প্রশান্ত আর আটলান্টিক মহাসাগরের পানি কি সত্যিই একে অপরের সঙ্গে মেশে না

গভীর সমুদ্রের ঢেউ ও আলোড়নের কারণেও দুই মহাসাগরের পানি মিশে যায়

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কিছু ভিডিওতে দেখা যায়, সাগরের পানির মধ্যে অদ্ভুত এক সীমারেখা। একদিকে গাঢ় নীল পানি আর অন্যদিকে ঘোলা বা হালকা রঙের পানি। সাধারণত নদী বা হিমবাহ যেখানে সাগরে এসে মেশে, সেখানেই এমন স্পষ্ট রেখা তৈরি হয়। কিন্তু ইন্টারনেটের ভিডিওগুলোতে দাবি করা হয়, এটি নাকি প্রশান্ত ও আটলান্টিক মহাসাগরের সীমানা। আর তাদের দাবি অনুযায়ী, এই দুই মহাসাগরের পানি নাকি একে অপরের সঙ্গে একেবারেই মেশে না।

কিন্তু কথাটা কি আসলেই সত্যি? চিলির কনসেপসিওন ইউনিভার্সিটির সমুদ্রবিজ্ঞানী নাদিন রামিরেজ জানান, ‘প্রশ্নটার সংক্ষেপে উত্তর হলো, হ্যাঁ। পানি অবশ্যই মেশে।’ প্রশান্ত ও আটলান্টিক মহাসাগরের পানি সব সময়ই একে অপরের সঙ্গে মিশছে। তবে বিভিন্ন জায়গায় এই মিশ্রণের গতি আলাদা। আর জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এখন এই গতিতে কিছু পরিবর্তনও আসছে।

বিষয়টি বুঝতে ধোঁয়া ওঠা এক কাপ গরম কফির কথা ভাবা যেতে পারে। কফিতে তরল ক্রিম ঢাললে তা যেমন ধীরে ধীরে মিশে এক হয়ে যায়, সাগরের পানির ক্ষেত্রেও ঠিক তেমনটাই ঘটে। দুই মহাসাগরের একপাশের পানি হয়তো বেশি লবণাক্ত, বেশি পরিষ্কার কিংবা বেশি ঠান্ডা। ফলে দুটি আলাদা পানির গুণাগুণ পুরোপুরি মিশে এক হতে কিছুটা সময় লাগে।

কফিতে চামচ দিয়ে জোরে নাড়া দিলে যেমন ক্রিম দ্রুত গলে যায়, সাগরের ক্ষেত্রেও বাতাস আর বড় বড় ঢেউ সেই চামচের কাজ করে। প্রবল ঝোড়ো বাতাস আর উত্তাল ঢেউয়ের কারণে দুই মহাসাগরের পানি খুব দ্রুতই একে অপরের সঙ্গে মিশে যায়।

আরও পড়ুন
দক্ষিণ আমেরিকার ম্যাজেলান প্রণালি যেখানে আটলান্টিক মহাসাগরে মিশেছে, সেখানেও পানির একটি সীমানা তৈরি হয়

কোথায় কীভাবে মেশে দুই মহাসাগর

প্রশান্ত ও আটলান্টিক মহাসাগরের পানি সব জায়গায় সমান গতিতে মেশে না। কোথাও দ্রুত, আবার কোথাও একটু ধীরে মিশে এক হয়। দক্ষিণ আমেরিকার দক্ষিণ প্রান্তে যেখানে অনেক ছোট ছোট দ্বীপ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে, সেখানকার প্রণালিগুলোতে পানির স্রোত কিছুটা ধীরগতির। যেমন বিগল চ্যানেলে হিমবাহ গলে আসা মিষ্টিপানি আর সাগরের নোনাপানি মুখোমুখি হলে ঠিক ইউটিউবের ভিডিওর মতো স্পষ্ট এক রেখা তৈরি করে।

দক্ষিণ আমেরিকার ম্যাজেলান প্রণালি যেখানে আটলান্টিক মহাসাগরে মিশেছে, সেখানেও পানির একটি সীমানা তৈরি হয়। এই সীমানাটি খালি চোখে সহজে দেখা যায় না। তবে সমুদ্রবিজ্ঞানীরা বিশেষ যন্ত্র দিয়ে তা মেপে দেখতে পারেন। গবেষণার গ্রাফে দেখলে মনে হয়, আটলান্টিক মহাসাগরের ভেতর যেন হালকা নীল রঙের পানির একটি দীর্ঘ অংশ ঢুকে পড়েছে। প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় বৃষ্টি বেশি হওয়ার কারণে এখানকার পানি কিছুটা কম লবণাক্ত হয়। তবে পানির এই পার্থক্য খুব বেশি সময় থাকে না। সমুদ্রের তীব্র বাতাস আর বড় বড় ঢেউ দ্রুতই দুই মহাসাগরের পানিকে মিশিয়ে এক করে দেয়।

গভীর সমুদ্রের ঢেউ ও আলোড়নের কারণেও দুই মহাসাগরের পানি মিশে যায়। সমুদ্রবিজ্ঞানীরা জানান, জোয়ার-ভাটার টানে পানি যখন সমুদ্রের অসমান তলদেশের ওপর দিয়ে যায়, তখন নিচের দিকে প্রচুর আলোড়ন তৈরি হয়।

আরও পড়ুন

দুই মহাসাগরের পানি কি সত্যি মেশে না

ইন্টারনেটে প্রায়ই দেখা যায়, সমুদ্রের এক পাশে গাঢ় নীল পানি আর অন্য পাশে ঘোলা পানি স্পষ্ট রেখা। দাবি করা হয়, এটি নাকি প্রশান্ত ও আটলান্টিক মহাসাগরের সীমানা। আর এদের পানি কখনোই নাকি একে অপরের সঙ্গে মিশতে পারে না।

আসলে এটি পুরোপুরি সঠিক নয়। নদী বা হিমবাহ সাগরে এসে মিশলে ঘনত্বের পার্থক্যের কারণে শুরুতে এমন সীমান্ত রেখা দেখা যায়। কিন্তু বিজ্ঞান বলছে, দুই মহাসাগরের পানি নিশ্চিতভাবেই একে অপরের সঙ্গে মিশে যায়।

গবেষকেরা সাগরের পানির মিশ্রণ এবং আদান-প্রদান এই দুটি বিষয়কে আলাদাভাবে দেখেন। বিজ্ঞানী ডি ল্যাভার্ন জানান, পানির প্রকৃত মিশ্রণ মানে হলো এর গুণের চিরস্থায়ী পরিবর্তন। গরম কফিতে তরল ক্রিম ঢাললে পুরো পানীয়টি যখন এক রঙের হয়ে যায়, তখনই বলা যায় এটি পুরোপুরি মিশ্রিত হয়েছে।

অন্যদিকে পানির গুণাগুণ পুরোপুরি না মিশেও এক সাগরের পানি অন্য সাগরে যাতায়াত করতে পারে, যাকে বলা হয় পানির আদান-প্রদান। বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা নানা সামুদ্রিক স্রোতের কারণে প্রশান্ত ও আটলান্টিক মহাসাগরের পানি প্রতিনিয়ত এভাবে যাতায়াত করে।

আরও পড়ুন
সাধারণত মেরু অঞ্চলের ঠান্ডা ও বেশি লবণাক্ত পানি ভারী হওয়ার কারণে নিচের দিকে নেমে যায়

অ্যান্টার্কটিকার দক্ষিণ মহাসাগরের একটি শক্তিশালী স্রোত প্রশান্ত মহাসাগর থেকে পানি নিয়ে ঘড়ির কাঁটার দিকে ঘুরে আটলান্টিক মহাসাগরে পৌঁছে দেয়। অন্য আরেকটি স্রোত প্রশান্ত মহাসাগর থেকে ভারত মহাসাগরের ভেতর দিয়ে ঘুরে গিয়ে বিপরীত দিক থেকে আটলান্টিকে পানি সরবরাহ করে।

বিভিন্ন সামুদ্রিক স্রোতের সীমানায় সাগরের পানি সব সময়ই কিছুটা মিশতে থাকে। তবে পানির সব স্তর একসঙ্গে মিশে যায় না। তাই সমুদ্রবিজ্ঞানীরা বিশ্বের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সাগরের পানির বড় বড় অংশের যাতায়াত আলাদাভাবে মেপে দেখতে পারেন। তবে চিন্তার বিষয় হলো, মানুষের তৈরি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এখন সামুদ্রিক এই স্রোতগুলোর গতি ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে।

সাধারণত মেরু অঞ্চলের ঠান্ডা ও বেশি লবণাক্ত পানি ভারী হওয়ার কারণে নিচের দিকে নেমে যায়। পানির এই নেমে যাওয়ার ধাক্কাই উত্তরমুখী সামুদ্রিক স্রোতকে সচল রাখে। কিন্তু পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ার কারণে মেরুর বরফ গলে সাগরে মিষ্টিপানি মিশছে। এই পানি খুব একটা ভারী নয়। ফলে পানি নিচে নামার গতি কমে যাচ্ছে ও পুরো সামুদ্রিক স্রোতের যাতায়াত ধীর হয়ে পড়ছে।

একই সঙ্গে সাগরের পানি একে অপরের সঙ্গে মিশে যাওয়ার গতিও কমে যাচ্ছে। বরফ গলে যাওয়ার কারণে ওপরের হালকা পানি আর গভীর সমুদ্রের ভারী পানির ঘনত্বের পার্থক্য আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে। এই ঘনত্বের তফাত যত বেশি হয়, পানি পুরোপুরি মিশে এক হতে তত বেশি সময় লাগে।

বিজ্ঞানী ডি ল্যাভার্ন জানান, যত দিন পৃথিবীতে বাতাস বইবে আর জোয়ার-ভাটা থাকবে, তত দিন সাগরের পানি মেশা আর স্রোত বয়ে চলা থামবে না।

সূত্র: লাইভ সায়েন্স ও সায়েন্স ফোকাস
আরও পড়ুন