মহাকর্ষ ও স্পেসটাইম

ছবি: নাসা

আইনস্টাইনের মহাকর্ষ তত্ত্ব নিয়ে কথা বলার আগে আমাদের দুটি বিষয় নিয়ে একটু পরিষ্কার ধারণা থাকা দরকার। চতুর্থ মাত্রা এবং নন-ইউক্লিডিয়ান জ্যামিতি। হারম্যান মিনকভস্কি নামে এক পোলিশ গণিতবিদ আপেক্ষিকতা তত্ত্বকে এই চার মাত্রার স্থান-কালের সাহায্যে খুব সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন। মজার ব্যাপার হলো, এই অধ্যায়ের অনেক ধারণাই আইনস্টাইনের যতটা, ঠিক ততটাই মিনকভস্কিরও! এই মিনকভস্কি কিন্তু আইনস্টাইনের শিক্ষক ছিলেন।

যাহোক, জ্যামিতির একটা সাধারণ বিন্দুর কথা ধরো। বিন্দুর কিন্তু কোনো মাত্রা বা ডাইমেনশন নেই। বিন্দুটিকে যদি সোজা এক দিকে টেনে নাও, তবে সেটি একটি রেখা তৈরি করবে, এটি হলো একমাত্রিক। এবার রেখাটিকে যদি এর সমকোণে বা আড়াআড়িভাবে টানো, তবে এটি একটা সমতল পৃষ্ঠ তৈরি করবে, যা দ্বিমাত্রিক। কাগজের পাতা হলো দ্বিমাত্রিক। এই সমতলটিকে যদি আবার তার সমকোণে (ওপরের দিকে) টানো, তবে এটি ত্রিমাত্রিক একটা স্থান তৈরি করবে। যেমন একটা চারকোনা বাক্স। আমরা আমাদের কল্পনায় ঠিক এই পর্যন্তই যেতে পারি!

কিন্তু একজন গণিতবিদ এর চেয়েও দূরে যেতে পারেন। তিনি কল্পনায় ছবি এঁকে নয়, বরং অঙ্কের হিসাব কষে ত্রিমাত্রিক স্পেসকেও তার তিন মাত্রার সমকোণে টেনে নেওয়ার কথা ভাবতে পারেন! ঠিক এভাবেই তৈরি হয় চার মাত্রার ইউক্লিডিয়ান স্পেস। শুধু চার মাত্রাতেই থেমে থাকার কোনো দরকার নেই। আমরা চাইলে পাঁচ, ছয়, সাত বা তার চেয়েও বেশি মাত্রার স্থানের কথা ভাবতে পারি! এর সবই হলো ইউক্লিডিয়ান স্পেস। দ্বিমাত্রিক জ্যামিতিকে বাড়িয়ে যেমন ত্রিমাত্রিক জ্যামিতি তৈরি হয়েছে, এগুলোও ঠিক সেভাবেই ইউক্লিডিয়ান জ্যামিতিরই আরও বড় রূপ।

ইউক্লিডিয়ান জ্যামিতি বেশ কিছু স্বীকার্য বা নিয়মের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এর মধ্যে খুব বিখ্যাত একটি হলো সমান্তরাল স্বীকার্য। এই নিয়মে বলা হয়েছে, ধরো একটা সমতলের ওপর একটা রেখা টানা আছে। রেখাটির বাইরে আছে একটা বিন্দু। তুমি ওই বিন্দুর ওপর দিয়ে প্রথম রেখাটির সমান্তরাল করে শুধু একটি রেখাই আঁকতে পারবে। যে সমতলে এই নিয়মটি খাটে, তাকে বলা হয় একেবারে সমতল। এর কোনো বক্রতা নেই। অর্থাৎ এটি কোথাও বাঁকা নয় এবং এর সীমানাও অসীম।

আর নন-ইউক্লিডিয়ান জ্যামিতি হলো এমন এক জ্যামিতি, যেখানে এই সমান্তরাল স্বীকার্যের বদলে অন্য কোনো নিয়ম ব্যবহার করা হয়। এই কাজটা মূলত দুটি ভিন্ন উপায়ে করা যায়।

প্রথম উপায়টির নাম উপবৃত্তাকার জ্যামিতি। এই নিয়মে বলা হয়, রেখার বাইরের ওই বিন্দুটি দিয়ে তুমি প্রথম রেখাটির সমান্তরাল করে কোনো রেখাই আঁকতে পারবে না! একটা গোলকের, ধরো ফুটবলের ওপরের পিঠকে তুমি এই নন-ইউক্লিডিয়ান সমতলের একটা মোটামুটি উদাহরণ হিসেবে ধরতে পারো। যদিও এটা একদম নিখুঁত নয়। গোলকের ওপর তুমি সবচেয়ে সোজা যে রেখাটি আঁকতে পারবে, সেটা আসলে একটা বিশাল বৃত্ত। একে গ্রেট সার্কেল বা মহাবৃত্ত বলে। এমন যেকোনো মহাবৃত্ত আঁকলে তারা একে অপরকে কোথাও না কোথাও ছেদ করবেই। তাই গোলকের ওপর দুটি মহাবৃত্ত কখনোই একে অপরের সমান্তরাল হতে পারে না। এই ধরনের নন-ইউক্লিডিয়ান সমতলের বক্রতাকে বলা হয় ধনাত্মক বক্রতা। এই বক্রতার কারণে সমতলটি চারদিক থেকে ঘুরে এসে আবার নিজের সঙ্গেই মিলে যায়। তাই এর জায়গা বা আয়তন অসীম না হয়ে নির্দিষ্ট বা সসীম হয়।

