পাঙাশ মাছ এত দ্রুত বড় হয় কীভাবে

প্রায় ২১ কেজি ৫০০ গ্রাম ওজনের পাঙাশ মাছটি নিলামে কিনে অন্যত্র বিক্রি করেন মৎস্য ব্যবসায়ী চান্দু মোল্লাছবি: প্রথম আলো

পাঙাশের পুকুরে একবার হাত ডোবালে বুঝবে, জিনিসটা কতটা অদ্ভুত। পানি ঘোলাটে, প্রায় দুধ-চা রঙের, আর সেই ঘোলা পানিতেই হাজার হাজার মাছ গাদাগাদি করে সাঁতরাচ্ছে। কোনো নদীতে এত ঘন করে মাছ বাঁচতে পারত না, দমবন্ধ হয়ে মারা যেত। পাঙাশ মরে না অবশ্য। ছয়-সাত মাসেই এই ঘিঞ্জি পুকুরে হয়ে ওঠে বাজারের সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে সস্তা মাছ।

রহস্যটা লুকিয়ে আছে পাঙাশের শরীরের একটা গোপন অঙ্গে।

সাধারণ মাছ ফুলকা দিয়ে পানি থেকে অক্সিজেন টানে, পানিতে অক্সিজেন কমে গেলে ভেসে ওঠে, তারপর মারা যায়। পাঙাশের এ সমস্যা নেই। শিং, মাগুর, কই—বাংলার এসব মাছেরও একই ধরনের বাড়তি শ্বাসযন্ত্র আছে, তফাত শুধু গঠনে। শিঙের বায়ুথলি, মাগুরের আরবোরিসেন্ট অঙ্গ, কইয়ের ল্যাবিরিন্থ। পাঙাশের মুখগহ্বরের কাছে থাকা অঙ্গটা দিয়েও সে সরাসরি বাতাস থেকে অক্সিজেন গিলে নিতে পারে।

তার মানে পুকুরের পানি যতই ঘোলা হোক, অক্সিজেন যতই কমে আসুক, মাঝেমধ্যে পানির ওপরে মুখ তুলে একঢোঁক বাতাস টেনে নিলেই পাঙাশের চলে। চাষিরা তাই একই পুকুরে হাজার হাজার মাছ ছেড়ে দিতে পারেন। রুই বা কাতলার বেলায় যেটা করলে সব মাছ মরে ভেসে উঠত। ঘন করে মাছ ছাড়া মানেই কম জায়গায় বেশি উৎপাদন।

আরও পড়ুন

দ্বিতীয় ব্যাপারটা পাঙাশের খাবার হজমের ক্ষমতা নিয়ে। পাঙাশ সর্বভুক—শামুক খায়, কীটপতঙ্গ খায়, পচা উদ্ভিদও খেয়ে হজম করে ফেলে। চাষের পুকুরে অবশ্য দেওয়া হয় আলাদাভাবে তৈরি সম্পূরক খাদ্য, যাতে প্রোটিনের পরিমাণ থাকে ২৫ থেকে ৩২ শতাংশের মধ্যে। খাদ্যের মান যত ভালো, বৃদ্ধিও তত দ্রুত।

প্রশ্ন হতে পারে, প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার তো অনেক মাছকেই দেওয়া হয়, তাহলে পাঙাশ আলাদা কীভাবে? পার্থক্যটা আসলে হজমক্ষমতায়। পাঙাশের পাকস্থলী আর অন্ত্র এমনভাবে তৈরি যে খাবারের প্রায় পুরোটাই সে শরীরে রূপান্তরিত করে ফেলে, নষ্ট হয় সামান্যই। একই পরিমাণ খাবারে একটা রুই মাছ যতটুকু ওজন বাড়ায়, পাঙাশ অনেক কম খেয়েই সেই ওজন ছুঁয়ে ফেলে। এ হিসাবকে খামারিরা বলেন ফিড কনভার্সন রেশিও।

