বিশ্বের নতুন মানচিত্র, থাকবে আফ্রিকার আসল আকার

‘ইকুয়াল আর্থ প্রজেকশনছবি: সিএনএন

৪ সেপ্টেম্বর, শুক্রবার একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয় জাতিসংঘ। তারা ষোড়শ শতকের পুরোনো ‘মারকেটর’ বিশ্ব মানচিত্র বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখন থেকে নতুন একটি মানচিত্র ব্যবহার করা হবে। এই মানচিত্রে প্রতিটি দেশের আসল আকার সঠিকভাবে থাকবে। মানচিত্রে এত দিন আফ্রিকা মহাদেশকে অনেক ছোট দেখানো হতো। এখন এই ভুল বদলাতে মূলত আফ্রিকান দেশগুলো এমন উদ্যোগ নিয়েছে।

আফ্রিকান ইউনিয়নের এই প্রচারণায় নেতৃত্ব দেয় টোগো। এটা পশ্চিম আফ্রিকার একটি ছোট প্রজাতন্ত্র। বহুল ব্যবহৃত পুরোনো মারকেটর মানচিত্রে মেরু অঞ্চলের দিকের দেশগুলোকে আসল আকারের চেয়ে অনেক বড় দেখানো হতো। ফলে অন্যান্য দেশের আকার বদলে যেত। এই মানচিত্রে গ্রিনল্যান্ডকে আফ্রিকার সমান বড় দেখায়। অথচ বাস্তবে আফ্রিকা মহাদেশটি গ্রিনল্যান্ডের চেয়ে প্রায় ১৪ গুণ বড়।

আফ্রিকান দেশগুলো শত শত বছরের পুরোনো এই ভুল ঠিক করার আহ্বান জানিয়ে আসছিল। সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে গত শুক্রবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ নতুন এক বিশ্ব মানচিত্র গ্রহণের পক্ষে রায় দেয়। মোট ১৬৪টি দেশ এর পক্ষে ভোট দেয়। ৬টি দেশ ভোট দেয় না এই বিষয়ে। আর কেবল যুক্তরাষ্ট্র বিপক্ষে ভোট দেয়।

আরও পড়ুন

এই পরিবর্তনের মূল লক্ষ্য বিশ্বের প্রতিটি অঞ্চলের সঠিক আকার দেখানো। আগের মানচিত্রে বিকৃতির কারণে মানুষের মনে আফ্রিকা মহাদেশকে ছোট ও কম গুরুত্বপূর্ণ ভাবার একটি মানসিকতা তৈরি হয়েছিল। আসলে আমরা যেসব মানচিত্র দেখে অভ্যস্ত, সেগুলোর বেশির ভাগ ১৫৬৯ সালে ইউরোপীয় মানচিত্রকার জেরার্ডাস মারকেটরের তৈরি প্রজেকশন। এটি দিক চেনার জন্য খুব সুবিধাজনক হলেও দেশগুলোর প্রকৃত আয়তন ফুটিয়ে তুলতে পারত না।

এই মানচিত্রে গ্রিনল্যান্ডকে আফ্রিকার সমান বড় দেখায়। অথচ বাস্তবে আফ্রিকা মহাদেশটি গ্রিনল্যান্ডের চেয়ে প্রায় ১৪ গুণ বড়
ছবি: গার্ডিয়ান

সমস্যা হলো, মারকেটর প্রজেকশন পুরো পৃথিবীর মানচিত্র দেখানোর জন্য মোটেও সঠিক পদ্ধতি নয়। কারণ, এতে অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশের পরিমাপ বিকৃত হয়ে যায়। ফলে বিষুবরেখা থেকে দূরের দেশগুলোকে কাছের দেশগুলোর চেয়ে অনেক বেশি বড় দেখায়। এ জন্য মারকেটর মানচিত্রে গ্রিনল্যান্ডকে বিশাল দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের চেয়েও বড় ও আফ্রিকা মহাদেশের প্রায় সমান দেখায়। অথচ বাস্তবে গ্রিনল্যান্ড হলো মধ্য আফ্রিকার ছোট্ট দেশ গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের সমান।