আরও পড়ুন

দ্বিতীয় ধরনের নন-ইউক্লিডিয়ান জ্যামিতিকে বলা হয় অধিবৃত্তাকার জ্যামিতি। এই নিয়মে সমান্তরাল স্বীকার্যের বদলে বলা হয়, রেখার বাইরের বিন্দুটি দিয়ে তুমি প্রথম রেখাটির সমান্তরাল করে অসীম সংখ্যক বা অসংখ্য রেখা আঁকতে পারবে! ঘোড়ার পিঠে বসার জন্য যে জিন বা স্যাডেল ব্যবহার করা হয়, তার আকৃতি দেখলে এই ধরনের সমতলের একটা মোটামুটি ধারণা পাওয়া যায়। এই ধরনের সমতলের বক্রতাকে বলা হয় ঋণাত্মক বক্রতা। এটি আগেরটির মতো ঘুরে এসে নিজের সঙ্গে মিলে যায় না, বরং সাধারণ ইউক্লিডিয়ান সমতলের মতোই এটি সব দিকে অসীম পর্যন্ত ছড়ানো থাকে।

উপবৃত্তাকার এবং অধিবৃত্তাকার—এই দুই জ্যামিতিই হলো ধ্রুব বক্রতার নন-ইউক্লিডিয়ান জ্যামিতি। মানে এদের তল সব জায়গায় সমানভাবে বাঁকা থাকে। কোনো জিনিস এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় গেলে তার আকারের কোনো বিকৃতি ঘটে না। কিন্তু নন-ইউক্লিডিয়ান জ্যামিতির আরও সাধারণ একটি রূপ আছে, যাকে জেনারেল রিমানিয়ান জ্যামিতি বলা হয়। এই জ্যামিতির নিয়মে সমতলের বক্রতা একেক জায়গায় একেক রকম হতে পারে!

ইউক্লিডিয়ান জ্যামিতিতে যেমন ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৭...বা আরও বেশি মাত্রার জ্যামিতি থাকতে পারে, তেমনি নন-ইউক্লিডিয়ান জ্যামিতিতেও ঠিক সেভাবে অনেক মাত্রার জ্যামিতি থাকতে পারে।

আপেক্ষিকতার সার্বিক তত্ত্ব দাঁড় করানোর সময় আইনস্টাইন বুঝতে পারেন, তাঁকে এই চার মাত্রার জেনারেল রিমানিয়ান জ্যামিতির সাহায্য নিতে হবে। তবে তিনি চতুর্থ মাত্রা হিসেবে স্থানের কোনো মাত্রাকে ব্যবহার না করে, সময়কে চতুর্থ মাত্রা হিসেবে ধরে নিলেন!

এই ধারণাটার মধ্যে কিন্তু কোনো রহস্য বা ভুতুড়ে ব্যাপার নেই! এর মানে শুধু একটাই—এই মহাবিশ্বে যা কিছুই ঘটে, তার সবকিছুই আসলে স্থান-কালের চার মাত্রার জগতে ঘটে।

একটা সহজ উদাহরণ দিলে বিষয়টা একদম পরিষ্কার হয়ে যাবে। ধরো, তুমি সন্ধ্যা সাতটায় গাড়িতে উঠে বাড়ি থেকে একটা রেস্তোরাঁয় রওনা দিলে। রেস্তোরাঁটা তোমার বাড়ি থেকে ৩ কিলোমিটার দক্ষিণে এবং ৪ কিলোমিটার পূর্বে। এখন একটা দ্বিমাত্রিক ম্যাপ বা সমতলে তোমার বাড়ি থেকে রেস্তোরাঁর আসল দূরত্বটা হবে একটা সমকোণী ত্রিভুজের অতিভুজের সমান, যার এক দিক ৩ কিলোমিটার এবং অন্য দিক ৪ কিলোমিটার। পিথাগোরাসের সূত্র দিয়ে হিসাব করলে এই অতিভুজের দৈর্ঘ্য দাঁড়াবে ঠিক ৫ কিলোমিটার।

কিন্তু রেস্তোরাঁয় পৌঁছাতে তো তোমার কিছুটা সময়ও লেগেছে, তাই না? ধরো, তোমার ১০ মিনিট সময় লাগল। এই সময়টা তুমি চাইলে একটা ত্রিমাত্রিক গ্রাফে দেখাতে পারো। এই গ্রাফের একদিকে থাকবে দক্ষিণের দূরত্ব, আরেক দিকে পূর্বের। আর একদম খাড়া বা লম্ব দিকের দাগটা বোঝাবে তোমার পার হওয়া সময় (মিনিটে)। এই স্থান-কালের ত্রিমাত্রিক গ্রাফে তোমার যাত্রা শুরুর এবং রেস্তোরাঁয় পৌঁছানোর দুটি ঘটনার মাঝখানের দূরত্বটাকে একটা সোজা রেখা দিয়ে দেখানো যায়।

