হিমসাগর আর ক্ষীরশাপাতি কি একই আম

হিমসাগর

আমের মৌসুম এলেই প্রশ্নটা ওঠে। বাজারে একজন একটা আম দেখিয়ে বলছে, এটা হিমসাগর। পাশের জন বলছে, এটা ক্ষীরশাপাতি। দেখতে প্রায় একই। গন্ধও কাছাকাছি। উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়—বিক্রেতা থেকে ক্রেতা—কেউ এককথায় বলতে পারছে না দুটো আম কি একই নাকি ভিন্ন।

নামের উৎস

‘ক্ষীরশা’ মানে ঘন দুধের মালাই, ‘পাত’ মানে স্তর। আমের শাঁস এত মিষ্টি আর ঘন যে নামটা আপনা থেকেই প্রচলিত হয়ে গেছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ আর রাজশাহীর মানুষ এই নামেই চেনেন। বানানেও তারতম্য আছে এলাকাভেদে। ক্ষীরশাপাত, ক্ষীরশাপাতি। স্থানীয়রা বলেন, মোগল আমলে মুর্শিদাবাদের নবাবদের বাগান থেকে এই আমের উৎপত্তি। সেখান থেকেই ছড়িয়েছে দুই বাংলায়।

হিমসাগর নামটা পশ্চিমবঙ্গে বেশি প্রচলিত, বিশেষত কলকাতার বাজারে। বাংলাদেশে ঢাকা, সাতক্ষীরা, মেহেরপুর অঞ্চলে এই নামেই চলে। একই আম কীভাবে দুটি নাম পেল, সেটার কোনো নথিভুক্ত ইতিহাস নেই। তবে ধারণা করা হয়, দেশভাগের পর দুই অঞ্চলে আলাদাভাবে চাষ হতে হতে নামও আলাদা হয়ে যায়।

আরও পড়ুন
ক্ষীরশাপাতি আম
ছবি: সংগৃহীত

গবেষকেরা যা বলছেন

হিমসাগর আমকে অনেক অঞ্চলের মানুষ ক্ষীরশাপাতি আম নামে চেনেন।

বারির সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. সরফ উদ্দিন বলেছেন, ‘রাজশাহীতে যেটা ক্ষীরশাপাতি, সেটাই বাকি দেশে হিমসাগর। আম একটাই।’

রিসার্চগেটে ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রেও লেখা হয়েছে, ‘ক্ষীরশাপাতি, অলসো নোন অ্যাজ হিমসাগর।’ গবেষকেরা দুটোকে একই আমের দুটি নাম হিসেবে দেখছেন।

তবে উইকিপিডিয়া অন্য কথা বলছে। সেখানে দাবি করা হয়েছে, দুটো আলাদা জাত। পাকলে ক্ষীরশাপাতির ওপরের অংশ হলুদ হয়, হিমসাগর পেকেও সবুজাভ থাকে। আকারেও সামান্য ফারাক। ক্ষীরশাপাতি একটু বড়, বোঁটার কাছে চওড়া। মিষ্টতার দিক থেকেও ক্ষীরশাপাতি এগিয়ে বলে দাবি উইকিপিডিয়ার। বারির তথ্য অনুযায়ী, ক্ষীরশাপাতির টিএসএস বা মিষ্টতার মাত্রা শতকরা প্রায় ২২ থেকে ২৩ শতাংশ, যা বেশির ভাগ আমের চেয়ে বেশি। কিন্তু ডিএনএ পরীক্ষায় এখনো কিছু নিশ্চিত হয়নি।

বাজারে দুই রকম কথা

মোহাম্মদপুর টাউন হল বাজারের আম বিক্রেতা আবদুল কুদ্দুস বললেন, ‘দুইটা একই আম। স্বাদ একই। রাজশাহীতে বা চাঁপাইনবাবগঞ্জে ক্ষীরশা বলে, আর ঢাকায়, সাতক্ষীরায় বলে হিমসাগর।’

সেখানকারই আরেক আম বিক্রেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বললেন, ‘পার্থক্য আছে। দুটা আম আলাদা। চাঁপাইয়েরটা ক্ষীরশাপাতি। হিমসাগর মেহেরপুর, সাতক্ষীরায় বেশি হয়। আমার এগুলা সাতক্ষীরার হিমসাগর। রাজশাহীর আম আনি নাই এখনো।’

এই দ্বিমত শুধু বাজারে না। অনেক সময় একই জেলার দুই চাষিও আলাদা কথা বলেন। কেউ বলেন গাছ একই, কেউ বলেন আলাদা গাছ থেকে আলাদা আম আসে।

আরও পড়ুন
ছবি: প্রথম আলো

জিআই স্বীকৃতির লড়াই

চাঁপাইনবাবগঞ্জের ক্ষীরশাপাতি ২০১৯ সালে বাংলাদেশের তৃতীয় জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এর আগে এই স্বীকৃতি পেয়েছিল ইলিশ মাছ আর জামদানি শাড়ি। বারি ২০১৭ সালে এই আমের জিআই নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছিল।

কিন্তু ভারত এ ক্ষেত্রে আরও এগিয়ে ছিল। বাংলাদেশের স্বীকৃতির প্রায় ৯ বছর আগে পশ্চিমবঙ্গের হিমসাগরকে জিআই পণ্য হিসেবে নিবন্ধিত করে নেয় ভারত। আমটির নিবন্ধন সংখ্যা ‘১১২’।

উৎপাদন কোথায় বেশি

বাংলাদেশে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষীরশাপাতি হয়। জেলায় প্রায় ৩ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে বছরে প্রায় ৩৫ হাজার টন আমের উৎপাদন হয়। এর বাইরে রাজশাহী, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, সাতক্ষীরায়ও চাষ হয়। জুনের প্রথম সপ্তাহ থেকে পাকতে শুরু করে, জুনের শেষ নাগাদ পুরোদমে বাজারে আসে। গাছ থেকে পাড়ার পর সাধারণ তাপমাত্রায় ৬ থেকে ৮ দিন ভালো থাকে। ভারতে মুর্শিদাবাদ, নদীয়া এবং দুই চব্বিশ পরগনায় চাষ হয়।

প্রশ্নের উত্তর এখনো অস্পষ্ট

বাংলাদেশের কৃষিবিজ্ঞানীরা বলছেন, এ দেশে দুটো একই আম। কিন্তু দুই দেশে আলাদাভাবে চাষ হতে হতে জাত দুটির মধ্যে সামান্য পার্থক্য তৈরি হয়েছে কি না, সেটা এখনো অনিশ্চিত। আমগুলোর ডিএনএ নিয়ে গবেষণা হয়নি। ফলে বিতর্কটা এখনো চলছেই। দুটো জাত কি আলাদা না একই—এই প্রশ্নের স্পষ্ট কোনো উত্তরও এখনো মেলেনি।

সূত্র: দ্য ডেইলি স্টার (২০১৭, ২০১৯), রিসার্চগেট (২০২৫), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি)

আরও পড়ুন