অনেক গবেষকের মতে, এই মানচিত্র এতকাল ধরে টিকে থাকার পেছনে একটি অদৃশ্য কারণ রয়েছে। এটি ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার মতো পশ্চিমা বিশ্বকে অনেক বড় ও একদম কেন্দ্রে ফুটিয়ে তোলে, যা একধরনের মানসিক আধিপত্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। জাতিসংঘ তাদের নতুন প্রস্তাবে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, মানচিত্রের এই ভুল আকারের কারণে আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও দক্ষিণ এশিয়াকে বাস্তবে অনেক ছোট মনে করা হয়। ফলে বিশ্বজুড়ে অঞ্চলগুলো নিয়ে একটি ভুল ধারণা তৈরি হয়েছে। এই বিকৃতি শুধু ভূগোলেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং আফ্রিকার অবকাঠামোগত প্রয়োজন, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও প্রকৃত সমৃদ্ধিকে ছোট করে দেখার মানসিকতা তৈরি করে।

আরও পড়ুন

নতুন এই প্রস্তাবে ঐতিহাসিক অন্যায্যতার বিচার ও স্মারক ক্ষতিপূরণের প্রতীক হিসেবে মারকেটর প্রজেকশনের বদলে ইকুয়াল আর্থ প্রজেকশন ব্যবহারের আহ্বান জানানো হয়েছে। যাতে বিভিন্ন দেশের প্রকৃত আয়তন ও ক্ষেত্রফলকে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলে। ২০১৮ সালের উত্তর আমেরিকান কার্টোগ্রাফিক ইনফরমেশন সোসাইটি সম্মেলনে ‘ইকুয়াল আর্থ প্রজেকশন’ প্রথম তুলে ধরা হয়। এই মানচিত্রে ইউরোপকে কিছুটা ছোট, ব্রাজিলকে প্রসারিত ও গ্রিনল্যান্ডকে অনেকটাই ছোট দেখায়। আর তার বিপরীতে আফ্রিকাকে দেখা যায় অনেক বড় ও সুস্পষ্টভাবে।

চলতি বছরের মার্চ মাসে আফ্রিকান ইউনিয়ন ‘ইকুয়াল আর্থ ম্যাপ’ গ্রহণ করে। এরপর এপ্রিল মাসে টোগো আফ্রিকান ইউনিয়নের পক্ষ থেকে জাতিসংঘের অন্য সদস্যদেরও একই পথ অনুসরণের আহ্বান জানায়। তারই ধারাবাহিকতায় এই খসড়া প্রস্তাবটি তৈরি করা হয়। জুলাই মাসে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে এ বিষয়ে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ার পর এই ভোটাভুটি হয়।

আফ্রিকার স্বাস্থ্য, মানবিক বিষয় ও সামাজিক উন্নয়ন বিভাগের কমিশনার আম্মা টুম-আমোআহ মার্চ মাসে এক বিবৃতিতে জানান, ‘যে আফ্রিকাকে এত দিন মানচিত্রে ছোট করে দেখানো হতো, তা এখন ভৌগোলিক, ঐতিহাসিক, নৈতিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সব দিক থেকেই নিজের প্রকৃত গুরুত্ব ও আকার বিশ্বজুড়ে তুলে ধরতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।’

আরও পড়ুন
আফ্রিকান ইউনিয়নের এই প্রচারণায় নেতৃত্ব দেয় টোগো
ছবি: জাতিসংঘ

এমনকি নিউজিল্যান্ডও দীর্ঘদিন ধরে মারকেটর মানচিত্র নিয়ে আপত্তি তুলে আসছে। ২০১৮ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আর্ডার্নকে নিয়ে তৈরি একটি মজার পর্যটন বিজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল, মানচিত্রের এক কোনায় অবস্থান হওয়ায় নিউজিল্যান্ড যেন বিশ্বের মানচিত্র থেকেই গায়েব হয়ে যাচ্ছে।

ইকুয়াল আর্থ প্রজেকশন এই সংকটের সহজ সমাধান। এই মানচিত্রের বিভিন্ন সংস্করণ রয়েছে, যার একটিতে লন্ডনের গ্রিনিচের বদলে ওশেনিয়া অঞ্চলকে কেন্দ্রে রেখে পৃথিবীর মানচিত্র তৈরি করা হয়েছে। অথচ এতকাল ধরে বিশ্ব সময় ও মানচিত্রের কেন্দ্রীয় বিন্দু হিসেবে গ্রিনিচকেই আদর্শ ধরা হতো।

গুগল ম্যাপসের মতো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো এখনো মারকেটর প্রজেকশনের ওপর ভিত্তি করে চলে। তাই খসড়া প্রস্তাবে এসব প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে জাতিসংঘ ও অন্যান্য আঞ্চলিক সংস্থার সঙ্গে মিলে আরও নিখুঁত মানচিত্র ব্যবহারের আহ্বান জানানো হয়েছে।

সূত্র: রয়টার্স, সিএনএন ও দ্য গার্ডিয়ান
আরও পড়ুন