উষ্ণতাও একটা বড় কারণ। মাছ ঠান্ডা রক্তের প্রাণী, শরীরের তাপমাত্রা পানির সঙ্গেই ওঠানামা করে তাদের। পানি গরম থাকলে বিপাক দ্রুত হয়, খাবার তাড়াতাড়ি হজম হয়। বাংলাদেশে এপ্রিল-মে মাসের উষ্ণ পানি পাঙাশের জন্য প্রায় আদর্শ পরিবেশ আর যে মেকং নদীর অববাহিকায় এ মাছের আদি নিবাস, সেখানকার আবহাওয়াও একই রকম উষ্ণ, আর্দ্র। এ মিলের কারণেই হয়তো ভিয়েতনামের এ স্থানীয় মাছ বাংলাদেশে এসে এতটা সহজে মানিয়ে নিয়েছে।

স্বাভাবিক অবস্থায় একটা মাছের পূর্ণবয়স্ক হতে বছর দুয়েক সময় লাগতে পারে। পাঙাশের বেলায় সেটা নেমে আসে ছয় থেকে আট মাসে। একটা ছোট্ট পোনা থেকে কেজিখানেক ওজনের মাছ হয়ে ওঠা—ছয় মাসে ঘটে যায় পুরোটা।

আরও পড়ুন

পাঙাশের এত দ্রুত বেড়ে ওঠার পেছনে অবশ্য শুধু তার নিজের শারীরতত্ত্ব নয়, চাষির কৌশলও কম দায়ী নয়। এক একর পুকুরে ঠিক কতটা পোনা ছাড়া হবে, তার একটা হিসাব থাকে। ঘনত্ব বেশি হলে বৃদ্ধি কমে যায়, আবার কম হলে জায়গা নষ্ট। অভিজ্ঞ চাষিরা তাই পানির রং দেখে, মাছের নড়াচড়া দেখে বুঝে ফেলেন যে কখন সম্পূরক খাবার বাড়াতে হবে, কখন কমাতে হবে। শীতকালে যেমন মাছের খাদ্যগ্রহণ কমে যায়, তখন খাবারও কমিয়ে দিতে হয়, নইলে পানি নষ্ট হয়ে রোগবালাই দেখা দেয়।

ব্রুডস্টক বা প্রজননক্ষম মাছ বাছাইয়েও চলে সতর্ক নজরদারি। যেসব পোনা দ্রুত বাড়ে, স্বাস্থ্যবান থাকে, বছরের পর বছর সেগুলো থেকেই ডিম সংগ্রহ করা হয়—একটা ধীর, ক্রমাগত বাছাইপ্রক্রিয়া, যাকে বলা যায় নির্বাচিত প্রজনন। এভাবেই কয়েক দশকে পাঙাশের জাত এমনভাবে গড়ে উঠেছে যে আগের চেয়ে অনেক কম সময়ে, অনেক কম খরচে এটি পূর্ণ আকার পায়।

এত দ্রুত বেড়ে ওঠা মাছটা স্বাস্থ্যের জন্য কতটা ভালো, সেটা নিয়ে অবশ্য তর্ক চলে। প্রতি ১০০ গ্রাম পাঙাশে চর্বি থাকে ৮ থেকে ১০ গ্রামের মতো, যার একটা অংশ স্যাচুরেটেড ফ্যাটও। আবার এ মাছের প্রোটিনে অত্যাবশ্যকীয় অ্যামাইনো অ্যাসিডের পরিমাণ বেশ ভালো বলে জানাচ্ছেন পুষ্টিবিদেরা, সঙ্গে ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিডও আছে যথেষ্ট।

পরেরবার প্লেটে পাঙাশ মাছ দেখলে একবার ভেবো, মাছটা ছয় মাস আগে ছিল আঙুলের সমান একটা পোনামাত্র। যে অঙ্গ তাকে অক্সিজেনহীন ঘোলা পানিতেও বাঁচিয়ে রেখেছিল, সেটাই আজ তোমার প্লেটে তুলে দিয়েছে এত সস্তায় এত বড় একটা মাছ। একটা ছোট্ট শারীরবৃত্তীয় কৌশল বদলে দিয়েছে বাংলাদেশের হাজার হাজার পুকুরের অর্থনীতি।

সূত্র: ফিশ ইনফো

আরও পড়ুন