়মের বাইরে নন।
বিটিএসের সদস্যরা দীর্ঘ চার বছরের বিরতি শেষ করে মার্চ মাসে সিউলে এক বিশাল কনসার্ট আয়োজনের মাধ্যমে আবার মঞ্চে ফেরেন। একই সময়ে মুক্তি পায় তাঁদের নতুন অ্যালবাম ‘আরিরাং’। এই অ্যালবাম মুক্তির পরপরই বিলবোর্ড ২০০ চার্টের শীর্ষস্থান দখল করে নেয়। তা ছাড়া প্রায় ১১৫টি দেশ ও অঞ্চলের অ্যাপল মিউজিক চার্টেও এটি ১ নম্বরে চলে আসে।
তবে গ্র্যামির দৌড় থেকে সরে দাঁড়ানোর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসার আগেই কিন্তু বোঝা যাচ্ছিল ব্যান্ডটির চিন্তাভাবনায় বড় পরিবর্তন এসেছে। গত ফেব্রুয়ারিতে এক ম্যাগাজিনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিটিএসের আরএম জানান, গ্র্যামি পাওয়ার সেই ইচ্ছা তাঁদের এখন আর আগের মতো টানে না। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে দলের একটা স্পষ্ট লক্ষ্য থাকা ভালো ছিল, যা সবাইকে একসূত্রে বেঁধে রাখত। তবে এখন আমার মনে হয়, সবচেয়ে বড় বিষয় হলো আমরা সাতজন আবার একসঙ্গে ফিরে এসেছি এবং পুরো বিশ্বের ভক্তদের সঙ্গে সামনাসামনি দেখা করতে পারছি।