চীনে খোঁজ মিলল নতুন ‘দুই মাথাওয়ালা’ সাপের
চীনের গবেষকেরা সাপের একেবারে নতুন এক প্রজাতি আবিষ্কার করেছেন। তবে এটি কোনো জন্মগত ত্রুটির কারণে দুই মাথাওয়ালা সাপ নয়; বরং শিকারিদের হাত থেকে নিজেকে বাঁচাতে সাপটি এক অদ্ভুত কৌশল ব্যবহার করে। আর এর এই অনন্য আত্মরক্ষা কৌশলের কারণেই একে ‘দুই মাথাওয়ালা’ সাপ বলা হচ্ছে।
জার্মানি ও বুলগেরিয়া থেকে প্রকাশিত জুসিস্টেমেটিকস অ্যান্ড ইভল্যুশন জার্নালে এই সাপ নিয়ে গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে। দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের গুয়াংজি অঞ্চলের প্রাকৃতিক ইতিহাস জাদুঘরের একটি গবেষক দল দক্ষিণ চীনে এই সাপের সন্ধান পায়। ভিয়েতনাম সীমান্তের কাছে অবস্থিত গুয়াংজি ঝুয়াং অঞ্চলের হুয়াপিং জাতীয় প্রকৃতি সংরক্ষিত এলাকায় বন্য প্রাণী নিয়ে জরিপ চালানোর সময় এটি আবিষ্কৃত হয়। বিজ্ঞানীরা এই নতুন সাপের নাম দিয়েছেন গুয়াংজি রিড স্নেক (Guangxi reed snake)।
গবেষকেরা জানিয়েছেন, সাপটি এর মোটা ও গোলাকার লেজ ব্যবহার করে দ্বিতীয় একটি মাথা থাকার ভান করে। এর মাধ্যমে এটা চমৎকারভাবে শিকারিদের ভয় দেখিয়ে দূরে রাখে। মজার বিষয়, এর লেজে অবিকল মাথার মতোই কিছু চিহ্ন বা দাগ থাকে। হঠাৎ চমকে উঠলে বা ভয় পেলে সাপটি এর শরীরকে ইংরেজি ৮ অক্ষরের মতো করে পেঁচিয়ে নেয়। অথবা শত্রুকে বিভ্রান্ত করতে নিজের লেজটি উঁচু করে ধরে, যেন মনে হয় ওটাই এর আরেকটা মাথা।
বিজ্ঞানীরা এই নতুন প্রজাতির সাপের বৈজ্ঞানিক নাম দিয়েছেন ক্যালামারিয়া ইনক্রেডিবিলিস (Calamaria incredibilis)। এটি আকারে বেশ ছোট, লম্বায় মাত্র আট ইঞ্চির সামান্য কম। পৃথিবীতে প্রায় ৪ হাজার প্রজাতির সাপের কথা জানা থাকলেও এর মধ্যে মাত্র ৬০০ প্রজাতির সাপ বিষধর। সাপটি সম্পূর্ণ বিষহীন। এর পিঠের ওপর সাতটি গাঢ় দাগ বা ডোরাকাটা চিহ্ন এবং সরু, বাদামি রঙের আঁশ দেখে একে সহজেই চেনা যায়। তবে বিষ না থাকলে কী হবে, এর আত্মরক্ষার অন্য কৌশলটি এতটাই অদ্ভুত যে তা দেখেই বেশির ভাগ শিকারি প্রাণী ভয়ে দূরে থাকে।
গবেষকদের মতে, গুয়াংজি রিড স্নেক মূলত রাতের বেলা ঘুরে বেড়ায়। অর্থাৎ এরা নিশাচর প্রাণী। দিনের বেশির ভাগ সময় এটি বনের মাটিতে পড়ে থাকা শুকনা পাতা, পাথরের ফাটল কিংবা মাটির নিচে লুকিয়ে কাটায়। এদের প্রধান খাবার হলো কেঁচো ও নরম পোকামাকড়ের লার্ভা। বিজ্ঞানীরা লক্ষ করেছেন, এরা স্বভাবের দিক থেকে বেশ শান্ত প্রকৃতির। তবে যখনই এরা বিপদে পড়ে নিজের দ্বিতীয় মাথা ব্যবহারের কৌশল দেখায়, তখন এদের রূপ পুরোপুরি বদলে যায়।
নতুন আবিষ্কৃত এই সাপই কিন্তু ২০২৬ সালে বিজ্ঞানীদের খুঁজে পাওয়া প্রথম নতুন কোনো সাপের প্রজাতি নয়। এর আগে মার্চ মাসে প্রকাশিত কম্বোডিয়ার উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলের গুহাগুলোর একটি বন্য প্রাণী জরিপে অন্তত ১১টি নতুন প্রজাতির সন্ধান মিলেছে। এ তালিকায় রয়েছে আগে কখনো না দেখা নতুন প্রজাতির সাপ, টিকটিকি, পুঁচকে শামুক ও কেন্নো।
২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত চালানো ওই জরিপে আবিষ্কৃত নতুন প্রাণীগুলোর মধ্যে একটি ফিরোজা রঙের পিট ভাইপার একধরনের বিষধর সাপ এবং একটি উড়ন্ত সাপও ছিল। এই নতুন সাপগুলোর পাশাপাশি তিনটি নতুন প্রজাতির টিকটিকিও পাওয়া গেছে। যেগুলোর আনুষ্ঠানিক নামকরণ ও বৈশিষ্ট্য নির্ধারণের কাজ চলছে।
এখানেই শেষ নয়। গবেষকেরা এ বছরের শুরুর দিকে হুয়াপিং জাতীয় প্রকৃতি সংরক্ষণাগারে আরেকটি নতুন উভচর প্রাণী খুঁজে পেয়েছেন। এটি মূলত একধরনের ব্যাঙ, যার নাম দেওয়া হয়েছে হুয়াপিং লিফ লিটার টোড।
যে বিজ্ঞানীরা প্রথম গুয়াংজি সাপটি শনাক্ত করেছিলেন, তাঁরা জানিয়েছেন, এই নতুন আবিষ্কারগুলো প্রকৃতিকে টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে অভয়ারণ্য বা সংরক্ষণাগারগুলোর গুরুত্ব কতটা বেশি, তা মনে করিয়ে দেয়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, দক্ষিণ চীনে গুয়াংজি অঞ্চলে এমন আরও কিছু প্রজাতির খোঁজ মিলতে পারে সামনের অভিযানগুলোতে।
সূত্র: পপুলার সায়েন্স, পিপল ডটকম