অদ্ভুত যেসব গবেষণা জিতল এবারের ইগ নোবেল
প্রতিবছর অক্টোবর মাসে নোবেল পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। এর আগের মাস, মানে সেপ্টেম্বর মাসে ঘোষণা হয় নোবেল পুরস্কারের প্যারোডি ‘ইগ নোবেল পুরস্কার’। অদ্ভুত ও মজাদার গবেষণাকে সম্মান জানানোর জন্যই এই উদ্যোগ। যেসব গবেষণা প্রথমে মানুষকে হাসায়, পরে ভাবায়, সেগুলোই জেতে ইগ নোবেল।
২০২৬ সালেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। ১০টি মজার গবেষণা এবারের পুরস্কারের তালিকায় এসেছে। তবে এবারের ইগ নোবেল পুরস্কারের অনুষ্ঠান প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে অনুষ্ঠিত হয়েছে। ৩ সেপ্টেম্বর সুইজারল্যান্ডের জুরিখে বসেছিল ৩৬তম আয়োজন। আন্তর্জাতিক অতিথিদের যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ নিয়ে নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কারণে এবার অনুষ্ঠানটি ইউরোপে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এবারের পুরস্কারের তালিকায় আছে চুমুর সংজ্ঞা, তেলাপোকার দুধ, সাপের কামড়, মশার শুঁড়, নাক ঝাড়া, বন্ধুত্ব, অন্তর্বাস থেকে ইউরিনাল। চলো দেখি, কোন গবেষণাগুলো এবারের ইগ নোবেল জিতল।
বায়োমেকানিকস
ম্যাটিল্ডা ব্রিন্ডল, ক্যাথরিন ট্যালবট ও স্টুয়ার্ট ওয়েস্ট চুমুর একটি নির্ভুল সংজ্ঞা তৈরির জন্য পুরস্কার পেয়েছেন। তাঁদের মতে, চুমু হলো একই প্রজাতির দুটি প্রাণীর অ-আক্রমণাত্মক মুখে মুখে যোগাযোগ। গবেষণায় পিঁপড়া, পাখি, মেরু ভালুক, মানুষসহ বিভিন্ন প্রাণীর আচরণ দেখা হয়েছে। বড় আকারের অধিকাংশ বানরজাতীয় প্রাণীর মধ্যেও চুমুর মতো আচরণ পাওয়া গেছে।
অর্থনীতি
পল পিফ, ড্যানিয়েল স্ট্যানকাটো, স্টেফান কোটে, রোডলফো মেন্ডোজা-ডেন্টন ও ড্যাচার কেল্টনার গবেষণা করেছেন সামাজিক শ্রেণি ও অনৈতিক আচরণ নিয়ে। সাতটি গবেষণায় দেখা গেছে, উচ্চ সামাজিক শ্রেণির মানুষ শিশুদের জন্য রাখা ক্যান্ডি নিয়ে নেওয়া, ট্রাফিক নিয়ম ভাঙা বা খেলায় মিথ্যা বলার মতো আচরণে তুলনামূলক বেশি আগ্রহী। অবশ্য গবেষকেরা বলেছেন, এর ব্যতিক্রমও আছে।
রসায়ন
১১ গবেষক পেয়েছেন রসায়নের পুরস্কার। তাঁদের গবেষণায় দেখা গেছে, Diploptera punctata নামের এক বিশেষ তেলাপোকার দুধের প্রোটিনে গরুর দুধের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি শক্তি থাকতে পারে। তেলাপোকার ভ্রূণ এই দুধের মতো তরল খায়, যা পরে শরীরের ভেতর ক্রিস্টালে পরিণত হয়।
চিকিৎসা
