‘ক্রিটিক্যাল ইগনোরিং’ কী, ২০২৬ সালে টিকে থাকার জন্য এই দক্ষতা কেন জরুরি
একটা সময় ছিল, জ্ঞানের খোঁজে সুদূর চীনে যেতে হতো। তথ্য ছিল দুষ্প্রাপ্য। সহজে কোনো জ্ঞানের খোঁজ পাওয়া যেত না। এখন সমস্যা উল্টো। এত বেশি তথ্য, চারপাশে এত জ্ঞান, কোনটা রেখে কোনটা নেব, বুঝতে পারি না। এই তথ্যের মধ্যে বেশির ভাগ অংশ খুব নিম্নমানের। এর সঙ্গে শুধু শব্দদূষণের তুলনা চলে। এখন রিলস থেকে পাওয়া জ্ঞান কি আসলেই জ্ঞান না শব্দদূষণ, আলাদা করে বোঝা যায় না। এ ব্যাপারে মার্কিন লেখক ক্রিস্টোফার মিমস বলেছেন, ২০২৬ সালের জন্য একটি বিশেষ ‘সার্ভাইভ্যাল স্কিল’ আছে। সেটা হলো ক্রিটিক্যাল ইগনোরিং। মানে সচেতনভাবে উপেক্ষা করার ক্ষমতা। টিকে থাকতে হলে উপেক্ষা করতে জানতে হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন অনেকটা আমাদের শীতকালের বুড়িগঙ্গা নদীর মতো। এত দূষণ, নাক চেপে নদী পার হতে হয়। লেখক ক্রিস্টোফার মিমস একে তুলনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর-পূর্ব ওহাইওতে অবস্থিত ষাটের দশকের কুয়াহোগা নদীর সঙ্গে। এই নদীর দূষণ এত বেশি ছিল, নদীতে বারবার আগুন লেগে যেত। সেই বিপর্যয় থেকেই জন্ম নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের এনভায়রনমেন্ট প্রোটেকশন এজেন্সি। এই নদীর দূষণের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে পাস হয়েছে ক্লিন ওয়াটার অ্যাক্ট।
এখন অনলাইনে আমরা যে অপ্রয়োজনীয় আবর্জনা বা তথ্যের মধ্যে আটকে পড়েছি, সেটা থেকে বের হওয়ার জন্য আমাদের কোনো বড় প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নেই। ফলে দায়িত্বটা এখন আমাদের ঘাড়েই এসে পড়েছে।
ক্রিটিক্যাল ইগনোরিং কী?
স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি, ক্যালিফোর্নিয়ার অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক স্যাম উইনবার্গ ২০২১ সালে ‘ক্রিটিক্যাল ইগনোরিং’ শব্দটি ব্যবহার করেন। এর মানে, চোখ বন্ধ করে সবকিছু উপেক্ষা করা না, বরং কোনো তথ্য বা উৎসের প্রাথমিক কিছু সংকেত দেখে অবিশ্বাস্য মনে হলে সচেতনভাবে সেটি এড়িয়ে যাওয়া। অনলাইন কনটেন্ট নিয়ে সবার নিজস্ব বোঝাপড়া আছে। সেটা নিয়ে সব সময় সতর্ক থাকা হলো ক্রিটিক্যাল ইগনোরিং। আমরা কিছু লক্ষণ দেখে বুঝি, আলাপটা ফালতু। লক্ষণ দেখে বুঝি এটা এআই দিয়ে বানানো, সত্য নয়, এমন তথ্যগুলো এড়িয়ে থাকা এগুলো নিয়ে সচেতন থাকা এখন জরুরি।
গবেষণায় দেখা গেছে, পেশাদার ফ্যাক্ট চেকারদের যে দক্ষতা থাকে, যেমন দ্রুত কোনো তথ্যের উৎস যাচাই করা, সেটা এখন আমাদের সবার দরকার। স্কুলে এটা যেমন শেখানো সম্ভব, প্রাপ্তবয়স্কদেরও এই শেখা জরুরি।
গভীরভাবে ভাবা নিয়েও সাবধানে থাকতে হবে
ক্রিটিক্যাল থিঙ্কিংকে সাধারণত খুব ভালো গুণ হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু ইন্টারনেটের এই যুগে এটি এখন ফাঁদ হতে পারে। যেমন রিলসে যে মানুষ গভীর জ্ঞানের কথা বলে, সেটা কিন্তু এখন ভুয়া হতে পারে। এমনকি নিজের অবস্থার সঙ্গে মিলে গেলেও ভুল হতে পারে। কারণ, যদি ভুয়া বা তুচ্ছ উৎস থেকে তথ্য নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ করা হয়, আমরা যদি সেটা খুব মনোযোগ দিয়ে শুনি, তবে আমরা ভুল করব। অনেক রিলস মনোযোগ আকর্ষণ করতে চায় বা ভিউ চায়, অপপ্রচারকারীদের সেই ভিউ বা মনোযোগই আমরা দিচ্ছি।
ভিউ বাড়ানোর জন্য কয়েকটি বিষয় টার্গেট করে রিলস বানানো হয়। যেমন মানুষের সহজাত কৌতূহল, গসিপের প্রতি টান, নাটকীয়তার প্রতি আকর্ষণ ইত্যাদি। কোনো কনটেন্টে এসব উপাদান থাকলে আমরা তাতে আকৃষ্ট হই। ফলে আমাদের প্রথম কাজ হলো সব তথ্য যে সমান গুরুত্বপূর্ণ নয়, এটি বোঝা।
