হাজারো রাবারের হাঁস নদীতে কেন
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ক্রল করার সময় হয়তো অনেকেই দেখেছ, ব্রিজ থেকে হাজার হাজার হলুদ রাবারের হাঁস নদীতে ফেলে দেওয়া হচ্ছে। নদীর দুই পাড়ে হাজারো মানুষ অধীর আগ্রহে দাঁড়িয়ে দেখছে, কোন হাঁসটি সবার আগে শেষ মাথায় পৌঁছাবে। প্রথম দেখায় এটাকে শুধুই একটি মজার খেলা মনে হতে পারে। কিন্তু হাঁসগুলোর দৌড় প্রতিযোগিতার পেছনে আছে এক দারুণ ভালো উদ্দেশ্য। চলো তাহলে জেনে নেওয়া যাক, হাজার হাজার রাবারের হলুদ হাঁস নদীতে ফেলে প্রতিযোগিতা করা হয় কেন?
৭ আগস্ট বৃহস্পতিবার সকালে শিকাগোর কলম্বাস ড্রাইভ ব্রিজের কাছে এমন একটি আয়োজন দেখা যায়। সেখানে প্রায় ৯০ হাজার রাবারের হাঁস নদীতে ছেড়ে দেওয়া হয়। নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে হাজার হাজার মানুষ আনন্দ নিয়ে হাঁসগুলোর ভেসে যাওয়া দেখছিল।
‘স্পেশাল অলিম্পিকস ইলিনয়’ নামের একটি সংস্থার জন্য টাকা তুলতে এ আয়োজন করা হয়। ২০০৫ সাল থেকে ‘শিকাগো ডাকি ডার্বি’ নামের এ উৎসব প্রতিবছর নিয়মিত অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এবারের প্রতিযোগিতাটি ছিল এর ২১তম আয়োজন। এখানে সাধারণ মানুষ অন্তত ১০ ডলার জমা দিয়ে একটি হাঁস নাম লিখে নিবন্ধন করে। এরপর বড় ট্রাক থেকে হাজার হাজার হাঁস একসঙ্গে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়।
এ প্রতিযোগিতা থেকে জমা হওয়া টাকা দিয়ে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী অ্যাথলেট বা খেলোয়াড়দের খেলাধুলার সুযোগ করে দেওয়া হয় এবং তাদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে দেওয়া হয়। এবারের আয়োজন থেকে সংস্থাটি সাত লাখ ডলারের বেশি টাকা সংগ্রহ করেছে। আর যাঁদের হাঁস প্রতিযোগিতায় প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় হয়েছে, তাঁরা পেয়েছে নতুন গাড়ি, নগদ টাকা ও পছন্দের খেলার টিকিট পাওয়ার মতো আকর্ষণীয় সব পুরস্কার।
এর আগের সপ্তাহে লন্ডনের গ্র্যান্ড ইউনিয়ন খালের প্যাডিংটন বেসিনেও এমন একটি ‘কসমিক রাবার ডাক রেস’ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেখানে ৩ হাজার হলুদ রাবারের হাঁস পানিতে ছেড়ে দেওয়া হয়। হাঁসগুলো ১০০ মিটার পথ ভেসে ফিনিশ লাইনের দিকে এগিয়ে যায়।
এ আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য ‘কসমিক’ নামের একটি দাতব্য সংস্থার জন্য অর্থ সংগ্রহ করা। সংস্থাটি হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) থাকা অসুস্থ শিশু ও তাদের পরিবারকে সাহায্য করে। সাধারণ মানুষ নির্দিষ্ট টাকা জমা দিয়ে একেকটি হাঁসের নাম নিবন্ধন করে। আর সেখান থেকে পাওয়া পুরো টাকা শিশুদের চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনা, গবেষণা এবং চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণের কাজে ব্যবহার করা হয়।
যেভাবে শুরু হলো এ প্রতিযোগিতা
