ব্ল্যাকহোল কখন ব্ল্যাকহোলকে খেয়ে ফেলতে পারে

দুটি ব্ল্যাকহোলপ্রতীকী ছবি

একটি ব্ল্যাকহোল আরেকটি ব্ল্যাকহোলকে খেয়ে ফেলছে, কি ভাবনার কথা! ব্যাপারটা অদ্ভুত শোনালেও মহাকাশে আসলেই এমনটা ঘটছে। আর বিজ্ঞানীরা এবার হাতেনাতে এর প্রমাণও পেয়ে গেছেন। ব্ল্যাকহোল যে মোটেও নিরীহ নয়; বরং নিজের জাতভাইকেই খেয়ে ফেলতে পারে, তার প্রমাণ মিলেছে ২০২৪ সালের শেষের দিকে মহাকর্ষীয় তরঙ্গের দুটি সংকেত থেকে।

লাইগো-ভার্গো-কাগরা কোলাবোরেশনের বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, ২০২৪ সালের অক্টোবর ও নভেম্বরে দুটি অদ্ভুত ঘটনা তাঁরা শনাক্ত করেছেন। এসব ঘটনা সাধারণ ব্ল্যাকহোলের সংঘর্ষের মতো ছিল না; বরং এগুলো ছিল দ্বিতীয় প্রজন্মের ব্ল্যাকহোল। মানে, এরা নিজেরা তৈরি হয়েছিল আগের কোনো সংঘর্ষ থেকে, আর এখন আবার আরেকটি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছে!

প্রথম ঘটনার নাম দেওয়া হয়েছে GW241011। এই সংঘর্ষ ঘটেছিল পৃথিবী থেকে প্রায় ৭০ কোটি আলোকবর্ষ দূরে। সেখানে সূর্যের চেয়ে ১৭ ও ৭ গুণ ভারী দুটি ব্ল্যাকহোল একে অপরের সঙ্গে পেঁচিয়ে গিয়ে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। মজার ব্যাপার হলো, এর মধ্যে বড় ব্ল্যাকহোলটি লাট্টুর মতো বন বন করে ঘুরছিল। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এত দ্রুত ঘুরতে থাকা ব্ল্যাকহোল এর আগে খুব কমই দেখা গেছে।

আরও পড়ুন

এর ঠিক এক মাস পরে আরেকটি ঘটনা ধরা পড়ল, নাম GW241110। এটি ঘটেছিল আরও প্রায় ২৪০ কোটি আলোকবর্ষ দূরে। এখানে সূর্যের চেয়ে ১৬ ও ৮ গুণ ভারী দুটি ব্ল্যাকহোলের সংঘর্ষ হয়েছিল। কিন্তু আসল চমক ছিল এর স্পিনে। সাধারণত ব্ল্যাকহোলগুলো যেদিকে ঘোরে, নিজেরাও সেদিকেই লাট্টুর মতো ঘোরে। কিন্তু এই ব্ল্যাকহোল উল্টো দিকে ঘুরছিল! মানে, অনেকটা উল্টো দিকে সাইকেল চালানোর মতো। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে রেট্রোগ্রেড স্পিন। এমন ঘটনা আগে কখনো দেখা যায়নি।

এখন প্রশ্ন হলো, এমন অদ্ভুত স্পিন বা ভরের পার্থক্য কেন? বিজ্ঞানীরা বলছেন, এর সবচেয়ে সহজ ব্যাখ্যা হলো, এগুলো রিসাইকেলড ব্ল্যাকহোল। মানে, এরা কোনো সাধারণ নক্ষত্রের মৃত্যু থেকে জন্মায়নি; বরং অতীতে অন্য কোনো ব্ল্যাকহোলের সঙ্গে সংঘর্ষে এদের জন্ম। সেই পুরোনো সংঘর্ষের কারণেই এটি এমন অদ্ভুতভাবে ঘুরছে।

এই আবিষ্কার শুধু ব্ল্যাকহোলের ইতিহাসই জানাচ্ছে না, আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বেরও এক কঠিন পরীক্ষা নিয়ে ফেলেছে। আইনস্টাইন বলেছিলেন, দ্রুত ঘুরতে থাকা ব্ল্যাকহোল তার চারপাশের স্থান-কালকে দুমড়েমুচড়ে দেয়। GW241011-এর সংকেত বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, আইনস্টাইনের কথা হুবহু মিলে গেছে!

আরও পড়ুন

আরেকটি মজার বিষয় হলো, এই দ্রুত ঘূর্ণন এক অদ্ভুত কণার অস্তিত্ব বাতিল করে দিয়েছে। বিজ্ঞানের কিছু তত্ত্বে আলট্রালাইট বোসন নামের একধরনের কণার কথা বলা হয়। যদি এই কণা থাকত, তবে তারা ব্ল্যাকহোলের ঘোরার শক্তি চুরি করে নিত ও ব্ল্যাকহোল ধীরে ধীরে স্লো হয়ে যেত। কিন্তু যেহেতু এই ব্ল্যাকহোলটি এখনো ঝড়ের গতিতে ঘুরছে, তাই বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন ওই সব তাত্ত্বিক কণা আসলে নেই।

এখন পর্যন্ত মহাকর্ষীয় তরঙ্গের মাধ্যমে প্রায় ৩০০টি ব্ল্যাকহোল সংঘর্ষ শনাক্ত করা হয়েছে। আর প্রতিটি ঘটনাই আমাদের মহাবিশ্বের এসব দানব সম্পর্কে নতুন নতুন গল্প শোনাচ্ছে।

সূত্র: লাইগো, ভার্গো ও কাগরা কোলাবোরেশন রিপোর্ট

আরও পড়ুন