খাবার হজম হতে কতক্ষণ সময় লাগে
স্কুল থেকে ফিরেই তুমি হয়তো খেতে বসে যাও। কিন্তু গিলে ফেলার পর এই খাবার তোমার পেটের ভেতর ঠিক কতক্ষণে ও কীভাবে হজম হয়, তা কি জানো? খাবার খেতে যত সহজ, এই প্রশ্নের উত্তরটি তত সহজ নয়। কারণ, একেক ধরনের খাবার আমাদের শরীরে ভিন্ন ভিন্ন গতিতে হজম হয়। বিজ্ঞানীদের মতে, দুজন সুস্থ মানুষের শরীরেও খাবার হজম হওয়ার গতি আলাদা হতে পারে। কিন্তু খাবার পুরোপুরি হজম হতে ঠিক কতক্ষণ সময় লাগে?
আমাদের পেটের ভেতর সব খাবার কিন্তু একই গতিতে হজম হয় না। একেক খাবার একেক সময়ে ভেঙে পুষ্টিতে পরিণত হয়। এর মানে হলো, তোমার খাওয়া কোনো খাবারের কিছু অংশ যখন হজম হয়ে বৃহদন্ত্রে চলে যায়, বাকি অংশ তখনো হয়তো পাকস্থলীতেই রয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো স্টেট ইউনিভার্সিটি বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করেছে। তারা জানায়, একেকজন সুস্থ মানুষের শরীরে খাবার হজম হওয়ার গতি একেক রকম হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক।
কোনো খাবার আমাদের পুরো পরিপাকনালি পার হতে কতক্ষণ সময় নেয়, বিজ্ঞানীরা তা মাপার জন্য একটি গবেষণা করেছেন। একে বলা হয় গাট ট্রানজিট টাইম। এ পরীক্ষায় তাঁরা মানুষকে এমন কিছু বিশেষ ক্যাপসুল গিলিয়ে দেন, যা পেটের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় সেটির পুরো চলার পথ ট্র্যাক করা যায়। এই পরীক্ষা থেকে দেখা গেছে, খাবার শুধু পাকস্থলী থেকে বের হতেই শূন্য দশমিক ৪ থেকে ১৫ দশমিক ৩ ঘণ্টা সময় নিতে পারে। এরপর ক্ষুদ্রান্ত্র পার হতে সময় লাগে ৩ দশমিক ৩ থেকে ৭ ঘণ্টা। ২০২৩ সালের জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল মেডিসিন–এ প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, সবশেষে খাবারের অপাচ্য বা বাকি অংশ বৃহদন্ত্রে গিয়ে প্রায় ১৫ দশমিক ৯ থেকে ২৮ দশমিক ৯ ঘণ্টা পর্যন্ত জমা থাকতে পারে।
আমেরিকান গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের মুখপাত্র ও গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট ডক্টর নিনা নন্দী বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করেছেন। তিনি জানান, যেসব খাবারে ডায়েটারি ফাইবার বা আঁশ, প্রোটিন, জটিল কার্বোহাইড্রেট ও চর্বি বেশি থাকে, সেগুলো হজম হতে বেশি সময় লাগে।
ফাইবার বা আঁশজাতীয় উপাদান খাবারের আয়তন বাড়িয়ে দেয়, যা পরিপাকনালির ভেতর দিয়ে খাবারের চলাচলকে ধীরগতির করে। অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত বা প্রক্রিয়াজাত করা খাবার খুব দ্রুত হজম হয়ে যায়। কারণ, সেগুলোয় ফাইবারের অভাব থাকে। অন্যদিকে আমাদের পাকস্থলী ও ক্ষুদ্রান্ত্র কম পুষ্টির খাবার খুব দ্রুত হজম করতে পারলেও প্রোটিন ও চর্বিসমৃদ্ধ খাবারকে ভেঙে শরীরের শোষণ উপযোগী করতে অনেক বেশি সময় নেয়।
একইভাবে জটিল শর্করা বা কার্বোহাইড্রেট হজম হতে সরল শর্করার চেয়ে বেশি সময় নেয়। এই জটিল শর্করা সাধারণত লাল চাল, ডাল ও আলু বা শ্বেতসারযুক্ত সবজিতে পাওয়া যায়। এর কারণ হলো, জটিল শর্করা তিন বা তার চেয়ে বেশি শর্করার অণুর একটি লম্বা ও জটিল শিকল দিয়ে তৈরি হয়। অন্যদিকে সরল শর্করায় মাত্র এক বা দুটি শর্করার অণু থাকে।
শরীর এই জটিল শর্করাকে সরাসরি গ্রহণ করতে পারে না। তাই শোষণের আগে আমাদের পরিপাকতন্ত্রকে এই জটিল শৃঙ্খল ভেঙে সরল শর্করায় পরিণত করতে হয়। তবে ফাইবার বা আঁশও একধরনের জটিল শর্করা হলেও আমাদের শরীর একে একেবারেই ভাঙতে বা হজম করতে পারে না।
আমাদের জীবনযাত্রার বিভিন্ন অভ্যাসও পেটের ভেতর খাবার চলাচলের সময়কে বদলে দেয়। খাবার ভালোভাবে চিবিয়ে খাওয়া ও পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করা হজমের প্রক্রিয়াকে দ্রুত করতে সাহায্য করে। ভালোভাবে চিবানোর ফলে খাবারের উপরিভাগ ভেঙে ছোট ছোট টুকরা হয়ে যায়, যা পাচক রস বা এনজাইমকে সহজে কাজ করতে সাহায্য করে। এ ছাড়া পানি খাবারকে নরম করে তোলে। ব্যায়াম করলে আমাদের অন্ত্রের নড়াচড়া বা সঞ্চালন বাড়ে এবং পেরিস্টালসিস প্রক্রিয়াটি শুরু হয়। এই পেরিস্টালসিস হলো পরিপাকনালির পেশিগুলোর একধরনের ছন্দোবদ্ধ সংকোচন, যা খাবারকে সামনের দিকে ঠেলে দেয়। আর বসে থাকলে বা শারীরিক পরিশ্রম না করলে এই পেরিস্টালসিস প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যায়।
একজন মানুষের বয়স ও মানসিক চাপও তার হজমের প্রক্রিয়ার ওপর প্রভাব ফেলে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের পাকস্থলীতে অ্যাসিড ও পাচক রস বা এনজাইম তৈরি কমে যায়। একই সঙ্গে তাদের অন্ত্রের খাবার নড়াচড়া করার ক্ষমতাও কমে আসে। মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তা অন্ত্রের এই নড়াচড়ার স্বাভাবিক নিয়মকে বদলে দেয়। ফলে পরিপাকতন্ত্রে রক্ত চলাচল কমে যায়। এতে খাবার হজম হতে অনেক বেশি সময় লাগে। দুশ্চিন্তার কারণে পেটে যে অস্বস্তি হয়, তা আসলে শরীরের জরুরি অবস্থার প্রতিরক্ষাব্যবস্থার কারণে ঘটে। এই ব্যবস্থা চালু হলে শরীর সাময়িকভাবে পাকস্থলী ও ক্ষুদ্রান্ত্রের হজমের প্রক্রিয়া ধীর করে দেয়, কিন্তু বৃহদন্ত্রকে বেশি মাত্রায় সক্রিয় করে তোলে। অর্থাৎ সব ঠিক থাকলে সাধারণত মুখ থেকে শুরু করে পুরো পরিপাকনালি পার হয়ে খাবার পুরোপুরি হজম ও নিষ্কাশন হতে ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে।