অক্টোবরে রাতের আকাশে উল্কাসহ যা দেখা যাবে

পাহাড়ের মতো জায়গায় আকাশ পরিষ্কার থাকলে অনেক তারা চোখে পড়েছবি: নাসা

ঢাকায় রাতের বেলায় আকাশ দেখা বেশ কষ্টকর। আলোক দূষণে ভরা। চারপাশের উজ্জ্বল আলোর কারণে রাতে দৃষ্টি আকাশ পর্যন্ত পৌঁছায় না। তাই একদল তরুণ আকাশ দেখতে গত সপ্তাহের শেষে বান্দরবানের মিরিঞ্জা ভ্যালিতে চলে গেছেন। শহরের আলো পেছনে ফেলে রাতে পাহাড়ে আকাশ দেখার আয়োজন করা হয়েছে। টেলিস্কোপ সঙ্গে করে নিয়ে গেছেন তাঁরা। আয়োজনের নাম ‘তারায় তারায় খচিত’। রাতের আকাশ চেনা, নক্ষত্রমণ্ডল খুঁজে বের করা আর মহাকাশ নিয়ে নতুন কিছু জানার জন্য এ আয়োজন।

শহরে রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে বড়জোর কয়েকটি উজ্জ্বল তারা দেখা যায়। চারপাশের বৈদ্যুতিক আলো অনেক তারার আলোকে ম্লান করে দেয়। কিন্তু পাহাড়ের মতো জায়গায় আকাশ পরিষ্কার থাকলে অনেক তারা চোখে পড়ে। যেসব তারাকে ছোট ছোট আলোর বিন্দু মনে হয়, সেগুলোর অনেকগুলোই সূর্যের মতো নক্ষত্র। বহু নক্ষত্র আছে যেগুলো সূর্যের চেয়ে বহুগুণ বড়। এদের অনেকগুলোর আলো পৃথিবীতে পৌঁছাতে বহু বছর লেগে যায়।

কয়েকটি তারাকে কাল্পনিক রেখা দিয়ে যুক্ত করলে তৈরি হয় নক্ষত্রমণ্ডলের নকশা। বহু প্রজন্ম ধরে মানুষ এ নকশা দেখে পথ চিনেছে। ঋতুর পরিবর্তন বোঝার জন্য এ নকশার ওপর নির্ভর করেছে বহু প্রজন্ম। এসব নক্ষত্রমণ্ডল ঘিরে তৈরি করেছে নানা গল্প। এখন আমাদের হাতে আকাশের আধুনিক মানচিত্র ও জিপিএস আছে। তবু রাতের আকাশ নিয়ে মানুষের কৌতূহল কমেনি।

অক্টোবর মাসে আকাশ পর্যবেক্ষণের বিশেষ কিছু আকর্ষণ আছে। এ অক্টোবরে আকাশে চোখ রাখলে উল্কাবৃষ্টি দেখা সম্ভব হবে। এ মাসে সক্রিয় থাকে দুটি উল্কাবৃষ্টি। নাম ড্রাকোনিড ও ওরায়নিড। এর মধ্যে ওরায়নিডের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিখ্যাত হ্যালির ধূমকেতুর গল্প। আকাশ পরিষ্কার থাকলে এবং কম আলোকদূষণের জায়গায় অবস্থান করলে উল্কা দেখার সুযোগ পাওয়া যাবে।

আরও পড়ুন
আকাশ থেকে ছুটে আসছে উল্কা
ছব: নাসা

উল্কা দেখার সুযোগ

৮ ও ৯ অক্টোবর সক্রিয় ছিল ড্রাকোনিড উল্কাবৃষ্টি। অন্য অনেক উল্কাবৃষ্টির তুলনায় এর বিশেষত্ব হলো, সন্ধ্যার পর থেকেই উল্কা দেখার সুযোগ থাকে। তাই গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকতে না চাইলেও আকাশ পর্যবেক্ষণ করা যায়। তারায় তারায় খচিত আয়োজনে এ উল্কা দেখার চেষ্টা করা হয়েছে।

