পৃথিবীর শেষ প্রান্ত কোথায়, কেমন আছে সেখানকার মানুষ
ব্যাগপত্র গুছিয়ে বিশাল এক রোমাঞ্চকর অভিযানের জন্য তৈরি হয়ে যাও। আজ আমরা যাব পৃথিবীর একদম শেষ প্রান্তে! তবে সত্যি সত্যি নয়, কল্পনায়। পৃথিবী গোল বলে তুমি হয়তো বলতে পারো, এর আবার শুরু বা শেষ কোথায়? ভৌগোলিকভাবে কথাটা সত্যি হলেও মানুষের বসতির কিন্তু একটা শেষ সীমানা আছে। মানুষের তৈরি সবচেয়ে উত্তরের ও সবচেয়ে দক্ষিণের শহরগুলো ঠিক কোথায় অবস্থিত? সেখানকার জীবনযাত্রা কেমন?
প্রথমে চলো যাই পৃথিবীর দক্ষিণ গোলার্ধে। মানচিত্রে দক্ষিণ মেরুর দিকে চোখ বোলালে দেখবে ৪৫ ডিগ্রি অক্ষাংশের পর থেকে মানুষের বসতি প্রায় নেই বললেই চলে। সেখানে শুধু ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ এবং চিলি, আর্জেন্টিনা ও নিউজিল্যান্ডের একেবারে শেষ মাথাটুকু চোখে পড়ে।
তাহলে পৃথিবীর সবচেয়ে দক্ষিণের শহর কোনটি? প্রধানত তিনটি শহরের মধ্যে দারুণ লড়াই চলে। চিলির পুয়ের্তো উইলিয়ামস ও পুন্তা আরেনাস এবং আর্জেন্টিনার উশুইয়া। সবচেয়ে দক্ষিণে অবস্থিত চিলির পুয়ের্তো উইলিয়ামস। এটি এতই দক্ষিণে যে মানচিত্রে দেখলে মনে হবে, এটি বুঝি দক্ষিণ আমেরিকার মূল ভূখণ্ডের সঙ্গেই লেগে আছে। কিন্তু এটি আসলে একটি দ্বীপ। তবে এখানে সমস্যা হলো জনসংখ্যা। মাত্র দুই হাজার মানুষের এই ছোট্ট জায়গাকে অনেকেই শহর হিসেবে মানতে নারাজ। এরপর আসে চিলির পুন্তা আরেনাস। এর জনসংখ্যা পুয়ের্তো উইলিয়ামসের চেয়ে প্রায় ৬০ গুণ বেশি, আধুনিক অনেক সুবিধাও আছে। কিন্তু ভৌগোলিকভাবে এটি পুয়ের্তো উইলিয়ামস থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত। তাই একেও সবচেয়ে দক্ষিণের শহর বলাটা ঠিক মানানসই হয় না।
সবদিক বিচার করে এই খেতাব জিতেছে আর্জেন্টিনার উশুইয়া। চিলির ওই দুই শহরের ঠিক মাঝামাঝি জায়গায় টিয়েরা দেল ফুয়েগো নামের প্রদেশে এর অবস্থান। প্রায় ৮৩ হাজার মানুষের বাস এই শহরে। চমৎকার রাস্তাঘাট, আধুনিক দালানকোঠা ও পর্যটকদের কোলাহলে এটি একটি সত্যিকারের শহর। একে বলা হয় ফিন দেল মুন্দো বা পৃথিবীর শেষ প্রান্ত। যাঁরা অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশে বেড়াতে যান, তাঁদের জাহাজ মূলত এই উশুইয়া বন্দর থেকেই ছাড়ে। এখানে পেঙ্গুইনের দল ও বরফে ঢাকা পাহাড়ের অদ্ভুত সুন্দর এক মেলবন্ধন দেখা যায়।
উত্তরে যাওয়ার আগে একটা মজার তথ্য জেনে নাও। পৃথিবীর ভূগোলটা একটু অদ্ভুত। তুমি যদি উশুইয়ার মতো ঠিক একই অক্ষাংশে উত্তর গোলার্ধে যাও, তবে তুমি পৃথিবীর শেষ প্রান্তে পৌঁছাবে না; বরং তুমি থাকবে ইংল্যান্ডের কোনো এক সুন্দর শহরে!
কারণ, উত্তর গোলার্ধে প্রচুর স্থলভাগ রয়েছে। এ ছাড়া সমুদ্রের উষ্ণ স্রোতের কারণে উত্তরের আবহাওয়া একই অক্ষাংশের দক্ষিণ গোলার্ধের তুলনায় অনেক বেশি বাসযোগ্য। তাই উত্তরের শেষ প্রান্তে পৌঁছাতে হলে আমাদের আরও অনেক দূরে যেতে হবে।
উত্তর মেরুর দিকে ৭০ ডিগ্রি অক্ষাংশ পার হলেও বেশ কিছু মানুষের বসতি চোখে পড়বে। কানাডার নুনাভুট অঞ্চলের অ্যালার্ট হলো পৃথিবীর সবচেয়ে উত্তরের স্থায়ী জনবসতি। কিন্তু এখানে কোনো সাধারণ মানুষ থাকে না। মূলত সামরিক বাহিনীর সদস্য ও গবেষকেরা এখানে কাজ করেন এবং বছর ঘুরে তাঁরা চলেও যান। তাই একে শহর বলা যায় না।
আরেকটু দক্ষিণে নরওয়ের স্বালবার্ড দ্বীপপুঞ্জে রয়েছে লংইয়ারবাইন। এটি পৃথিবীর অন্যতম উত্তরের শহর। এখানকার নিয়মকানুন খুব অদ্ভুত। এখানে মানুষের চেয়ে মেরুভালুকের সংখ্যা বেশি! তাই শহরের বাইরে বের হলে নিরাপত্তার জন্য বন্দুক সঙ্গে রাখা বাধ্যতামূলক। মজার ব্যাপার হলো, এখানে কেউ মারা গেলে তাঁকে এই শহরে কবর দেওয়া নিষিদ্ধ। কারণ, তীব্র ঠান্ডায় লাশ কখনো পচে না! প্রায় ২ হাজার ৮০০ মানুষের এই জায়গাটিতে চমৎকার আধুনিক জীবনযাত্রা থাকলেও শহরের সংজ্ঞায় এটি পুরোপুরি পড়ে না।
তাহলে পৃথিবীর সবচেয়ে উত্তরের আনুষ্ঠানিক শহর কোনটি? এর জন্য আমাদের যেতে হবে আমেরিকার আলাস্কায়। শহরটির নাম উটকিয়াগভিক। এর পুরোনো নাম ছিল ব্যারো। প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের এই শহরটিই আইনগতভাবে পৃথিবীর সবচেয়ে উত্তরের শহর। সুমেরু বৃত্তের অনেক ওপরে হওয়ায় এখানকার জীবনযাত্রা ভীষণ কঠিন।
উটকিয়াগভিক শহরের সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো এর দিনরাত্রির খেলা। শীতকালে এখানে টানা প্রায় ৬৫ দিন সূর্য ওঠে না! একে বলা হয় পোলার নাইট। তখন পুরো শহর অন্ধকারে ডুবে থাকে। আবার গ্রীষ্মকালে টানা আড়াই মাস সূর্য কখনো অস্ত যায় না, মাঝরাতেও আকাশে জ্বলজ্বল করে সূর্য! মূলত ইনুপিয়াত নামে আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ হাজার হাজার বছর ধরে এই চরম পরিবেশে তিমি শিকার করে নিজেদের টিকিয়ে রেখেছে।
পৃথিবীর দুই প্রান্তের গল্প তো শুনলে। অদ্ভুত বিষয় হলো, সবচেয়ে দক্ষিণের শহর উশুইয়া ও সবচেয়ে উত্তরের শহর উটকিয়াগভিক—দুটিই অবস্থিত আমেরিকা মহাদেশে। তাই তুমি যদি কখনো পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে হেঁটে বা গাড়িতে যেতে চাও, তবে তাত্ত্বিকভাবে তা এই আমেরিকা মহাদেশ দিয়েই সম্ভব! কোনো দিন প্যান–আমেরিকান হাইওয়ের কাজ পুরোপুরি শেষ হলে হয়তো তোমার সেই স্বপ্ন সত্যিও হতে পারে।