আজকাল বিশ্বজুড়ে রাবারের হাঁসের প্রতিযোগিতা দেখা গেলেও, এটি শুরু হওয়ার স্পষ্ট ইতিহাস পুরোপুরি জানা যায় না। তবে ধারণা করা হয়, ১৯৮০ সালে যুক্তরাজ্যের ওয়েলসের ‘ডাইসার্থ’ এলাকার একটি দাতব্য সংস্থা প্রথম এ প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। আবার অন্য একটি তথ্য বলে, ১৯৮৭ সালে কানাডার অটোয়ায় প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে রাবারের হাঁসের দৌড় অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে, অর্থাৎ ১৯৯০-এর দশকে এ উৎসব বিশ্বের অনেক দেশে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ লটারির চেয়ে এটি দেখতে অনেক বেশি মজার, তাই বিভিন্ন সাহায্যকারী সংস্থা মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য এ পথ বেছে নেয়।
সময়ের সঙ্গে আয়োজনটি অনেক বড় হতে থাকে। ২০০৮ সালে লন্ডনের টেমস নদীতে রেকর্ড গড়ে আড়াই লাখ নীল রাবারের হাঁস ভাসানো হয়েছিল। আগে শুধু হলুদ রঙের হাঁস ব্যবহার করা হতো। কিন্তু দেখা গেল, কিছু মানুষ নিজেদের বাসা থেকে আনা হলুদ হাঁস ফিনিশ লাইনের কাছে পানিতে ফেলে দিয়ে জেতার চেষ্টা করছেন। এ প্রতারণা বন্ধ করতে ২০০৮ সাল থেকে আয়োজকেরা হলুদ হাঁসে বিশেষ নম্বর দেওয়া শুরু করে। যাতে কোনটা আসল হাঁস, তা সহজেই চেনা যায়। আবার অনেকে লাল হাঁস বা কালো চশমা পরা হাঁসও ব্যবহার করেন প্রতিযোগিতায়।
হাঁসগুলো কি নদীর পানিতেই ফেলে রাখা হয়?
প্রতিযোগিতায় হাজার হাজার হাঁস পানিতে নামানো হলেও, খেলা শেষে কিন্তু সেগুলো নদীতে ফেলে রাখা হয় না। খাল বা নদীর পরিবেশ যাতে নষ্ট না হয় এবং জলজ প্রাণীদের কোনো ক্ষতি না হয়, সে বিষয়ে আয়োজকেরা খুব সতর্ক থাকেন।
হাঁসগুলো যেন নদীর দূরদূরান্তে ভেসে হারিয়ে না যায়, সে জন্য পানিতে বিশেষ জাল বা লাইন দেওয়া থাকে। হাঁসগুলো সেই সীমানার বাইরে যেতে পারে না। আর প্রতিযোগিতা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিশেষ নৌকা দিয়ে পানি থেকে নম্বর দেওয়া সব হাঁস তুলে নেওয়া হয়।
পরের বছরের আয়োজনে ব্যবহারের জন্য হাঁসগুলো সাবধানে জমা করে রাখা হয়। এতে প্লাস্টিক দূষণ আটকানো সম্ভব হয় এবং পরিবেশের কোনো ক্ষতি না করেই এ সুন্দর দাতব্য অনুষ্ঠান পরিচালনা করা যায়।
বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা রাবারের হাঁসের দৌড়
শুধু একটি দেশ বা শহরেই নয়, রাবারের হাঁসের এই চ্যারিটি দৌড় এখন ছড়িয়ে পড়েছে পুরো পৃথিবীতে। অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেন নদীতে ক্যানসার গবেষণার সাহায্য জমা করতে প্রতিবছর ‘গ্রেট ব্রিসবেন ডাক রেস’ হয়, যেখানে নামানো হয় প্রায় ৩০ হাজার হাঁস। এমনকি দেশটির ‘ক্যাথরিন’ এলাকার এক উৎসবে হেলিকপ্টার ও বিশেষ খাঁচা বানিয়ে দারুণ এক হাঁস দৌড়ের আয়োজন করা হয়েছিল।
ইউরোপজুড়েও এ উৎসব বেশ জনপ্রিয়। যেমন জার্মানির নুরেমবার্গে প্রতি জুলাই মাসে ‘এন্টেনকাপ’ নামের একটি দৌড় অনুষ্ঠিত হয়। এই খেলা থেকে পাওয়া টাকা স্থানীয় চিড়িয়াখানায় দেওয়াসহ নানা সামাজিক কাজে লাগানো হয়।
উত্তর আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায়ও এ প্রতিযোগিতা খুব সাড়া ফেলেছে। আমেরিকার ওহাইওতে ১৯৯৫ সালে শুরু হওয়া ‘রাবার ডাক রেগাটা’য় দেড় লাখের বেশি হাঁস পানিতে নামানো হয়। আর কানাডার হ্যালিফ্যাক্স হারবারে ১০ হাজার হাঁসের লড়াইয়ে যে প্রথম হয়, সে পুরস্কার হিসেবে পায় ১০ লাখ কানাডিয়ান ডলার।