আরও পড়ুন

মনে রেখো, এই সোজা রেখাটা কিন্তু তোমার আসল যাত্রার কোনো গ্রাফ নয়। এটি শুধু ঘটনা দুটির মাঝখানের স্থান-কালের দূরত্বের একটা মাপ। তোমার আসল যাত্রার গ্রাফ আঁকতে গেলে সেটা হবে একটা জটিল ও প্যাঁচানো বাঁকা রেখা! কারণটা খুব সহজ। গাড়ি ছাড়ার সময় তুমি গতি বাড়িয়েছিলে, রাস্তার বাঁকের কারণে তুমি একদম সোজা রেখায় গাড়ি চালাতে পারোনি, হয়তো ট্রাফিক সিগন্যালে ব্রেক কষে থামতেও হয়েছিল। আর রেস্তোরাঁয় পৌঁছে তো গাড়ি থামাতেই হয়েছিল। তোমার এই আসল যাত্রার জটিল ও আঁকাবাঁকা গ্রাফটাকেই আপেক্ষিকতা তত্ত্বে বলা হয় তোমার যাত্রার ওয়ার্ল্ড লাইন বা বিশ্বরেখা! এ ক্ষেত্রে, এটি হলো তিন মাত্রার স্থান-কালের একটি ওয়ার্ল্ড লাইন, অথবা একে অনেক সময় মিনকভস্কি থ্রি-স্পেসও বলা হয়।

তোমার গাড়ি চালানোর ঘটনাটা যেহেতু একটা দ্বিমাত্রিক সমতলে ঘটেছিল, তাই এর সঙ্গে শুধু সময়ের মাত্রাকে জুড়ে দিয়ে সহজেই একটা ত্রিমাত্রিক গ্রাফ আঁকা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু যখন কোনো ঘটনা আমাদের এই ত্রিমাত্রিক জগতেই ঘটে, তখন তার সঙ্গে সময়কে জুড়ে দিয়ে চার মাত্রার স্থান-কালের কোনো গ্রাফ তো আর কাগজে এঁকে দেখানো সম্ভব নয়! তবে মজার ব্যাপার হলো, গণিতবিদেরা খাতায় না এঁকেই অঙ্কের সাহায্যে দারুণভাবে এসব গ্রাফের হিসাব মেলাতে পারেন।

চলো, কল্পনায় চার মাত্রার জগতের একজন অতি-বিজ্ঞানীর কথা ভাবি! আমাদের সাধারণ বিজ্ঞানীরা যেমন সহজেই দ্বিমাত্রিক বা ত্রিমাত্রিক গ্রাফ আঁকতে পারেন, এই অতি-বিজ্ঞানী তেমনি সহজেই চার মাত্রার গ্রাফ আঁকতে পারেন। তাঁর গ্রাফের তিনটি মাত্রা হলো আমাদের জগতের সাধারণ তিনটি মাত্রা, মানে দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা। চতুর্থ মাত্রাটি হলো সময়। ধরো, একটা মহাকাশযান পৃথিবী থেকে উড়ে গিয়ে মঙ্গল গ্রহে নামল। আমাদের কল্পনার ওই অতি-বিজ্ঞানী তখন তাঁর চার মাত্রার গ্রাফে এই যাত্রার ওয়ার্ল্ড লাইন আঁকবেন একটা বাঁকা রেখা হিসেবে। রেখাটা বাঁকা হবে; কারণ, গতি বা ত্বরণ না বাড়িয়ে মহাকাশযানটি তো আর এই যাত্রা শেষ করতে পারবে না। আর ওই গ্রাফে রকেট ওড়া এবং মঙ্গলে নামার মাঝখানের স্থান-কালের ব্যবধানটা (পড়ো দূরত্ব) দেখাবে একদম সোজা একটা রেখা হিসেবে!

আপেক্ষিকতা তত্ত্বে প্রতিটি বস্তুকেই স্থান-কালের এই চার মাত্রার জগতে একেকটি চার মাত্রার কাঠামো হিসেবে ধরা হয়, যা তার নিজের ওয়ার্ল্ড লাইন ধরে কালের সীমানা ছাড়িয়ে অবস্থান করে। কোনো বস্তুকে যদি স্থানের তিনটি মাত্রার সাপেক্ষে স্থির বলেও ধরা হয়, তবু কিন্তু সেটি সময়ের মাত্রার ভেতর দিয়ে ঠিকই ভ্রমণ করছে! তখন তার ওয়ার্ল্ড লাইন হবে এমন একটা সোজা রেখা, যা গ্রাফের সময়ের অক্ষের একদম সমান্তরাল। আর বস্তুটি যদি সুষম গতিতে চলতে থাকে, তবে তার ওয়ার্ল্ড লাইনটি সোজাই থাকবে, কিন্তু সেটি আর সময়ের অক্ষের সমান্তরাল থাকবে না; কিছুটা হেলে যাবে। কিন্তু বস্তুটি যদি অসম গতি চলে, তবে তার ওয়ার্ল্ড লাইনটি হয়ে যাবে বাঁকা!