উল্কা হলো মহাকাশ থেকে আসা ক্ষুদ্র কণাগুলো পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করার পর তৈরি হওয়া আলোর রেখা। কণাগুলো প্রচণ্ড গতিতে বায়ুমণ্ডলে ঢুকে উত্তপ্ত হয় এবং চারপাশের গ্যাসের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে আলো তৈরি করে। আমরা তখন আকাশে ক্ষণিকের জন্য আলোর রেখা দেখতে পাই। সাধারণভাবে একে বলে ফলিং স্টার বা খসে পড়া তারা। এগুলো আসলে তারা নয়।

ড্রাকোনিড নামটি এসেছে ড্রাকো নক্ষত্রমণ্ডল থেকে। আকাশের একটি নির্দিষ্ট অঞ্চল থেকে উল্কাগুলো ছুটে আসছে বলে মনে হয় বলেই এ নাম। সাধারণত এ উল্কাবৃষ্টি খুব বেশি উল্কা তৈরি করে না। কোনো কোনো রাতে অল্প কয়েকটি উল্কা দেখা যায়, আবার বিশেষ পরিস্থিতিতে সংখ্যা বেড়েও যেতে পারে।

উল্কা দেখতে বিশেষ কোনো যন্ত্রের প্রয়োজন হয় না। বরং খালি চোখেই আকাশের বিস্তৃত অংশে নজর রাখা ভালো। শহরের উজ্জ্বল আলো থেকে দূরে গিয়ে চোখকে অন্ধকারের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য কিছুটা সময় দিতে হয়। এরপর ধৈর্য ধরে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। এক ঘণ্টায় কতগুলো উল্কা দেখা যাবে, তা নির্ভর করে আকাশের অবস্থা, পর্যবেক্ষণের জায়গা ও উল্কাবৃষ্টির সক্রিয়তার ওপর।

হ্যালির ধূমকেতুর রেখে যাওয়া কণায় তৈরি হয় ওরায়নিড

অক্টোবরের আরেকটি উল্লেখযোগ্য মহাজাগতিক ঘটনা ওরায়নিড উল্কাবৃষ্টি। ২১ অক্টোবর এ উল্কাবৃষ্টির সর্বোচ্চ সক্রিয়তা দেখা যাওয়ার কথা। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হ্যালির ধূমকেতুর নাম।

হ্যালির ধূমকেতু সূর্যকে কেন্দ্র করে কক্ষপথে ঘোরে। চলার পথে এটি মহাকাশে ধুলা ও ক্ষুদ্র কণা ছড়িয়ে রেখে যায়। পৃথিবী প্রতিবছর অক্টোবর মাসে এ কণাপুঞ্জের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে। তখন কিছু কণা পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে এবং আলোর রেখা তৈরি করে। এভাবেই দেখা দেয় ওরায়নিড উল্কাবৃষ্টি।

অর্থাৎ আকাশে যেসব উল্কা দেখা যায়, সেগুলোর কোনো কোনোটি বহু আগে হ্যালির ধূমকেতুর রেখে যাওয়া কণা। ধূমকেতুটি নিজে আকাশে দৃশ্যমান না থাকলেও তার রেখে যাওয়া কণার কারণে প্রতিবছর পৃথিবী থেকে এ উল্কাবৃষ্টি দেখা যায়।

ওরায়নিড নামটি এসেছে অরায়ন বা কালপুরুষ নক্ষত্রমণ্ডল থেকে। এ নক্ষত্রমণ্ডলের দিক থেকেই উল্কাগুলোকে ছুটে আসতে দেখা যায় বলে এমন নাম। নাসার তথ্য অনুযায়ী, শহরের কাছাকাছি জায়গায়, যেখানে কিছুটা আলো থাকে, সেখান থেকে ঘণ্টায় তিন থেকে ছয়টি অরায়নিড উল্কা দেখা যেতে পারে। অন্ধকার জায়গা থেকে দেখলে সংখ্যাটি কিছুটা বেশি হতে পারে।

