শুধু অস্ট্রেলিয়াতেই কেন কোয়ালা, ক্যাঙ্গারুর মতো থলিধারী প্রাণী দেখা যায়

অস্ট্রেলিয়ায় কোয়ালা, ক্যাঙ্গারু ও ওমব্যাটের মতো শত শত মার্সুপিয়াল বা থলিধারী প্রাণী দেখা যায়। কিন্তু এই থলিধারী প্রাণীগুলো কীভাবে অস্ট্রেলিয়ায় এল?

অস্ট্রেলিয়াকে বলা যায় থলিধারী প্রাণী বা মার্সুপিয়ালদের আবাসস্থল। যেখানে ক্যাঙ্গারু, কোয়ালা ও ওমব্যাটের মতো প্রাণীরা বসবাস করে। এই মহাদেশে এত থলিধারী প্রাণী দেখে মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, এই স্তন্যপায়ী প্রাণীগুলো কি শুরু থেকে এখানেই ছিল?

বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এর সহজ উত্তর হলো, না। যুক্তরাজ্যের সালফোর্ড ইউনিভার্সিটির জীববিজ্ঞানের অধ্যাপক রবিন বেকের মতে, অস্ট্রেলিয়ায় আসার অনেক আগে থেকেই অর্থাৎ অন্তত সাত কোটি বছর ধরে মার্সুপিয়ালদের অস্তিত্ব ছিল। মার্সুপিয়াল বা থলিধারী প্রাণীরা একেবারেই অস্ট্রেলিয়ার প্রাণী নয়। এরা মূলত অন্য কোথাও থেকে এই মহাদেশে এসে বসতি গড়েছে।

কুকুর বা বিড়ালের মতো স্তন্যপায়ী প্রাণীদের চেয়ে মার্সুপিয়ালদের প্রধান পার্থক্য হলো, এদের শাবকেরা জন্ম নেওয়ার সময় বেশ ছোট থাকে। আর মায়ের শরীরের থলিতে থেকেই বড় হতে থাকে।

বিজ্ঞানী রবিন বেক জানান, এই থলিধারী প্রাণীদের ছানারা যখন জন্ম নেয়, তখন তারা খুব একটা শক্তপোক্ত থাকে না। জন্মের পরই এরা কোনোমতে শরীর টেনে মায়ের পেটের থলির ভেতরে ঢুকে পড়ে। থলির ভেতরে পৌঁছানোর পর প্রায় কয়েক মাস ধরে মায়ের দুধ খেয়ে আস্তে আস্তে এরা বড় ও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

আরও পড়ুন
ক্যাঙ্গারু
ফাইণ ছবি: এএফপি

মার্সুপিয়ালদের আদি নিবাস ও বিস্তার

বিজ্ঞানীদের মতে, থলিধারী প্রাণী বা মার্সুপিয়ালদের পূর্বপুরুষদের সবচেয়ে পুরোনো জীবাশ্ম পাওয়া গেছে চীনে। যার বয়স প্রায় ১২ কোটি বছর। এর মানে হলো, থলিধারী প্রাণী ও অন্য স্তন্যপায়ী প্রাণীদের আলাদা হয়ে যাওয়ার ইতিহাসটি আরও পুরোনো। আর তা সম্ভবত উত্তর গোলার্ধের কোনো এক অঞ্চলে ঘটেছিল।

সে যুগে উত্তর গোলার্ধে লরেশিয়া নামের একটি বিশাল মহাদেশ ছিল, যার মধ্যে বর্তমানের উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ ও এশিয়া অন্তর্ভুক্ত ছিল। প্রাচীন এই মার্সুপিয়ালরা সেই মহাদেশে বেশ ভালোভাবেই ছড়িয়ে পড়েছিল। গবেষকদের মতে, সেই সময়ের মার্সুপিয়ালদের ৭০টির বেশি প্রজাতির সন্ধান পাওয়া গেছে, যার সব কটিই এখন বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

এরপর প্রায় ৬ কোটি ৬০ লাখ বছর আগে ঠিক যে সময়ে পৃথিবীর বুক থেকে ডাইনোসররা চিরতরে হারিয়ে যায়, তখন মার্সুপিয়ালরা দক্ষিণ আমেরিকায় গিয়ে পৌঁছায়। সে সময় উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা সরাসরি যুক্ত না থাকলেও এরা খুব কাছাকাছি ছিল। ফলে মধ্যে ছোট ছোট দ্বীপপুঞ্জ বা স্থলপথের মাধ্যমে প্রাণীদের এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশে যাওয়ার সুযোগ ছিল।

দক্ষিণ আমেরিকায় পৌঁছানোর পর মার্সুপিয়াল ও তাদের নিকটাত্মীয়েরা দারুণভাবে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পায়। মাত্র ২০ থেকে ৩০ লাখ বছরের মধ্যেই এদের মধ্যে বিশাল বৈচিত্র্য দেখা দেয়। এদের কিছু প্রজাতি ভালুক বা উইজেলের মতো মাংসাশী প্রাণীতে পরিবর্তিত হয়। আবার কারও কারও মুখে বড় বড় ধারালো দাঁতও গজায়। অন্য কিছু প্রজাতি ফল ও বীজ খাওয়ার উপযোগী হয়ে ওঠে।

উত্তর মহাদেশগুলোয় প্লাসেন্টাল স্তন্যপায়ী প্রাণীরা যেসব প্রাকৃতিক পরিবেশ দখল করে রেখেছিল, দক্ষিণ আমেরিকায় মার্সুপিয়ালরা ঠিক সেই পরিবেশগুলোই নিজেদের মতো দখল করে নেয়।

আরও পড়ুন

বর্তমান পরিস্থিতি ও অপোসামের গল্প

সে সময়কার থলিধারী প্রাণীদের অনেক প্রজাতি আজ আর পৃথিবীতে নেই। তবু দক্ষিণ আমেরিকা আজও মার্সুপিয়ালদের একটি প্রধান আবাসস্থল। এই অঞ্চলে ১০০টির বেশি প্রজাতির অপোসাম, সাত প্রজাতির শ্রু–অপোসাম এবং ‘মনিটো দেল মন্টে’ নামের একটি সুন্দর থলিধারী প্রাণী দেখা যায়।

এর মধ্যে গত ১০ লাখ বছরের ভেতর দক্ষিণ আমেরিকার একটি অপোসাম প্রজাতি দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে উত্তর আমেরিকায় গিয়ে বসবাস শুরু করে। ‘ভার্জিনিয়া অপোসাম’ নামের এ প্রজাতিটিই একমাত্র মার্সুপিয়াল, যা মেক্সিকোর উত্তরে বাস করে।

এখানে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার, ‘অপোসাম’ ও ‘পসাম’ কিন্তু সম্পূর্ণ এক নয়। এরা দুটি আলাদা প্রাণী। পসামের আদি নিবাস হলো অস্ট্রেলিয়া ও নিউ গিনি, আর এরা ক্যাঙ্গারুর খুব কাছের আত্মীয়। অন্যদিকে পসামের নিচের সামনের দাঁতগুলো বেশ বড় হয়, যা দক্ষিণ আমেরিকার অপোসামের মধ্যে দেখা যায় না।

আরও পড়ুন

অস্ট্রেলিয়ায় থলিধারী প্রাণীদের আসা ও টিকে থাকা

সাড়ে তিন থেকে চার কোটি বছর আগে দক্ষিণ আমেরিকা, অ্যান্টার্কটিকা ও অস্ট্রেলিয়া একসঙ্গে একটি বিশাল ভূখণ্ড হিসেবে যুক্ত ছিল। তখন অ্যান্টার্কটিকা আজকের মতো বরফে ঢাকা ছিল না; বরং ছিল সবুজ বনভূমি। বিজ্ঞানী রবিন বেকের মতে, থলিধারী প্রাণীরা দক্ষিণ আমেরিকা থেকে অ্যান্টার্কটিকা পার হয়েই অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছায়। অ্যান্টার্কটিকার সিমোর দ্বীপে পাওয়া এদের জীবাশ্ম এই তথ্যের সত্যতা প্রমাণ করে।

অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ডের ‘টিংআমাররা’ নামক স্থানে প্রায় ৫ কোটি ৫০ লাখ বছর পুরোনো থলিধারী প্রাণীর জীবাশ্ম পাওয়া গেছে। এর মধ্যে জারথিয়া নামের একটি পোকা–খেকো প্রাণী বর্তমান অস্ট্রেলিয়ার সব মার্সুপিয়ালের পূর্বপুরুষ হতে পারে বলে মনে করা হয়।

পরবর্তী প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ বছর আগের জীবাশ্ম পরীক্ষা করে দেখা যায়, তত দিনে অস্ট্রেলিয়ায় কোয়ালা ও ব্যান্ডিকুটের মতো প্রাণীদের আদিপুরুষেরা বেশ ভালোভাবেই ছড়িয়ে পড়েছিল। অস্ট্রেলিয়ায় এরা এত সফলভাবে টিকে থাকার পেছনে একটি প্রধান কারণ হতে পারে, খাবারের তীব্র সংকট বা বিপদের মুখে মায়েরা থলির অপুষ্ট ছানাকে ছেড়ে দিয়ে নিজেদের জীবন বাঁচাতে পারত, যা সাধারণ স্তন্যপায়ীদের পক্ষে সম্ভব ছিল না।

বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় সবচেয়ে বেশি প্রায় ২৬৯ প্রজাতির থলিধারী প্রাণী বাস করে। অথচ এদের জীবন শুরু হয়েছিল অন্য মহাদেশে। তাই বিজ্ঞানীরা বলেন, বর্তমানে কোনো প্রাণী যেখানে বাস করছে, যুগে যুগে তারা সেখানেই ছিল—এমন ভাবার কোনো সুযোগ নেই।

সূত্র: লাইভ সায়েন্স
আরও পড়ুন