একদম নিখুঁতভাবে বলতে গেলে, কোনো বস্তু তার ওয়ার্ল্ড লাইন ধরে চলছে, এমনটা বলা উচিত নয়। কারণ, চলা বলতে সময়ের সঙ্গে স্থান পরিবর্তন করা বোঝায়, অথচ ওয়ার্ল্ড লাইনের ভেতরে তো সময় আগে থেকেই দেওয়া আছে! ওয়ার্ল্ড লাইন হলো ত্রিমাত্রিক জগতে কোনো বস্তুর গতিকে গ্রাফের সাহায্যে বোঝানোর একটা সুবিধাজনক উপায় মাত্র। মিনকভস্কির গ্রাফ এক অর্থে মহাবিশ্বের একটা স্থির বা সময়হীন ছবি ঠিকই, কিন্তু এর মানে এই নয় যে আমাদের বর্তমান দিয়ে আমাদের ভবিষ্যৎ পুরোপুরি নির্ধারিত হয়ে আছে। কোনো বস্তু যদি এলোমেলো বা অনিশ্চিতভাবেও চলতে থাকে, তার ওয়ার্ল্ড লাইনটাও ঠিক ততটা সহজেই গ্রাফে এঁকে ফেলা যায়, যতটা সহজে কোনো নির্দিষ্ট নিয়মে চলা বস্তুর গ্রাফ আঁকা যায়। একটা ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর, মিনকভস্কির গ্রাফ সেই ঘটনাটিকে একটা সময়হীন স্থির মহাবিশ্বে যেন আটকে দেয় ঠিকই; কিন্তু ওই ঘটনাটা ঠিক সেভাবেই ঘটার কথা ছিল কি না, তার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই।

এবার আমরা বিশেষ তত্ত্বের সেই লরেন্টজ-ফিটজেরাল্ড সংকোচনের ব্যাপারটা একদম নতুন একটা দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে পারি। সেটা হলো মিনকভস্কির দৃষ্টিকোণ, অথবা আমাদের কল্পনার সেই অতি-বিজ্ঞানীর দৃষ্টিকোণ!

আমরা আগেই দেখেছি, যখন দুটি মহাকাশযান আপেক্ষিক গতিতে একে অপরের পাশ দিয়ে পার হয়ে যায়, তখন প্রত্যেক যানের পর্যবেক্ষকের কাছে মনে হয় অন্য যানের আকার এবং তার ঘড়ির সময় বদলে গেছে। কেন এমন হয় জানো? কারণ, স্থান ও সময় কোনোটাই পরম নয়। এরা একে অপরের থেকে আলাদা বা স্বাধীন কোনো বিষয় নয়। বলা যায়, এগুলো হলো চার মাত্রার কোনো স্থান-কালের বস্তুর ছায়ার মতো! ধরো, একটা আলোর সামনে তুমি একটা বই ধরলে এবং একটা দ্বিমাত্রিক দেয়ালে তার ছায়া ফেললে। তুমি যদি বইটাকে একটু ঘুরিয়ে দাও, তবে দেয়ালে তার ছায়ার আকারও কিন্তু বদলে যাবে! বইটা একভাবে ধরলে ছায়াটা হবে একটা চওড়া আয়তক্ষেত্র।

বইটার আসল আকার কিন্তু একটুও বদলায় না, শুধু এর দ্বিমাত্রিক ছায়াটা বদলায়! একইভাবে, একজন পর্যবেক্ষক যখন একটা মহাকাশযানের (চার মাত্রার কাঠামো) দিকে তাকান, তখন তার নিজের গতির ওপর ভিত্তি করে যানটির আলাদা আলাদা ত্রিমাত্রিক ছায়া দেখতে পান। কখনো এই ছায়ায় স্থানের অংশ বেশি থাকে, সময়ের অংশ থাকে কম; আবার কখনো উল্টোটা হয়। অন্য যানের আকার ও সময়ে তিনি যে পরিবর্তনগুলো দেখেন, তা আসলে স্থান-কালের ভেতরে ওই যানের একধরনের ঘুরে যাওয়ার কারণে ঘটে। ফলে স্থান এবং কালের ওপর পড়া যানটির ছায়াও বদলে যায়।

১৯০৮ সালে জার্মান বিজ্ঞানী ও চিকিৎসকদের ৮০তম সম্মেলনে দেওয়া এক বিখ্যাত বক্তৃতার শুরুতে ঠিক এই কথাটিই মিনকভস্কির মাথায় ছিল। দ্য প্রিন্সিপল অব রিলেটিভিটি নামে একটি বইয়ে তাঁর এই বক্তৃতাটি ছাপা হয়েছিল। বইটি অবশ্য আইনস্টাইন এবং আরও কয়েকজন মিলে লিখেছিলেন। আপেক্ষিকতা নিয়ে লেখা কোনো সাধারণ বই-ই মিনকভস্কির এই বিখ্যাত উক্তিটি ছাড়া সম্পূর্ণ হতে পারে না। উক্তিটি হলো:

‘স্থান এবং কাল সম্পর্কে আমি আপনাদের সামনে যে ধারণা তুলে ধরতে চাই, তার জন্ম হয়েছে পরীক্ষামূলক পদার্থবিজ্ঞানের মাটি থেকে। আর এখানেই এর সবচেয়ে বড় শক্তি। এই ধারণাগুলো পুরোপুরি যুগান্তকারী। এখন থেকে শুধু স্থান কিংবা শুধু কাল বলে আর কিছু থাকবে না, এগুলো ধীরে ধীরে নিছক ছায়ায় পরিণত হবে। কেবল এই দুটির এক অদ্ভুত মিলনই একটি স্বাধীন ও সত্যিকারের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখবে।’

আরও পড়ুন

এখানে সবচেয়ে জরুরি যে ব্যাপারটা তোমার বুঝতে হবে তা হলো, মহাকাশযানটির স্থান-কালের কাঠামো বা চার মাত্রার কাঠামোটি কিন্তু পুরোনো পদার্থবিজ্ঞানের মতোই একেবারে অপরিবর্তনীয়। এটাই হলো বাতিল হয়ে যাওয়া লরেন্টজের সংকোচন তত্ত্ব এবং আইনস্টাইনের সংকোচন তত্ত্বের মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্য। লরেন্টজ ভেবেছিলেন, ত্রিমাত্রিক বস্তু সত্যিই ছোট হয়ে যায়। কিন্তু আইনস্টাইনের কাছে আসল বস্তুটি হলো চার মাত্রার একটি বস্তু, যার কোনো পরিবর্তনই হয় না! সহজ কথায়, আমরা শুধু বিভিন্ন কোণ থেকে বস্তুটিকে দেখি। স্থানের ওপর এর ত্রিমাত্রিক ছায়া এবং সময়ের ওপর এর একমাত্রিক ছায়া হয়তো বদলাতে পারে, কিন্তু স্থান-কালের চার মাত্রার মূল মহাকাশযানটি আগের মতোই অটুট থাকে।

আপেক্ষিকতা তত্ত্ব কীভাবে নতুন কিছু পরম বা চূড়ান্ত বিষয়ের জন্ম দেয়, এটা তার আরেকটা দারুণ উদাহরণ। একটা শক্ত বস্তুর এই চার মাত্রার আকারই হলো তার পরম এবং অপরিবর্তনীয় আকার। আমরা স্থান-কালকে এমনভাবে ভাগ করতে পারি যে মহাকাশযানের আকারটা নির্ভর করবে আমরা কোন প্রসঙ্গ কাঠামো থেকে মাপছি তার ওপর। কিন্তু জে জে সি স্মার্ট তাঁর প্রবলেমস অব স্পেস অ্যান্ড টাইম বইয়ের ভূমিকায় যেমনটা লিখেছেন, ‘আমরা একটা সসেজকে বিভিন্ন কোণ থেকে কেটে অনেকগুলো টুকরা করতে পারি ঠিকই, কিন্তু তার মানে এই নয় যে সসেজের আসল রূপটাই আমাদের ভুলে যেতে হবে!’

স্মার্ট আরও বলেছেন, ‘আপেক্ষিকতা তত্ত্ব স্থান ও কালের পরম বা আপেক্ষিক দর্শন নিয়ে কোনো চূড়ান্ত রায় দেয় না। এটি শুধু স্থান ও কালকে আলাদাভাবে দেখার বদলে, এদের দুটিকে মিলিয়ে একটা টানা স্থান-কাল কন্টিনুয়াম হিসেবে ভাবতে শেখায়।

ঠিক একই অর্থে, স্থান-কালের ভেতরে ঘটা যেকোনো দুটি ঘটনার মাঝখানের চার মাত্রার দূরত্বও কিন্তু একটা পরম দূরত্ব। প্রচণ্ড বেগে এবং আলাদা আলাদা আপেক্ষিক গতিতে ছুটে চলা পর্যবেক্ষকেরা হয়তো দুটি ঘটনার মধ্যে স্থান বা দূরত্বের পার্থক্য নিয়ে একমত হবেন না; সময় কতটা পার হলো তা নিয়েও তাঁদের হিসাবে গরমিল থাকবে। কিন্তু তাঁদের গতি যেমনই হোক না কেন, স্থান-কালের ভেতর ঘটনা দুটির আসল দূরত্ব কতটুকু ছিল, সে ব্যাপারে তাঁরা সবাই একদম একমত হবেন! ই এফ টেলর এবং জে এ হুইলার তাঁদের স্পেসটাইম ফিজিকস বইয়ে ব্যাপারটা এভাবেই বলেছেন, ‘আলাদা আলাদা পর্যবেক্ষকের কাছে স্থান আলাদা। আলাদা আলাদা পর্যবেক্ষকের কাছে সময়ও আলাদা। কিন্তু সবার জন্যই স্থান-কাল একদম এক!’

পুরোনো পদার্থবিজ্ঞানে বলা হতো, কোনো বস্তুর ওপর বাইরের কোনো বল বা ধাক্কা কাজ না করলে, সেটি সমবেগে বা একই গতিতে সোজা পথে চলতে থাকবে। যেমন ধরো, সূর্যের মহাকর্ষ বল যদি কোনো গ্রহকে আটকে না রাখত, তবে সেটি সোজা পথে ছুটে হারিয়ে যেত। এই পুরোনো ধারণা থেকেই বলা হতো, সূর্য তার বল দিয়ে গ্রহগুলোকে টেনে উপবৃত্তাকার পথে (ডিমের মতো দেখতে পথ) ঘোরায়।

আপেক্ষিকতার পদার্থবিজ্ঞানেও বলা হয়, বাইরের কোনো বল কাজ না করলে বস্তু সোজা পথেই চলতে থাকে। কিন্তু এখানে সোজা পথ বলতে সাধারণ স্থানের সোজা পথ বোঝায় না, বোঝায় স্থান-কালের সোজা পথ! মহাকর্ষ বল থাকলেও এই কথাটা সত্যি। কেন জানো? কারণ, আইনস্টাইনের মতে, মহাকর্ষ আসলে কোনো বলই নয়! সূর্য কোনো গ্রহকে নিজের দিকে টানে না, আর পৃথিবীও গাছ থেকে পড়া আপেলকে নিচে টানে না।

