দুই সপ্তাহে ১৪ বার চুরি, জাপানে পলাতক ভালুক খুঁজছে পুলিশ
জাপানের ইওয়াতে প্রিফেকচারের শিজুকুয়িশি শহরের পুলিশ কর্মকর্তারা একটি ভালুককে খুঁজছেন। ভালুকটি এক বয়স্ক দম্পতির বাড়িতে ঢুকে ফ্রিজ খুলে খাবার খেয়ে ফেলেছে। কর্মকর্তাদের ধারণা, গত দুই সপ্তাহে ওই শহরে ঘটে যাওয়া ১৪টি চুরির ঘটনার পেছনেও এই একই ভালুক জড়িত।
গত ১৩ জুলাই, সোমবার সন্ধ্যার ঘটনা। ৮৭ বছর বয়সী মিতসুও মাতসুবা রান্নাঘরে অদ্ভুত এক শব্দ পেয়ে সেখানে যান। ঘরের ভেতরে পা রাখতে তিনি এক বিশাল এশীয় কালো ভালুক দেখেন। ভালুকটি রান্নাঘরের ফ্রিজ খুলে মেঝেতে খাবার ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ফেলছিল। এ দৃশ্য দেখে তার স্ত্রী দ্রুত পুলিশকে খবর দেন।
জাপানের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের শিজুকুয়িশি নামের ওই শহরে এখন পর্যন্ত অন্তত পাঁচটি বাড়িতে এমন ঘটনা ঘটেছে। একের পর এক এমন কাণ্ড দেখে বন বিভাগের কর্মকর্তারা সন্দেহ করছেন, একটি নির্দিষ্ট ভালুকই বারবার এই চুরির অপরাধটি করে বেড়াচ্ছে। চোর ভালুকটিকে ধরতে তারা এখন বিভিন্ন জায়গায় বাক্সের মতো বিশেষ ফাঁদ পেতেছেন। এ ছাড়া ভালুকটির বারবার টার্গেট করা বাড়িগুলোর চারপাশে বসানো হয়েছে বৈদ্যুতিক বেড়া। পাশাপাশি স্থানীয় মানুষকে সতর্ক ও নিরাপত্তা দিতে টহল দলও নামানো হয়েছে।
শহরের বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞ শিহো চিদা বলেন, ‘একই এলাকায় একটি ভালুকের বারবার এভাবে হানা দেওয়াটা বেশ অস্বাভাবিক। আমাদের ধারণা, সব কটি চুরির পেছনে একই ভালুক জড়িত রয়েছে। তাই আমরা যত দ্রুত সম্ভব এটিকে খাঁচাবন্দী করতে চাই।’
গত কয়েক সপ্তাহে ভালুকটি চারবার একটি দুগ্ধ খামারে ঢুকে গরুর খাবার খেয়ে ফেলেছে। এক রাতে খামারবাড়ির স্লাইডিং দরজা খোলার চেষ্টা করার সময় ভালুকটি সিসিটিভি ক্যামেরায় ধরা পড়ে। তবে খামারি আলো জ্বেলে জোরে চিৎকার করলে ভালুকটি পালিয়ে যায়। ভালুক তাড়ানোর জন্য খামারি একটি উপায় বের করেছেন। ভালুক যেন আর খামারে না আসে, সে জন্য তিনি প্রবেশপথের চারপাশে জাপানি শর্ষে দিয়ে তৈরি একধরনের মিশ্রণ ছিটিয়ে রাখছেন।
খামারি এই অভিনব উপায়টি বের করেছেন কারণ জাপানি শর্ষে তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধযুক্ত। ভালুকের ঘ্রাণশক্তি অত্যন্ত প্রখর ও সংবেদনশীল। এই তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধ ভালুকের সহ্য হয় না এবং এটি তাদের শ্বাসযন্ত্রে অস্বস্তি তৈরি করে। ফলে শর্ষের মিশ্রণের গন্ধ পেলে ভালুকটি আর খামারের কাছাকাছি ঘেঁষতে চায় না।
গত শুক্রবার আরেকজন বাসিন্দা কেনাকাটা শেষে বাড়ি ফিরে দেখেন, তাঁর বৃদ্ধ বাবার ঘুমানোর ঘরের পাশে একটি ভালুক ঢুকে পড়েছে। তিনি পাশের একটি দরজায় জোরে ধাক্কা দিলে ভালুকটি বাইরে চলে যায়। কিন্তু ভালুকটি আবার পেছনের দুই পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে ঘরের ভেতর ঢোকার চেষ্টা করে। তখন ওই ব্যক্তি প্রায় ৩০ সেকেন্ড ধরে স্লাইডিং দরজাটি চেপে ধরে রাখেন, যাতে ভালুকটি ভেতরে ঢুকতে না পারে। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, দুই পায়ে দাঁড়ানো অবস্থায় ভালুকটি প্রায় সাড়ে ৫ ফুট উঁচু ছিল।
পরের দিন সন্ধ্যায় আরেকজন নারী তাঁর রান্নাঘরে একটি ভালুককে খাবার খুঁজতে দেখেন। এরপর গত রোববার ভালুকটি একটি জাপানি মিষ্টির দোকানে ঢুকে ফ্রিজ থেকে ডোনাট নিয়ে যায়। মিষ্টিজাতীয় খাবারের খোঁজে ভালুকটি একটি বাড়িতেই পাঁচবার ঢুকেছে। সেখানে ঢুকে ভালুকটি কুকিজ, চিনি ও ময়দা দিয়ে তৈরি ও চিনির প্রলেপযুক্ত একধরনের জাপানি মিষ্টি খেয়েছে।
জাপানের বিভিন্ন অঞ্চলে গরম আবহাওয়া চলতে থাকায় সম্প্রতি ভালুক দেখতে পাওয়ার ঘটনা অনেক বেড়েছে। এমনকি ভালুকের আক্রমণ ও মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জাপানের গ্রামাঞ্চলে জনসংখ্যা কমে যাওয়ায় ভালুকদের লোকালয়ে চলে আসা সহজ হয়েছে। মানুষের উপস্থিতি কমে যাওয়ায় ভালুকগুলো মানুষকে আর আগের মতো ভয় পায় না।
ভালুক এত বেড়ে যাওয়ায় উত্তর জাপানের হোক্কাইডোতে অবস্থিত রাউসু পর্বতের হাইকিং পথগুলো একটি বাদামি ভালুকের কারণে সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তবে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিরাপদ হলে ১ হাজার ৬৬০ মিটার উঁচু এই পর্বতটি আরোহীদের জন্য আবারও খুলে দেওয়া হচ্ছে।