কোন মাছ ডাঙায় বেঁচে থাকে

কিছু প্রজাতির মাছ বাতাস থেকে সরাসরি শ্বাস নিতে পারে। এমনকি প্রয়োজনে পানি ছেড়ে ডাঙায় উঠে পথ চলার ক্ষমতাও রাখে এরা।

‘ম্যানগ্রোভ রিভুলাস’ নামের একটি মাছ গ্রীষ্মমণ্ডলীয় এলাকার জলাশয়ে পানির তাপমাত্রা খুব বেড়ে গেলে শরীর ঠান্ডা করার জন্য লাফ দিয়ে ডাঙায় উঠে আসে

বাংলায় একটা চলতি কথা আছে, ‘পানির মাছ ডাঙায় উঠলে যেমন হয়’। সাধারণত প্রতিকূল পরিস্থিতিতে খাপ খাইয়ে নিতে না পারা বোঝাতে কথাটি বলা হয়। কিন্তু প্রকৃতির কিছু অদ্ভুত মাছের বেলায় এই নিয়ম মোটেই খাটে না।

অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে, সত্যিই কি কোনো মাছ পানির বাইরে বেঁচে থাকতে পারে? উত্তর হলো, হ্যাঁ। বিজ্ঞানীরা গবেষণায় দেখেছেন, এমন কিছু অনন্য প্রজাতির মাছ আছে, যারা পানি ও ডাঙা দুই পরিবেশেই দিব্যি মানিয়ে নিয়ে টিকে থাকতে পারে।

শরীর ঠান্ডা করতে পানির বাইরে

বিষয়টা নিয়ে কাজ করছেন কানাডার ইউনিভার্সিটি অব গুয়েলফের গবেষক অ্যান্ডি টার্কো। তিনি জানান, কিছু মাছ সত্যিই উভচর স্বভাবের। অর্থাৎ এরা পানির বাইরে এসেও স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকে।

অ্যান্ডি টার্কো ‘ম্যানগ্রোভ রিভুলাস’ নামের একটি মাছ নিয়ে গবেষণা করেছেন। দেখা গেছে, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় এলাকার জলাশয়ে পানির তাপমাত্রা খুব বেড়ে গেলে শরীর ঠান্ডা করার জন্য এই মাছটি লাফ দিয়ে ডাঙায় উঠে আসে।

সাধারণত মাছ ফুলকার সাহায্যে পানি থেকে অক্সিজেন নিয়ে শ্বাস নেয়। তবে ম্যানগ্রোভ রিভুলাসের শরীর বাতাস থেকে সরাসরি অক্সিজেন নেওয়ার উপযোগী করে তৈরি। এদের ত্বকের গঠন বিশেষ ধরনের, যা ফুলকার অনেক কাজ একাই করে ফেলে। যেমন শরীরে লবণের ভারসাম্য বজায় রাখা।

এদের ত্বকের ঠিক নিচে খুব কাছাকাছি রক্তনালি থাকে। এই রক্তনালিগুলো বাতাস থেকে সরাসরি প্রচুর অক্সিজেন রক্তে টেনে নিতে পারে।

আরও পড়ুন

ডাঙায় চলাচলের অন্যান্য মাছ

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ওয়াকিং ক্যাটফিশ বা চাজিং মাছের কথা বলা যায়। এই মাছ বর্তমানে আমেরিকার ফ্লোরিডায় ক্ষতিকর প্রজাতি হিসেবে ছড়িয়ে পড়েছে। এদের শরীরে অতিরিক্ত একটি শ্বাসযন্ত্র বা অঙ্গ রয়েছে, যা ফুলকাকে সাহায্য করে বাতাস থেকে সরাসরি অক্সিজেন নিতে সহায়তা করে।

এ ছাড়া মাডস্কিপার নামের আরেকটি মাছ রয়েছে, যারা জীবনের বেশির ভাগ সময় পানির বাইরে কাদামাটিতেই কাটিয়ে দেয়।

মাছগুলো চলাফেরা করার জন্য এদের শরীর বাঁকিয়ে ডানে-বাঁয়ে দোলায়। সেই সঙ্গে বুক বা পেটের শক্ত কাঁটাযুক্ত পাখনা ভর দিয়ে সামনে এগোতে সাহায্য করে

হাঁটার উপযোগী বিশেষ পাখনা

হ্যাঁ, ঠিকই পড়েছ। কিছু মাছ সত্যি সত্যিই হাঁটতে পারে।

ফ্লোরিডা মিউজিয়াম অব ন্যাচারাল হিস্ট্রির মৎস্যবিজ্ঞানী জর্জ বার্গেস জানান, মুষলধারে বৃষ্টির পর এসব ক্যাটফিশ বা বাইন–জাতীয় মাছকে রাস্তা পার হতে দেখা খুব একটা অস্বাভাবিক ঘটনা নয়।