তবে উল্কা দেখার জন্য শুধু নির্দিষ্ট তারিখ জানলেই হবে না। আকাশ পরিষ্কার থাকা জরুরি। চাঁদের আলো বেশি থাকলে ম্লান উল্কাগুলো দেখতে অসুবিধা হতে পারে। তাই সম্ভব হলে চাঁদের আলো কম থাকা সময়ে এবং শহরের আলোকদূষণ থেকে দূরে গিয়ে আকাশ পর্যবেক্ষণ করা ভালো।

আরও পড়ুন
মেঘ সরিয়ে উঁকি দিচ্ছে চাঁদ।

শিকারির চাঁদ দেখা যাবে আকাশে

অক্টোবরের বড় আকর্ষণ পূর্ণিমার চাঁদ। ২৫ থেকে ২৬ অক্টোবর আশ্বিনী পূর্ণিমা বা কোজাগরী পূর্ণিমা দেখা যাবে। আশ্বিন মাসে এ পূর্ণিমা হয় বলে একে বলা হয় আশ্বিনী পূর্ণিমা। কোজাগরী মানে ‘কে জেগে আছে?’

অক্টোবরের এ পূর্ণিমার চাঁদকে ইংরেজিতে বলা হয় হান্টারস মুন বা শিকারির চাঁদ। নামটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে উত্তর গোলার্ধের শরৎকালের পুরোনো ঐতিহ্য। ফসল কাটার পর খোলা মাঠে চাঁদের আলোয় পশুপাখির চলাচল দেখতে পাওয়া সহজ হতো। দিনের আলো কমে আসার সময় শিকারিরা সে আলো কাজে লাগাতেন বলে পূর্ণিমার চাঁদটির এমন নাম প্রচলিত হয়েছে।

পূর্ণিমার পরও কয়েক রাত আকাশে চাঁদ উজ্জ্বল থাকবে। এরপর ধীরে ধীরে এর আলোকিত অংশকমতে থাকবে। এ চাঁদ শরতের পরিষ্কার আকাশে আলাদা আবহ তৈরি করে।

তবে চাঁদ যত উজ্জ্বল হবে, তারা বা উল্কা দেখতে তত অসুবিধা হতে পারে। তাই আকাশ পর্যবেক্ষণের পরিকল্পনা করার সময় শুধু চাঁদের তারিখ জানলেই হয় না, চাঁদ কখন উঠবে বা অস্ত যাবে, সেটিও জানা দরকার।

আকাশ দেখতে টেলিস্কোপ লাগে না

রাতের আকাশ পর্যবেক্ষণের কথা উঠলেই অনেকের মনে প্রথমে আসে টেলিস্কোপের কথা। কিন্তু আকাশ চেনার শুরুতে খালি চোখই ভরসা হতে পারে। কোন নক্ষত্রমণ্ডল কখন দেখা যায়, উজ্জ্বল তারাগুলোকে কীভাবে খুঁজে বের করতে হয়, চাঁদ ও গ্রহের অবস্থান কীভাবে বদলায়, এসব জানা থাকলে আকাশ দেখার অভিজ্ঞতা অনেক বেশি আনন্দময় হয়।

প্রতিবছর ৪ থেকে ১০ অক্টোবর বিশ্ব মহাকাশ সপ্তাহ পালিত হয়। মহাকাশবিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পর্কে মানুষের আগ্রহ বাড়ানো ও মহাকাশ অনুসন্ধানের গুরুত্ব তুলে ধরাই এ আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য।

তবে আবহাওয়া পক্ষে থাকলেই আকাশ ভালোভাবে দেখা সম্ভব। মেঘলা আকাশ বা বৃষ্টি হলে উল্কা, নক্ষত্র কিংবা টেলিস্কোপে দেখা মহাজাগতিক বস্তু পর্যবেক্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

সূত্র: সায়েন্স ডেইলি
আরও পড়ুন