বারবার কেন ভূমিকম্প হচ্ছে

রাজধানী ঢাকাসহ আশপাশের এলাকায় ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে

আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী ২৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকাসহ আশপাশের অঞ্চলে ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। রাত ১০:৪৫ মিনিটে রিখটার স্কেল ৫.১ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে। ২৬ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবারও ঢাকায় মৃদু ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। বাংলাদেশে নিয়মিত ছোট ও মাঝারি ভূমিকম্প হচ্ছে। বারবার কেন ভূমিকম্প হচ্ছে, সেটা অনেকের মনে প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পৃথিবীকে দূর থেকে দেখলে মনে হবে শান্ত, নীল একটি গ্রহ। কিন্তু ভেতরে ভেতরে এটি সব সময়ই অস্থির। পৃথিবীর গায়ে কিছু অদৃশ্য রেখা আছে। এই রেখাগুলো বরাবর প্রতিদিন ছোট–বড় অসংখ্য ভূমিকম্প হয়। বেশিরভাগই এত ক্ষুদ্র যে আমরা টের পাই না। কিন্তু কখনও কখনও পৃথিবীর ভেতরে জমে থাকা শক্তি আমাদেরকে বেশ জোরে নাড়িয়ে দেয়।

বাংলাদেশ ইন্ডিয়ান, ইউরেশীয় এবং বার্মিজ, এই তিনটি সক্রিয় টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত। এ কারণেই বাংলাদেশ উচ্চ ভূমিকম্প ঝুঁকিতে পড়েছে। প্রধান সক্রিয় ফল্টগুলোর মধ্যে উত্তর-পূর্বে ডাউকি ফল্ট, মধুপুর ফল্ট এবং আসাম ফল্ট অন্যতম। বিশেষ করে সিলেট, ময়মনসিংহ, ঢাকা, রংপুর ও কুমিল্লা অঞ্চল বেশি মাত্রার ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে।

আরও পড়ুন

বাংলাদেশে ২০২৫ সালের ২১ নভেম্বর ভূমিকম্পে দুই শিশুসহ ৫ জন নিহত হন। তিন জেলায় আহত হন দুই শতাধিক। এই দিন সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে এই ভূমিকম্প হয়। বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রিখটার স্কেলে ভূমিকম্পটির তীব্রতা ছিল ৫ দশমিক ৭। উৎপত্তিস্থল নরসিংদীর মাধবদী। ভূমিকম্পটিকে মাঝারি মাত্রার বলেছিল আবহাওয়া অধিদপ্তর। প্রশ্ন হলো, এত ঘন ঘন কেন ভূমিকম্প হচ্ছে।

ভূমিকম্প পৃথিবীর স্বাভাবিক আচরণের অংশ। আমাদের গ্রহের বাইরের শক্ত স্তর ভূত্বক ও ওপরের ম্যান্টল মিলে তৈরি করেছে টেকটোনিক প্লেট। এই প্লেটগুলো বিশাল আকারের শক্ত খণ্ড, যেগুলো ধীরে ধীরে নড়াচড়া করে। একে ভাবতে পারো শক্ত স্তর হিসেবে, যা ভেতরের তাপ বের হতে দিতে একটু একটু করে সরে যায়।

এই প্লেটগুলো কোথাও একটি অপরটির সঙ্গে ধাক্কা খায়, কোথাও আলাদা হয়ে যায়, আবার কোথাও পাশাপাশি ঘষে সরে যায়। যখন একটি ভারী সমুদ্রীয় প্লেট হালকা মহাদেশীয় প্লেটের নিচে ঢুকে যায়, তাকে বলে সাবডাকশন। আবার যেখানে প্লেট আলাদা হয়, সেখানে ম্যান্টল থেকে গরম পদার্থ উঠে এসে নতুন ভূত্বক তৈরি করে।

আরও পড়ুন

১৯৫০-এর দশকে যখন পারমাণবিক পরীক্ষার নজরদারির জন্য বৈশ্বিক সিসমিক নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে, বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেন—বড় ভূমিকম্পগুলো সরু কিছু বেল্ট বরাবর ঘটছে। এই রেখাগুলোই আসলে প্লেটের সীমানা। প্লেটগুলো সরতে গেলে প্রথমে ঘর্ষণের কারণে আটকে থাকে, তারপর চাপ বাড়তে বাড়তে হঠাৎ সরে যায়। তখন ভূমিকম্প অনুভূত হয়।

মহাসাগরের নিচে প্লেটের সীমানা তুলনামূলক সরু ও স্পষ্ট। কিন্তু মহাদেশের ভেতরে সীমানা অনেক সময় বিস্তৃত, পাহাড়ি ও জটিল অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে থাকে। পুরোনো ফল্ট লাখ লাখ বছর ধরে টিকে থাকতে পারে। তাই কখনও কখনও টেকটোনিক প্লেট সীমানা থেকে দূরেও ভূমিকম্প হয়।

ভারতীয় প্লেট প্রায় ৪ কোটি বছর ধরে ইউরেশিয়ার দিকে ধাক্কা দিচ্ছে। এই সংঘর্ষ হিমালয়সহ বিশাল পর্বতশ্রেণি তৈরি করেছে। ভারতীয় প্লেট শক্ত ও পুরোনো হওয়ায় ধাক্কা সরাসরি ও তীব্র হয়। ফলে এই অঞ্চলজুড়ে অসংখ্য ফল্ট তৈরি হয়েছে। যা ভূমিকম্পের ঝুঁকি বাড়িয়েছে।

বিজ্ঞানীরা নির্দিষ্ট করে বলতে পারেন না, ঠিক কখন ভূমিকম্প হবে। তাঁরা কেবল ঝুঁকি অনুমান করতে পারেন। কোন ফল্টে কত শক্তি জমছে, অতীতে কত ঘন ঘন বড় ভূমিকম্প হয়েছে সেটা বলতে পারেন। ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে তাই সবচেয়ে বড় কাজ হলো প্রস্তুতি নেওয়া। নিরাপদ ভবন নির্মাণ, সচেতনতা, মহড়া এবং দ্রুত উদ্ধারব্যবস্থা তৈরি করলেই আমরা ভূমিকম্পে নিরাপদ থাকব।

আরও পড়ুন