শেষমেশ গরুও যন্ত্র ব্যবহার শুরু করল?

১৩ বছর বয়সী ভেরোনিকার জীবন অনেক গরুর চেয়ে আলাদাসায়েন্টিফিক আমেরিকান

অস্ট্রিয়ার পাহাড়ঘেরা এক ছবির মতো সুন্দর শহরে থাকে ভেরোনিকা নামের এক গরু। চারপাশে তুষারঢাকা পাহাড়, নীলচে হ্রদ, আর সবুজে ভরা মাঠ। এমন এক সুন্দর পরিবেশ গরুর জন্য আরামেরই হওয়ার কথা। ভেরোনিকা নিজেও কোনো সাধারণ গরু নয়। কোনো খামারে উৎপাদনের কাজ করে না। পরিবারের পোষা সদস্য হিসেবে থাকে। বিশেষ বলা হচ্ছে, কারণ গায়ে চুলকানি উঠলে এই গরু এমন এক কাজ করে, যা অন্য কোনো গরুর মধ্যে দেখা যায়নি। ভেরোনিকা মানুষের মতোই চুলকানোর জন্য বিশেষ সমাধান বেছে নিয়েছে। গরুটা একটা ঝাঁটা দিয়ে নিজের পিঠ নিজেই চুলকায়।

শুনতে অবাক লাগলেও এটিই এখন পর্যন্ত বৈজ্ঞানিকভাবে নথিভুক্ত প্রথম ঘটনা। যেখানে দেখা গেছে একটি গরু সচেতনভাবে যন্ত্র ব্যবহার করছে। এই জানুয়ারিতে কারেন্ট বায়োলজি জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, ভেরোনিকা শুধু যন্ত্র ব্যবহারই করে না, পরিস্থিতি বুঝে সেই যন্ত্রের কোন অংশ ব্যবহার করতে হবে, সেটাও জানে।

১৩ বছর বয়সী ভেরোনিকার জীবন অনেক গরুর চেয়ে আলাদা। সে অস্ট্রিয়ার এক কৃষক উইটগার উইগেলের বাড়িতে পোষা প্রাণী হিসেবে থাকে। খোলা পরিবেশে ঘোরে, চারপাশ ঘুরে দেখে। বয়সও পেরিয়েছে অনেক। বৃদ্ধ বয়স যাকে বলে। এই বয়স পর্যন্ত বেশির ভাগ গরুই পৌঁছাতে পারে না। গবেষকদের মতে, এই পরিবেশই হয়তো ওর বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতাকে প্রকাশের সুযোগ দিয়েছে।

আরও পড়ুন

ভিয়েনা ইউনিভার্সিটি অব ভেটেরিনারি মেডিসিনের কগনিটিভ বায়োলজিস্ট অ্যালিস আউয়ার্সপার্গ বলেন, ‘আমরা সাধারণত গরুকে বোকামির প্রতীক হিসেবেই দেখি। এমনকি একটি বিখ্যাত কার্টুনেও গরুর যন্ত্র বানানোর ভাবনাটাকেই হাস্যকর হিসেবে দেখানো হয়েছে। কিন্তু ভেরোনিকার আচরণ আমাদের সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করছে।’

ভেরোনিকার গল্পটা শুরু হয় একটি ভিডিও থেকে। আউয়ার্সপার্গ নামে এক চিত্রনির্মাতা লোকেশন খুঁজতে গিয়ে ভেরোনিকার একটি ভিডিও ধারণ করেছিলেন। সেই ভিডিওতে দেখা যায়, গরুটা একটা পুরোনো রেক দিয়ে নিজের পিঠ চুলকাচ্ছে। আউয়ার্সপার্গের চোখে ভিডিওটি আলাদা লেগেছিল, কারণ ভেরোনিকার আচরণ ছিল নির্দিষ্ট কাজের লক্ষ্যে। পরে তিনি ও তাঁর সহকর্মী আন্তোনিও ওসুনা-মাস্কারো ভেরোনিকার মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। মালিক তাঁদেরকে কেক আর রুটি দিয়ে আপ্যায়ন করেন। সঙ্গে শোনান ভেরোনিকার গল্প। কীভাবে প্রায় ১০ বছর আগে নিজে নিজেই লাঠি তুলে চুলকানো শুরু করেছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই দক্ষতা আরও নিখুঁত হয়েছে।

গবেষণার জন্য বিজ্ঞানীরা ভেরোনিকার সামনে রাখেন একটি কাঠের হাতলওয়ালা ডেক পরিষ্কারের ঝাঁটা। ঝাঁটার একদিকে শক্ত ব্রিসল, অন্যদিকে মসৃণ কাঠের হাতল। এই ঝাঁটার একদিক বেশ কাজে লাগবে চুলকানোর জন্য। অন্যদিক তুলনামূলকভাবে কম কার্যকর। বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, ভেরোনিকা মূলত ব্রিসলওয়ালা অংশ ব্যবহার করবে।

আরও পড়ুন

পরীক্ষার সময় দেখা গেল, ভেরোনিকা অনায়াসেই ঝাঁটাটি তুলে নিচ্ছে। জিব আর দাঁত দিয়ে ধরে সে ঝাঁটাকে নিজের শরীরের পেছনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। কয়েক দিনের মধ্যে ৭০টি পরীক্ষায় সে মোট ৭৬ বার ঝাঁটা দিয়ে নিজেকে চুলকিয়েছে। সময়টা ছিল গ্রীষ্মকাল। চারপাশে ঘুরছিল হর্স-ফ্লি বা ঘোড়ামাছি। চুলকানি কমানোর জন্য এই কাজ করছিল ভেরোনিকা।

শুরুতে বিজ্ঞানীরা লক্ষ করেন, ভেরোনিকা বেশির ভাগ সময় ব্রিসলওয়ালা অংশ দিয়েই পিঠ চুলকাচ্ছে। কিন্তু মাঝেমধ্যে সে ঝাঁটার কাঠের হাতল দিয়েও নিজেকে হালকা খোঁচাচ্ছিল। প্রথমে এটাকে ভুল মনে হয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একটি স্পষ্ট প্যাটার্ন ধরা পড়ে। যখন ভেরোনিকা পিঠের মোটা, শক্ত চামড়ার অংশ চুলকাত, তখন ব্যবহার করত শক্ত ব্রিসল। আর যখন পেটের নরম অংশ, যেমন ওলান বা ঝুলে থাকা ত্বকের দিকে ঝাঁটা নিয়ে যেত, তখন সে ব্যবহার করত কাঠের হাতল। নরমভাবে ঠেলতে বা আলতো করে ছোঁয়াতে। মানে ভেরোনিকা বুঝে নিচ্ছিল কোন জায়গায় কোন ধরনের স্পর্শ দরকার।

এটা কোনো ভুল ছিল না। ইচ্ছা করেই এমন করেছে এই গরু। প্রাণিজগতে এমন আচরণ খুবই বিরল। শিম্পাঞ্জি, হাতি, কাক, ডলফিন বা অক্টোপাসের মতো প্রাণীদের মধ্যে এর উদাহরণ আছে। কিন্তু গরুর ক্ষেত্রে এই প্রথম।

আরও পড়ুন

জার্মানির রিসার্চ ইনস্টিটিউট ফর ফার্ম অ্যানিমেল বায়োলজির গবেষক ক্রিশ্চিয়ান নাওরথ, যিনি এই গবেষণায় যুক্ত ছিলেন না। তিনি বলেন, ঘটনাটি বিশ্বাসযোগ্য। তাঁর মতে, ‘খামারের প্রাণীদের সম্পর্কে আমাদের ধারণা আর তাদের প্রকৃত সক্ষমতার মধ্যে এখনো বড় ফারাক রয়ে গেছে। আমরা জানি, এরা অনুভূতিসম্পন্ন, সমস্যা সমাধান করতে পারে। কিন্তু তবু আমরা এদের কমই গুরুত্ব দিই।’

ভেরোনিকার জীবন অবশ্যই ব্যতিক্রম। তবু গবেষকেরা জানাচ্ছেন, অনানুষ্ঠানিকভাবে আরও কিছু গরু ও ষাঁড়ের এমন আচরণের ভিডিও পাওয়া গেছে, বিশেষ করে ব্রাহমা জাতের গরুর মধ্যে। ইউরোপীয় গরুদের থেকে এই প্রজাতির বিচ্ছেদ ঘটেছে প্রায় পাঁচ লাখ বছর আগে। তবু উভয়ের মধ্যেই যদি এমন ক্ষমতা দেখা যায়, তাহলে বোঝা যায়, এই দক্ষতা গরুর স্বভাবের গভীর কোথাও লুকিয়ে আছে।

গবেষণার শেষে আউয়ার্সপার্গ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরেছেন। হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ গরুর সঙ্গে বসবাস করছে। তবু আমরা কি সত্যিই এদের চিনতে পেরেছি?

সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস

আরও পড়ুন