জাপানের প্রয়াত টোকুজি উননো পেয়েছেন নাক ঝাড়ার বায়ুগতিবিদ্যা নিয়ে গবেষণার জন্য চিকিৎসাবিজ্ঞানের পুরস্কার। ৬০টি পরীক্ষায় তিনি নাক দিয়ে বাতাস বের হওয়ার গতি ও কানের ভেতরের চাপ পরীক্ষা করেন। তাঁর গবেষণায় দেখা যায়, দ্রুত নাক ঝাড়লে শ্লেষ্মা বেশি কার্যকরভাবে বের হয়। তাঁকে মরণোত্তর এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।
জীববিজ্ঞান
জোয়াও মিগেল আলভেস-নুনেসসহ ছয় গবেষক খুঁজে দেখেছেন, কখন বিষধর সাপ মানুষকে বেশি কামড়ায়। ৭৫টি পিট ভাইপারের ওপর পরীক্ষায় দেখা যায়, দিনের বেলা ও উষ্ণ তাপমাত্রায় কামড়ানোর প্রবণতা বেশি। সাপের মাথায় সরাসরি পা পড়লেও কামড়ের সম্ভাবনা বাড়ে।
পদার্থবিজ্ঞান
র্যান্ডি হার্ড, ঝাও প্যান, ট্যাড ট্রাসকট ও কাভিশান থুরাইরাজাহ এমন ইউরিনাল তৈরির গবেষণা করেছেন, যাতে প্রস্রাব ছিটকে না পড়ে। তাঁদের গবেষণায় সবচেয়ে কার্যকর কোণ পাওয়া গেছে ৩০ ডিগ্রি। শামুকের খোলসের মতো বাঁকানো ‘নটি-লু’ নকশায় ছিটকে পড়া অন্য নকশার তুলনায় সর্বোচ্চ ৫০ গুণ কমেছে।
প্রযুক্তি
মশার মুখের সুচালো অংশ ব্যবহার করে অতি সূক্ষ্ম নোজল তৈরির জন্য পুরস্কার পেয়েছেন ১৩ গবেষক। ‘নেক্রোপ্রিন্টিং’ নামের এই পদ্ধতিতে ১৮ থেকে ২২ মাইক্রোমিটার পর্যন্ত সূক্ষ্ম রেজোল্যুশনে থ্রিডি প্রিন্ট করা যায়। সবচেয়ে ছোট বাণিজ্যিক ধাতব নোজলের তুলনায় এটি প্রায় দ্বিগুণ সূক্ষ্ম।
ঘ্রাণ
ইলোনা ক্রয়, তোমাস ফ্রাঙ্কোভিয়াক, টমাস হুমেল ও আগনিয়েশকা সোরোকোভস্কা গবেষণা করেছেন শিশুদের শরীরের গন্ধ নিয়ে। ২৩৫ জন অভিভাবকের ওপর গবেষণায় দেখা যায়, ছোট শিশুদের শরীরের গন্ধ তাঁদের বেশি ভালো লাগে। সন্তান বড় হয়ে কিশোর বয়সে পৌঁছালে সেই পছন্দ কমে যায়। তবে পরিবারের কিশোরদের গন্ধ অপরিচিত শিশুদের তুলনায় তাঁদের কাছে বেশি পছন্দের।
শান্তি
জেইমি অ্যারোনা ক্রেমসসহ পাঁচ গবেষক দেখিয়েছেন, আমরা যাদের অপছন্দ করি, তাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করে এমন বন্ধুকে কখনো কখনো বেশি পছন্দ করি। যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের এক হাজারের বেশি মানুষের ওপর ছয়টি গবেষণায় দেখা যায়, মানুষ সাধারণত বন্ধুর ভালো আচরণ পছন্দ করে। তবে নিজের অপছন্দের মানুষের ক্ষেত্রে কিছু মানুষ বন্ধুর কঠোর আচরণকেও ইতিবাচকভাবে দেখে।
মৃত্তিকাবিজ্ঞান
ফ্রানৎস বেন্ডার, মার্সেল ভ্যান ডের হেইডেন, আটলান্ট বিয়েরি ও পিয়া ভিভিয়ানি ২৫টির বেশি দেশে এক হাজার জোড়া অন্তর্বাস মাটির নিচে পুঁতে গবেষণা করেছেন। উদ্দেশ্য ছিল মাটির স্বাস্থ্য বোঝা। দেখা গেছে, মাটির ধরন অনুযায়ী অন্তর্বাস পচনের গতি বদলে যায়। ব্যক্তিগত বাগানের মাটিতে তা সবচেয়ে দ্রুত পচেছে। গবেষকদের তৈরি ‘আন্ডারপ্যান্ট ইনডেক্স’ মাটির অবস্থা বোঝাতে প্রচলিত টি-ব্যাগ ইনডেক্সের মতোই কার্যকর তথ্য দিতে পারে।