মাছগুলো চলাফেরা করার জন্য এদের শরীর বাঁকিয়ে ডানে-বাঁয়ে দোলায়। সেই সঙ্গে বুক বা পেটের শক্ত কাঁটাযুক্ত পাখনা ভর দিয়ে সামনে এগোতে সাহায্য করে।

ব্রাজিলের একধরনের চার চোখা মাছ রয়েছে। এগুলো পানির ওপর ভেসে থাকে এবং পোকামাকড়ের খোঁজে কাদা দিয়ে ঘেরা মাটিতে হেঁটে ওঠে।

ইল–জাতীয় মাছ পানি থেকে উঠে কাদার ওপর দিয়ে চলাচলের সময় নদীর বাঁধ বা ছোট প্রতিবন্ধকতা পার হতে পারে। এরা মূলত ত্বকের সাহায্যেই বাতাস থেকে অক্সিজেন নিতে পারে।

আবার কিলিফিশ মাটিতে লাফিয়ে লাফিয়ে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় চলে যায়। আপাতদৃষ্টিতে এদের এই লাফানোকে অগোছালো বা এলোমেলো মনে হতে পারে। তবে বিজ্ঞানী বার্গেস বলেন, এরা ঠিক জানে কোন দিকে যাচ্ছে।

মামিচগ নামে এক প্রজাতি কিলিফিশ আছে। এই মাছ পানির বাইরে ডাঙায় চলে এলে মোটেও দিশাহারা হয়ে পড়ে না। এরা নিজেদের চোখ দিয়ে চারপাশের পরিবেশ খেয়াল করে এবং উঁচুতে লাফিয়ে ওঠে। বাতাসে থাকা অবস্থাতেই এরা আশপাশের দৃশ্য দেখে পানির দিক চিনে নেয়। এরপর শরীর পানির দিকে ঘুরিয়ে গড়িয়ে বা লাফিয়ে চলে যায়।

আরও পড়ুন
ইল–জাতীয় মাছ পানি থেকে উঠে কাদার ওপর দিয়ে চলাচলের সময় নদীর বাঁধ বা ছোট প্রতিবন্ধকতা পার হতে পারে

কাদায় লুকিয়ে বছরের পর বছর বেঁচে থাকা মাছ

তবে সবাইকে অবাক করে দিয়েছে পশ্চিম আফ্রিকার লাংফিশ। এদের ফুলকার পাশাপাশি একটি বিশেষ ফুসফুসও রয়েছে। খরা বা শুষ্ক মৌসুমে যখন পানি শুকিয়ে যায়, তখন এরা শরীর থেকে একধরনের তরল নিঃসৃত করে খোলস বা কোকুন তৈরি করে ফেলে। তারপর কাদার নিচে ঢুকে ঘুমন্ত অবস্থায় মাসের পর মাস এমনকি বছরও টিকে থাকতে পারে।

বৃষ্টির পানি যখন কাদা ভিজিয়ে দেয়, তখন লাংফিশ কাদার নিচ থেকে আবার বাইরে বেরিয়ে আসে। তখন এদের দেখতে অনেকটা কাদার পুতুলের মতো লাগে।

আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ার উপকূলে গ্রুনিয়ন নামের ছোট একধরনের মাছ প্রতি বসন্তে হাজার হাজার সংখ্যায় বালুচরে উঠে আসে

মাছ কেন রাস্তা পার হয় বা পানি ছেড়ে ডাঙায় ওঠে

মাছ মূলত বেঁচে থাকার তাগিদেই পানি থেকে বাইরে বেরিয়ে আসে। পানিতে অক্সিজেনের তীব্র অভাব দেখা দিলে কিংবা শিকারি প্রাণীর হাত থেকে বাঁচতে এরা এমনটা করে। আবার স্নেকহেড এবং ওয়াকিং ক্যাটফিশ পানির বাইরে আসে খাবারের খোঁজে, সঙ্গী খুঁজতে কিংবা পুরনো জলাশয়ের পানি শুকিয়ে গেলে নতুন পানির সন্ধানে।

আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ার উপকূলে গ্রুনিয়ন নামের ছোট একধরনের মাছ প্রতি বসন্তে হাজার হাজার সংখ্যায় বালুচরে উঠে আসে। এরা মূলত সেখানে ডিম পাড়ার জন্য ডাঙায় উঠে আসে। অন্য দিকে চার চোখা মাছ পোকামাকড় শিকার করার জন্য কাদামাটির ওপর হেঁটে বেড়ায়।

তাই কখনো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পড়ে নিজেকে পানির বাইরের মাছ মনে হলে ঘাবড়ে যাবে না। কারণ, প্রকৃতির অনেক মাছ পানির বাইরে এসেও পরিস্থিতি দারুণভাবে সামলে নিতে পারে।

সূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন
আরও পড়ুন