অসীম মনোযোগ আমরা দিতে পারি না
আমাদের হাতে কিন্তু অসীম মনোযোগ দেওয়ার মতো জাদু নেই। আমরা রিলস দেখে ক্লান্ত হই। অন্য কাজে এর প্রভাব পড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র ৩০ মিনিট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ক্রল করলেও মানসিক ক্লান্তি তৈরি হয়। ২০২২ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, যদি কোনো পেশাদার ভলিবল খেলোয়াড় অনুশীলনের আগে আধঘণ্টা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করেন, তবে খেলোয়াড়ের হাত আর চোখের সমন্বয়ে প্রভাব পড়ে।
জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ম্যাথু ফ্যাসিনি বলেছেন, ‘সহজ উপায়গুলো এখন আমাদের জন্য কঠিন। যেমন আমরা যদি আগে ঠিক করে রাখতে পারি দিনে কতক্ষণ স্ক্রিন টাইম হবে, সেটা আমাদের রক্ষা করতে পারে। কিন্তু সেটাও সব সময় আমাদের জন্য সহজ হয় না। ফোন ব্যবহারে টাইমার সেট করে দিয়েও ব্যবহার কমানো যায় না। নিজেকে সঠিক পথে ঠেলে দেওয়ার কিছু উপায় আমাদের খুঁজে নিতে হবে।’
‘মোটামুটি সত্য’ বিপজ্জনক
স্যাপিয়েনজা ইউনিভার্সিটি অব রোমের অধ্যাপক ওয়াল্টার ওয়াল্টার কুয়াত্রোসিওচ্চি বলেছেন, চ্যাটবটের ‘হ্যালুসিনেশন’ বড় এক সমস্যার অংশ। চ্যাটবটের ‘হ্যালুসিনেশন’ হলো বড় ভাষা মডেলগুলোর দেওয়া এমন তথ্য, যা শুনতে বিশ্বাসযোগ্য লাগে। কিন্তু একটা খবর শুনতে বিশ্বাসযোগ্য হওয়া আর খবরটা সত্য হওয়া, এক জিনিস নয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোয় আমরা এখন এমন কনটেন্টে অভ্যস্ত হয়েছি, যেগুলো বলা হয় বেশ সাবলীল ভঙ্গিতে। কথায় বেশ যুক্তি থাকে। অনেক লাইক পড়ে এসব কনটেন্টে। কিন্তু সেগুলো সত্য কি না, সেটা আমাদের ভাবতে হবে। ‘শুনতে ঠিকঠাক’ মনে হলেও আমাদের থামা উচিত। ভাবা উচিত তথ্যটা অর্ধসত্য কি না। অর্ধসত্য বিশ্বাস করার এই অভ্যাস বিপজ্জনক।
ইন্টারনেটকে ব্যবহার করতে হবে ইন্টারনেটের বিরুদ্ধে
ডিজিটাল সাক্ষরতা বিশেষজ্ঞ মাইক কৌলফিল্ড ‘ল্যাটারাল রিডিং’ করতে বলেছেন। এর মানে, কোনো বিষয়ে গভীরভাবে পড়ার আগে এক ধাপ পিছিয়ে যেতে হবে। একটা সার্চ করে দেখতে হবে অন্য বিশ্বস্ত সূত্র কী বলছে।
গুগল ক্রোম ব্রাউজারে ‘অ্যাবাউট দিস পেজ’ নামে একটি ফিচার আছে। এই ফিচার থেকে ওয়েবসাইটের উৎস সম্পর্কে যাচাই করা তথ্য পাওয়া যায়। কৌলফিল্ড আরও বলেছেন, চাইলে এআই দিয়েও এসব দাবির সত্যতা যাচাই করা যায়। তবে সাধারণ ফ্রি সংস্করণের বদলে উন্নত সংস্করণে ফলাফল ভালো আসে। তিনি একটি ৩ হাজার ৫০০ শব্দের একটি প্রম্পট তৈরি করেছেন। যার নাম ‘ডিপ ব্যাকগ্রাউন্ড’। এটি ধাপে ধাপে দাবির সত্যতা বিশ্লেষণ ও যাচাই করে। এআই দিয়ে তথ্যের সত্যতা যাচাই করে দেখা উচিত।
এআই ব্যবহার করে এআই কনটেন্টের ফ্যাক্ট চেক করার বিষয়টা শুনতে গোলমেলে লাগতে পারে। কিন্তু ইতিহাস থেকে দেখা যায়, আগের প্রযুক্তির তৈরি করা সমস্যা সব সময় নতুন প্রযুক্তি সমাধান করে। এখন প্রযুক্তি উন্নত হচ্ছে। এখন যেকোনো তথ্য সহজে যাচাই করা যায়। সামনে ব্যবস্থা আরও ভালো হবে। কিন্তু একটি বিষয় বদলাবে না। সেটা হলো অ্যালগরিদম। আমাদের অ্যালগরিদম আমাদের আটকে ফেলতে যেন না পারে, তার জন্য নিজে উদ্যোগী হয়ে তথ্য যাচাই করতে হবে।
২০২৬ সালে বেঁচে থাকার বিশেষ দক্ষতা হলো ক্রিটিক্যাল ইগনোরিং। নতুন কিছু শেখার চেয়ে কোন জিনিসটি সচেতনভাবে উপেক্ষা করতে হবে, সেটা শেখা এখন গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল