জামরুল কেন এত পলকা
বাজারের ঝুড়ি থেকে একটা জামরুল তুলে নিলে অদ্ভুত এক অনুভূতি হয়। দেখতে এত লোভনীয়, রংটাও চোখ টানে। কিন্তু জিনিসটা ভঙ্গুর। হাতে নিলেই বোঝা যায়। সামান্য চাপেই দেবে যায়। এতে আপেলের মতো কামড় বসানো যায় না। এর মধ্যে পেয়ারার সেই মচমচ শব্দও নেই। এই নরম স্বভাবের পেছনে আসলে ফলটির ভেতরের গঠনই দায়ী।
জামরুলের বৈজ্ঞানিক নাম সিজিজিয়াম সামারানজেন্স। লবঙ্গ–জাতীয় গাছের ফল এটি। ইংরেজিতে একে ওয়াটার অ্যাপল বা ওয়াক্স অ্যাপল বলা হয়। দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়া এর আদি জন্মস্থান বলে ধরা হয়। এখান থেকে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ছড়িয়েছে বাংলাদেশ, ভারত, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডের মতো গরম ও আর্দ্র অঞ্চলে। নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে একটা ইঙ্গিত। পানি। ১০০ গ্রাম জামরুলের প্রায় ৯০ গ্রামই পানি। বাকিটা সামান্য চিনি, কিছুটা আঁশ, আর অল্প খনিজ উপাদান। এত বেশি পানি থাকার কারণেই ফলটা মূলত এত নরম হয়ে যায়। এ কারণেই গরমের দুপুরে জামরুল খেলে যেমন তেষ্টা মেটে, তেমনি পেট ভরে না বেশি।
কোষের গঠন দেখলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে। প্রতিটি উদ্ভিদ কোষের চারপাশে সেলুলোজ দিয়ে তৈরি একটি দেয়াল থাকে। আপেলের কোষ ছোট আর ঘন হয়ে বসানো। দেয়ালও পুরু। তাই কামড়ে মচমচ শব্দ ওঠে। জামরুলের কোষ তুলনায় বড়, দেয়াল পাতলা, আর কোষে কোষে ফাঁকাও বেশি। সেই ফাঁকা জায়গা পানি দিয়ে ভরে থাকে। একে অনেকটা স্পঞ্জের সঙ্গে তুলনা করা যায়। ভেতরে অসংখ্য ছোট ছোট পানির থলি। আঙুলের চাপে থলিগুলো দেবে যায়। এখান থেকেই ওই নরম অনুভূতি আসে। মজার ব্যাপার হলো, একই গাছের জামরুলও সব সময় সমান নরম হয় না। গাছের ওপরের দিকের ডালে যেগুলো বেশি রোদ পায়, সেগুলো তুলনায় একটু শক্ত হয়, আর ছায়ায় থাকা ফলগুলো নরম ও কম মিষ্টি থেকে যায়।
গাছের দিক থেকে দেখলে এই নরম হওয়া কোনো দুর্বলতা নয়; বরং একধরনের কৌশল। বীজ ছাড়ানোর কাজে নরম ফল সুবিধাজনক। পশুপাখি সহজে খায়, বীজও দূরে গিয়ে পড়ে। জামরুলের বীজ এমনিতেই খুব ছোট, অনেক সময় ফলের ভেতরে থাকেই না। গাছের তাই শক্ত আঁশ তৈরিতে বাড়তি শক্তি খরচের দরকার পড়ে না। রোদে শুকিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি এড়াতে গরম দেশে পানি জমিয়ে রাখাটাই বরং কাজের কথা। তুলনা করলে দেখা যায়, শুকনা আবহাওয়ায় জন্মানো ফল নিজেদের ভেতরে বেশি তেল ও আঁশ জমায়। যেমন খেজুর বা কাঠবাদাম। কারণ, সেখানে পানি ধরে রাখাটা অত সহজ নয়। জামরুলের পরিবেশে সেই সমস্যা নেই বলেই এটি ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছে।
খোসার দিক থেকেও একটা পার্থক্য চোখে পড়ে। জামরুলের খোসা এত পাতলা যে প্রায় স্বচ্ছ মনে হয়। আপেল বা পেয়ারার খোসায় মোমের মতো একটা পুরু আস্তরণ থাকে, যা ভেতরের ফলকে বাইরের চাপ থেকে বাঁচায়। জামরুলে সেই আস্তরণ প্রায় নেই বললেই চলে। তাই সামান্য চাপও সরাসরি ভেতরের নরম কোষে পৌঁছে যায়। বাজার থেকে আনার পথেই একটু চাপ খেলে দাগ পড়ে যায়। আসলে সেই দাগ ভেতরের কোষ ভেঙে যাওয়ারই চিহ্ন। এ কারণেই জামরুল বিক্রেতারা সরাসরি ঝুড়িতে না রেখে কলাপাতা বিছিয়ে তার ওপর সাজিয়ে রাখতেন, যেন একটার চাপ আরেকটার গায়ে না লাগে।
এখানে তাপমাত্রারও একটা ভূমিকা আছে। গরম আবহাওয়ায় গাছ দ্রুত বাড়ে, ফলও তাড়াতাড়ি পাকে। তখন কোষ দেয়াল মজবুত হওয়ার মতো সময় পায় না। শীতপ্রধান দেশে আপেল পাকতে মাসের পর মাস লাগে। সেই সময়টায় ধীরে ধীরে দেয়াল শক্ত হয়। জামরুল মোটে কয়েক সপ্তাহেই পাকে। ফুল ফোটার পর গাছ থেকে নামানো পর্যন্ত সময়টা বেশ কম।
প্রকৃতিতে প্রতিটি গাছ ও প্রাণী নিজের পরিবেশ অনুযায়ী একটা পথ বেছে নেয়। কচ্ছপের খোলস শক্ত হয়, ব্যাঙের চামড়া নরম আর ভেজা থাকে। জামরুলও নিজের নিয়মেই টিকে থাকে। বীজ ছাড়ানো সহজ করে আর পানি ধরে রেখে গরমের সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে।
স্বাদের দিক থেকে দেখলে অবশ্য এই নরম স্বভাবটাই কাজে লাগে অনেক সময়। জামরুল কুচি করে সালাদে দিলে বা লবণ–মরিচ মাখিয়ে খেলে যে হালকা ও রসালো স্বাদ পাওয়া যায়, সেটা এই বেশি পানি থাকার কারণেই সম্ভব হয়। শক্ত ফল হলে না চিবিয়ে খাওয়া এই মজাটাই থাকত না।
বাড়িতে জামরুল রাখার সময় এই নরম স্বভাবের কথা মাথায় রাখলে ভালো। ফ্রিজের নিচের তাকে ভারী কিছুর নিচে চাপা দিয়ে রাখা ঠিক নয়। আলাদা পাত্রে, একটার ওপর আরেকটা না চাপিয়ে বাতাস চলাচল করে—এমন জায়গায় রাখাই ভালো।