আসল ঘটনা হলো, সূর্যের মতো বিশাল ভরের কোনো বস্তু তার চারপাশের স্থান-কালকে বাঁকিয়ে দেয়। সূর্যের যত কাছাকাছি যাবে, এই বাঁকা হওয়ার পরিমাণ তত বেশি হবে। কথাটা অন্যভাবে বললে, বিশাল ভরের বস্তুর আশপাশের স্থান-কালের গঠন তখন আর সমতল থাকে না, সেটি নন-ইউক্লিডিয়ান বা বাঁকা হয়ে যায়। এই বাঁকা স্থানে বস্তুগুলো তাদের সাধ্যমতো সবচেয়ে সোজা পথ ধরেই চলতে থাকে। কিন্তু স্থান-কালের ভেতরে যেটা সোজা পথ, আমাদের সাধারণ ত্রিমাত্রিক স্থানে সেটাকেই বাঁকা বলে মনে হয়! আমাদের কল্পনার সেই চার মাত্রার অতি-বিজ্ঞানী যদি পৃথিবীর ঘোরাটাকে তাঁর গ্রাফে আঁকেন, তবে তিনি সেটাকে একদম সোজা রেখা হিসেবেই আঁকবেন। কিন্তু আমরা যারা ত্রিমাত্রিক জগতের প্রাণী, তারা এই পথটাকেই একটা উপবৃত্তাকার পথ হিসেবে দেখি।

আপেক্ষিকতা তত্ত্ব নিয়ে যাঁরা লেখেন, তাঁরা প্রায়ই দারুণ একটা উদাহরণ দেন। বিয়ে বাড়িতে ত্রিপলি দেখেছো না? রোদ-বৃষ্টি থেকে বাঁচতে ওপরে যেটা টানানো থাকে, সেটার কথা বলছি। এমন একটা টানটান করে বাঁধা রাবারের ত্রিপলি বা চাদরের কথা ভাবো। এবার তার ঠিক মাঝখানে একটা ভারী তরমুজ রাখলে কী হবে? চাদরের মাঝখানটা দেবে গিয়ে একটা গর্তের মতো তৈরি হবে, তাই তো? এখন তুমি যদি তরমুজটার কাছাকাছি একটা ছোট মার্বেল রেখে দাও, তবে সেটা গড়িয়ে তরমুজটার দিকেই চলে যাবে। এখানে তরমুজটা কিন্তু মার্বেলটাকে টানছে না! বরং তার ভারে ত্রিপলির ওই জায়গাটা এমনভাবে দেবে গেছে যে, মার্বেলটা সবচেয়ে সহজ পথ ধরে এমনিতেই তরমুজের দিকে গড়িয়ে পড়ছে।

ঠিক একই রকমভাবে সূর্যের মতো ভারী বস্তুর কারণে তার চারপাশের স্থান-কালও এমন গর্তের মতো বাঁকিয়ে বা দুমড়ে যায়। স্থান-কালের এই দুমড়ে যাওয়াটাই হলো মহাকর্ষ ক্ষেত্র! সূর্য গ্রহগুলোকে টেনে ধরে রাখছে বলে যে তারা ডিম্বাকার পথে ঘোরে, তা নয়। বরং ওই বাঁকা স্থান-কালে এই ডিম্বাকার পথটাই হলো গ্রহগুলোর জন্য সবচেয়ে সহজ পথ!

এই পথটাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় জিওডেসিক। আপেক্ষিকতা তত্ত্বে শব্দটা এতই জরুরি যে, এটা নিয়ে আরও একটু খুলে বলা দরকার। একটা সাধারণ সমতল কাগজে দুটি বিন্দুর মধ্যে সবচেয়ে সোজা দূরত্ব হলো একটা সরল রেখা। এটাই হলো তাদের মধ্যকার সবচেয়ে কম দূরত্ব। কিন্তু একটা গোলকের ওপর দুটি বিন্দুর মধ্যে জিওডেসিক হলো একটা মহাবৃত্তের অংশ। তুমি যদি দুটি বিন্দুর মাঝখানে একটা সুতোকে একদম টানটান করে ধরো, তবে সুতাটা যে পথ দিয়ে যাবে, সেটাই হলো জিওডেসিক। গোলকের ওপর এটাই হলো বিন্দু দুটির মধ্যকার সবচেয়ে ছোট দূরত্ব।

চার মাত্রার ইউক্লিডিয়ান জ্যামিতিতেও জিওডেসিক হলো দুটি বিন্দুর মধ্যকার সবচেয়ে ছোট এবং সোজা রেখা। কিন্তু আইনস্টাইনের বাঁকা স্থান-কাল বা নন-ইউক্লিডিয়ান জ্যামিতিতে ব্যাপারটা এত সহজ নয়! এখানে স্থানের তিনটি মাত্রার সঙ্গে সময়ের একটি মাত্রা এমনভাবে জুড়ে আছে, যা আপেক্ষিকতার সমীকরণ দিয়ে নির্দিষ্ট করা। এই অদ্ভুত গঠনের কারণে স্থান-কালে জিওডেসিক সবচেয়ে সোজা পথ ঠিকই, কিন্তু এটা সবচেয়ে ছোট দূরত্বের বদলে সবচেয়ে বড় দূরত্ব হয়ে দাঁড়ায়! কঠিন গণিত ছাড়া এই ধারণাটা বোঝানো প্রায় অসম্ভব। তবে এর একটা মজার ফলাফল আছে। শুধু মহাকর্ষের প্রভাবে ছুটে চলা যেকোনো বস্তু সব সময় এমন পথই বেছে নেয়, যে পথে চলতে তার সবচেয়ে বেশি নিজস্ব সময় লাগে! অর্থাৎ, বস্তুর নিজের ঘড়ি দিয়ে মাপলে সেই পথটাই হবে সবচেয়ে লম্বা। বিখ্যাত দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল মজার ছলে একে বলেছেন মহাজাগতিক অলসতার নিয়ম। গাছ থেকে আপেল সোজা নিচে পড়ে, মিসাইল ছুড়লে তা ধনুকের মতো বাঁকা পথে যায়, পৃথিবী উপবৃত্তাকার পথে ঘোরে—কারণ, অন্য কোনো পথে যাওয়ার মতো খাটনি করতে তারা বড্ড অলস!

