মেসি ও ইয়ামালের সেই ছবির পেছনের গল্প
মেসির সঙ্গে শিশু ইয়ামালের সেই বিখ্যাত ছবিটির পেছনের গল্পটি বেশ মজার। আসলে ছবিটি তোলা হয়েছিল একটি লটারির মাধ্যমে। এই অসাধারণ গল্পের শুরু হয়েছিল যখন ইয়ামালের বয়স ছিল মাত্র ছয় মাস। আর মেসি তখন ২০ বছরের এক তরুণ ফুটবলার।
ঘটনাটা কী
তখন লিওনেল মেসি ছিলেন বার্সেলোনার ২০ বছরের তরুণ ফুটবলার। ঠিক সেই সময়ে তিনি ছয় মাস বয়সী শিশু ইয়ামালকে গোসল করানোর একটি ছবির জন্য পোজ দিয়েছিলেন। তখন ছবির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা কেউই জানতেন না, এ ছবিটাই একদিন ইতিহাস তৈরি করবে।
বার্সেলোনার বিখ্যাত লা মাসিয়া একাডেমি থেকে উঠে আসা মেসি তখন দুর্দান্ত খেলে বিশ্বের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হয়ে উঠছিলেন। অন্যদিকে ইয়ামালের পরিবারও ভাবেনি তাদের এই ছোট্ট শিশুটি একদিন মেসির মতোই ফুটবলের বড় তারকা হবে।
পরবর্তী সময়ে বার্সেলোনার যে সোনালি দল তৈরি হচ্ছিল, তার মূল খেলোয়াড় ছিলেন মেসি। আর আজ ইয়ামালও মেসির মতোই সেই ‘লা মাসিয়া’ একাডেমি থেকে বড় হয়ে বার্সেলোনার তারকা খেলোয়াড় হয়ে উঠছেন।
আজ রাতে ফাইনালে তাঁরা প্রথমবারের মতো একে অপরের বিরুদ্ধে মাঠে নামবেন। একদিকে মেসি আর্জেন্টিনাকে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জেতাতে নিজের সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করবেন। অন্যদিকে তরুণ ইয়ামাল চাইবেন ২০১০ সালের পর স্পেনকে আবার বিশ্বজয়ের ট্রফি এনে দিতে।
কীভাবে ঘটেছিল সেই ঐতিহাসিক ঘটনা
২০০৭ সালের সেই সুন্দর মুহূর্তটি তৈরি হয়েছিল স্প্যানিশ খেলাধুলার পত্রিকা দিয়ারিও স্পোর্ত-এর একটি লটারির মাধ্যমে। লটারির মূল উদ্দেশ্য ছিল শিশুদের সহায়তাকারী সংস্থা ইউনিসেফের জন্য তহবিল বা টাকা সংগ্রহ করা। ইউনিসেফ তখন বার্সেলোনা ক্লাবের সহযোগী ছিল।
এই লটারির পুরস্কারটি ছিল দারুণ। বার্সেলোনার তারকা খেলোয়াড়দের সঙ্গে একটি ক্যালেন্ডারের জন্য ছবি তোলার সুযোগ পেত বিজয়ী পরিবারগুলো। ইয়ামালের পরিবার বার্সেলোনার স্টেডিয়াম থেকে প্রায় ২৫ মাইল দূরের মাতারো নামের একটি ছোট শহরে থাকত। হাজারো পরিবারের মধ্যে ভাগ্যবতী হিসেবে তারা এই লটারি জিতে নেয়।
প্রতিবছর শত শত পরিবার এই লটারিতে অংশ নিত, তাই জেতার সুযোগ ছিল খুবই কম। আর লটারি জিতলেও যে মেসির সঙ্গেই ছবি তোলার সুযোগ মিলবে, তারও কোনো নিশ্চয়তা ছিল না।
কিন্তু ভাগ্য ভালো থাকায় সবকিছু মিলে যায়। ছবিতে দেখা যায়, একটি নীল রঙের বাথটাবে ছোট্ট শিশু ইয়ামালকে কোলে নিয়ে আছেন তরুণ মেসি। ছবিটি ২০০৮ সালের একটি ক্যালেন্ডারে ছাপা হয়েছিল। এর সঙ্গে আরও দুটি ছবি ছিল। একটিতে মেসি তোয়ালে জড়ানো ইয়ামালকে কোলে নিয়ে আছেন, অন্যটিতে ইয়ামালের মা তাঁর ছেলেকে গোসল করাতে সাহায্য করছেন।
ক্যালেন্ডারে ছবি ছাপানোর পর এটা নিয়ে আর তেমন কোনো কথা হয়নি। বলা যায়, ছবিগুলো অনেক বছর ধরে সবার অজানাই ছিল। ২০২৪ সালের ইউরো কাপ চলার সময় ইয়ামালের বাবা ছবিটি ইন্টারনেটে পোস্ট করেন। তিনি ক্যাপশনে লিখেছিলেন, ‘দুই কিংবদন্তির পথচলার শুরু।’ এর পরেই ছবিটি ভাইরাল হয়।
কী বলেছিলেন সেই আলোকচিত্রী
ঐতিহাসিক এই ছবি তুলেছিলেন ফটোগ্রাফার হুয়ান মনফোর্ত। তিনি সে সময় অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস নামের একটি সংবাদ সংস্থায় কাজ করতেন। ফুটবলের এ দুই তারকার একসঙ্গে হওয়াকে তিনি কোটিতে একটা সুযোগ বলে মনে করেন।
মনফোর্ত জানান, ছবিটা তোলা মোটেও সহজ ছিল না। তখন লিওনেল মেসির বয়স ছিল ২০ বছর এবং তিনি বেশ লাজুক ছিলেন। হঠাৎ করেই তিনি স্টেডিয়ামের ড্রেসিংরুমে প্লাস্টিকের বাথটাবের পানিতে ছয় মাসের এক শিশুকে দেখেন। শুরুতে মেসি আর শিশু ইয়ামালের মধ্যে কোনো চেনাজানা ছিল না। তাই প্রথম দিকে পরিবেশটা একটু থমথমে ছিল। তবে আস্তে আস্তে সবকিছু সহজ হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত একটি চমৎকার ছবি ওঠে।
মনফোর্ত আরও বলেন, পুরো ঘটনাটি অবিশ্বাস্য। তখন কেউ ভাবতেও পারেনি এই ছোট শিশুটি বড় হয়ে আজকের লামিনে ইয়ামাল হবে। আর মেসি যে ফুটবলের এত বড় তারকা হবেন, সেটাও তখন নিশ্চিত ছিল না।
২০০৭ সালের দিকে মেসি কেবল বার্সেলোনা দলে নিয়মিত খেলা শুরু করেছিলেন। ফটোগ্রাফার মনফোর্ত বলেন, ক্যালেন্ডারের ১২ মাসের জন্য ১২ জন খেলোয়াড়ের তালিকা ছিল। সাধারণত খেলোয়াড়েরা এসে তাড়াহুড়া করে ছবি তুলে চলে যেতে চান। কিন্তু এ ধরনের ছবির জন্য কিছুটা সময় দিতে হয়। যাতে দুজন অচেনা মানুষের ছবি সুন্দর আসে। তার ওপর একজন যখন ছোট্ট শিশু আর অন্যজন ২০ বছরের তরুণ, তখন কাজটা আরও কঠিন হয়ে যায়।
তবে ছবি তোলার সময় ইয়ামালের মা ড্রেসিংরুমে থাকায় কাজটি অনেক সহজ হয়েছিল। মায়ের উপস্থিতির কারণে শিশু ইয়ামাল ভয় পায়নি, শেষ পর্যন্ত একটি মিষ্টি ও সুন্দর ছবি তোলা সম্ভব হয়েছিল।