এই মহাজাগতিক অলসতার কারণেই বস্তুগুলো মহাশূন্যে এমনভাবে ঘোরে, যাকে আমরা কখনো জড়তা বলি, আবার কখনো বলি মহাকর্ষ। তুমি যদি একটা আপেলের সঙ্গে সুতা বেঁধে সেটাকে গোল করে ঘোরাতে থাকো, তখন সুতাটা আপেলটিকে সোজা পথে ছুটতে বাধা দেয়। তখন আমরা বলি, আপেলের জড়তা সুতার ওপর টান দিচ্ছে। সুতাটা ছিঁড়ে গেলেই আপেলটা সোজা পথে ছিটকে বেরিয়ে যাবে।

গাছ থেকে যখন আপেল পড়ে, তখন অনেকটা এ রকমই একটা ঘটনা ঘটে। নিচে পড়ার আগে গাছের ডালটি আপেলকে মহাশূন্যে ছুটতে বাধা দেয়। ডালে ঝুলে থাকা আপেলটি পৃথিবীর সাপেক্ষে স্থির ছিল ঠিকই, কিন্তু তার সময়ের অক্ষ ধরে সে প্রচণ্ড বেগে ছুটছিল; কারণ, প্রতি মুহূর্তেই ওটা পাকছিল! কোনো মহাকর্ষ ক্ষেত্র যদি না থাকত, তবে চার মাত্রার গ্রাফে তার এই সময়ের পথটিকে একদম সোজা একটা রেখা হিসেবে দেখানো যেত। কিন্তু পৃথিবীর মহাকর্ষ আপেলের আশপাশের স্থান-কালকে বাঁকিয়ে দিচ্ছে। এই বাঁকা স্থান-কাল আপেলের ওয়ার্ল্ড লাইনকেও বাঁকা হতে বাধ্য করে।

আরও পড়ুন

যে মুহূর্তে আপেলটি ডাল থেকে খসে পড়ে, সেটি স্থান-কালের ভেতর দিয়ে ছুটতে থাকে। কিন্তু এটি তখন তার পথটিকে সোজা করে নেয় এবং একটি জিওডেসিক পথ বেছে নেয়। অলস আপেল বলে কথা! এই জিওডেসিক পথটাকেই আমরা আপেলটার নিচে পড়া হিসেবে দেখি এবং বলি এটা মহাকর্ষের কারণে হলো! তবে আমরা চাইলে এটাও বলতে পারি, আপেলটি তার বাঁকা পথ থেকে হঠাৎ মুক্তি পাওয়ার পর, তার নিজস্ব জড়তাই তাকে মাটিতে টেনে নিয়ে এসেছে।

যদিও আপেক্ষিকতা তত্ত্ব মহাকর্ষের বদলে স্থান-কালের জ্যামিতিক বক্রতা বা দুমড়ে যাওয়ার ধারণা নিয়ে এসেছে, তবু এটি অনেকগুলো মৌলিক প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না। স্থান-কালের এই বাঁকা হয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা কি মহাশূন্যে চোখের পলকে ঘটে যায়, নাকি কোনো তরঙ্গের মতো ছড়িয়ে পড়ে? প্রায় সব পদার্থবিজ্ঞানীই একমত যে এই বক্রতা আসলে তরঙ্গের মতোই ছড়িয়ে পড়ে এবং এই তরঙ্গগুলো আলোর বেগে ছুটে চলে। এই মহাকর্ষীয় তরঙ্গগুলো যে শক্তির অতি ক্ষুদ্র এবং অবিভাজ্য কণা দিয়ে তৈরি, তা বিশ্বাস করারও যথেষ্ট কারণ আছে। শক্তির এই কণাগুলোর নাম দেওয়া হয়েছে গ্র্যাভিটন।

১৯৬৯ সালে মেরিল্যান্ড ইউনিভার্সিটির জোসেফ ওয়েবার ঘোষণা করেছিলেন, বিশাল সব অ্যালুমিনিয়ামের সিলিন্ডার দিয়ে তৈরি তাঁর যন্ত্রে মহাকর্ষীয় বিকিরণ ধরা পড়েছে! মনে হচ্ছিল, আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির ঠিক কেন্দ্রে ঘটা ভয়ংকর কোনো প্রলয়ংকরী ঘটনা থেকে এই তরঙ্গগুলো আসছে। এর পর থেকে ওয়েবারের এই দাবি প্রমাণের জন্য ডজন ডজন চেষ্টা করা হয়েছে। অনেক পদার্থবিজ্ঞানী ওয়েবারের চেয়েও অনেক গুণ বেশি সংবেদনশীল যন্ত্র নিয়ে পরীক্ষা করেছেন, কিন্তু প্রতিবারই ফলাফল এসেছে নেতিবাচক। এখনকার বিজ্ঞানীদের ধারণা, ওয়েবার তাঁর যন্ত্রের রিডিং বুঝতে ভুল করেছিলেন। মহাকর্ষীয় তরঙ্গ তখনো ধরা পড়েনি। অবশ্য তুমি হয়তো এখন জানো, ২০১৫ সালে লাইগো প্রজেক্টের বিজ্ঞানীরা সত্যি সত্যিই এই মহাকর্ষীয় তরঙ্গ ধরতে পেরেছিলেন!

আর গ্র্যাভিটনের কথা যদি বলি, গ্র্যাভিটন দেখতে ঠিক কেমন সে সম্পর্কে কারও কোনো ধারণাই নেই! তবে অনেক পদার্থবিজ্ঞানী এমন সব তত্ত্ব দাঁড় করানোর চেষ্টা করছেন, যা দিয়ে এর কিছু বৈশিষ্ট্য আগে থেকেই অনুমান করা যায়। ধারণা করা হয়, এই কণাগুলোর ভেতরে স্থান-কালের বক্রতার খুব ছোট্ট একটা অংশ লুকিয়ে থাকে। তা না হলে তো কোটি কোটি গ্র্যাভিটন মহাশূন্যের ভেতর দিয়ে এই বক্রতাকে বয়ে নিয়ে যেতে পারত না! আপাতত কণা-পদার্থবিজ্ঞানীদের কোয়ার্কের মতো গ্র্যাভিটনও হলো এক কল্পনার প্রাণী। বিজ্ঞানীরা আশা করেন, একদিন না একদিন ঠিকই তাঁরা একে বন্দী করতে পারবেন!

১৯৩৯ সালে বিখ্যাত ব্রিটিশ গণিতবিদ ও পদার্থবিজ্ঞানী পল ডিরাক একটি তত্ত্ব দিয়েছিলেন। তাঁর তত্ত্বে বলা হয়েছিল, মহাবিশ্ব যত প্রসারিত হচ্ছে এবং এর ঘনত্ব যত কমছে, মহাকর্ষ বলও ধীরে ধীরে তত দুর্বল হয়ে পড়ছে। এমনকি এমনও হতে পারে, এই মহাকর্ষ বল দুর্বল হয়ে পড়ার কারণেই মহাবিশ্ব প্রসারিত হচ্ছে! মহাবিশ্বের এই প্রসারণ নিয়ে আমরা পরের অধ্যায়গুলোতে কথা বলব। অনেক পদার্থবিজ্ঞানী এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানী এই ধারণাটাকে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন এবং একই রকম আরও অনেক তত্ত্ব তৈরি করেছেন।

মহাকর্ষ যদি সত্যিই দুর্বল হয়ে থাকে, তবে মহাবিশ্বের বিশাল বিশাল বস্তুগুলোরও ধীরে ধীরে প্রসারিত বা বড় হওয়ার কথা। এই তত্ত্ব দিয়ে চাঁদ এবং পৃথিবী বা মঙ্গলের মতো গ্রহগুলোর ভূত্বকে ফাটল ধরার কারণ ব্যাখ্যা করা যায়। এমনকি পৃথিবীর মহাদেশগুলোর একে অপরের থেকে দূরে সরে যাওয়ার পেছনেও এর অবদান থাকতে পারে। মানে আমাদের সূর্যটাও ধীরে ধীরে প্রসারিত হচ্ছে বা বড় হচ্ছে! তাহলে আজ থেকে ২০০ কোটি বছর আগে সূর্য নিশ্চয়ই এখনকার চেয়ে ছোট, অনেক বেশি ঘন এবং অনেক বেশি উত্তপ্ত ছিল। এই ব্যাপার দিয়ে খুব সহজেই ব্যাখ্যা করা যায়, কেন পৃথিবীর পুরোনো ভূতাত্ত্বিক যুগে প্রায় পুরো পৃথিবীজুড়েই গরম আবহাওয়া ছিল।

আপেক্ষিকতা তত্ত্ব আমাদের মহাকর্ষকে দেখার এবং বর্ণনা করার একদম নতুন একটা পথ দেখিয়েছে ঠিকই, কিন্তু এটি এখনো অনেকখানি রহস্যময় এবং খুব কম বুঝতে পারা একটা বিষয়। বিদ্যুৎ-চুম্বকীয় বলের সঙ্গে মহাকর্ষের আদৌ কোনো সম্পর্ক আছে কি না, তা কেউ নিশ্চিত করে জানে না। আইনস্টাইন এবং আরও অনেক বিজ্ঞানী একটি একীভূত ক্ষেত্রতত্ত্ব দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছিলেন, যা মহাকর্ষ এবং বিদ্যুৎ-চুম্বকীয় বলকে এক সুতায় গেঁথে একই গাণিতিক সমীকরণের ভেতরে নিয়ে আসবে। একে আমরা একটা গালভরা নামও দিয়েছি-থিওরি অব এভরিথিং। কিন্তু ১৯৮০-এর দশকে নানা ধরনের থিওরি অব এভরিথিং আসার আগপর্যন্ত এই চেষ্টাগুলোর ফল ছিল বেশ হতাশাজনক। স্টিফেন হকিংসহ অনেক পদার্থবিজ্ঞানী বিশ্বাস করেন, প্রকৃতির সব কণা এবং বলকে এক সুতায় গাঁথার সেই চূড়ান্ত দিনটি আমাদের খুব কাছাকাছিই চলে এসেছে! অর্থাৎ থিওরি অব এভরিথিংক বা সবকিছুর তত্ত্ব সম্ভব!

আরও পড়ুন