শূন্য দিয়ে ভাগ করা যায় না কেন

শূন্য গণিতের একটি বিপ্লবী ধারণা ও আধুনিক প্রযুক্তির ভিত্তিছবি: শাটারস্টক

স্মার্টফোনের ক্যালকুলেটরটা হাতে নিয়ে যেকোনো একটা সংখ্যাকে শূন্য দিয়ে ভাগ করে দেখো তো! স্ক্রিনে সঙ্গে সঙ্গে ভেসে উঠবে ‘Math Error’ বা ‘Cannot divide by zero’। ছোটবেলা থেকে স্কুলের অঙ্কের ক্লাসে শিক্ষকেরা কড়া গলায় একটা নিয়ম শিখিয়ে এসেছেন, পৃথিবীর যেকোনো সংখ্যাকে যেকোনো সংখ্যা দিয়ে ভাগ করা যায়, শুধু শূন্য দিয়ে ভাগ করা বারণ।

কিন্তু কেন? শূন্যের কী এমন অপরাধ যে তাকে দিয়ে কাউকে ভাগ করা যাবে না? শূন্য দিয়ে ভাগ করলে এমন কী মহভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে?

গণিতের দুনিয়ায় এটি অন্যতম রোমাঞ্চকর একটি প্রশ্ন। এর উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের একটু গভীরে যেতে হবে, অঙ্কের সাধারণ নিয়ম থেকে শুরু করে ইতিহাসের পাতা ঘুরে আসতে হবে। চলো, শূন্যের এই গোলকধাঁধার জট খোলা যাক।

ভাগ মানে আসলে কী

সহজ কথায়, ভাগ হলো বারবার বিয়োগ করার একটি শর্টকাট পদ্ধতি। একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। তোমার কাছে ২০টি আপেল আছে। তুমি ৫ জন বন্ধুর মধ্যে সেগুলো সমানভাগে ভাগ করে দিতে চাও। তুমি কী করবে? ২০ থেকে বারবার ৫ বিয়োগ করতে থাকবে।

প্রথমবার ৫টা দিলে, রইল ১৫টা। (২০ - ৫ = ১৫)

দ্বিতীয়বার ৫টা দিলে, রইল ১০টা। (১৫ - ৫ = ১০)

তৃতীয়বার ৫টা দিলে, রইল ৫টা। (১০ - ৫ = ৫)

চতুর্থবার ৫টা দিলে, রইল ০টা। (৫ - ৫ = ০)

তুমি ঠিক ৪ বার বিয়োগ করার পর আপেল শেষ হয়ে গেল। তার মানে ২০-কে ৫ দিয়ে ভাগ করলে উত্তর হয় ৪।

আরও পড়ুন

এবার এই একই কাজটা শূন্য দিয়ে করার চেষ্টা করো। তোমার কাছে ২০টি আপেল আছে, তুমি শূন্য জন বন্ধুর মধ্যে ভাগ করবে। অর্থাৎ তুমি ২০ থেকে বারবার শূন্য বিয়োগ করবে।

২০ - ০ = ২০

২০ - ০ = ২০

২০ - ০ = ২০...

তুমি অনন্তকাল ধরে শূন্য বিয়োগ করতে থাকলেও তোমার আপেল ২০টিই থেকে যাবে। বিয়োগ করা কখনোই শেষ হবে না। কোনো নির্দিষ্ট উত্তরও পাওয়া যাবে না। শূন্য দিয়ে যে ভাগ করা যায় না, এটি তার প্রথম ও সবচেয়ে সহজ প্রমাণ।

গুণের উল্টো পিঠ

গণিতে ভাগের আরেকটা পরিচয় আছে। ভাগ হলো মূলত গুণের একদম উল্টো প্রক্রিয়া। যেমন ধরো, ১০-কে ২ দিয়ে ভাগ করলে ৫ হয়, অর্থাৎ ১০ ÷ ২ = ৫। এর মানে হলো, ভাগফল ৫-কে আবার ২ দিয়ে গুণ করলে তুমি আগের সংখ্যাটা, অর্থাৎ ১০ ফিরে পাবে। মানে ৫ × ২ = ১০।

এবার ১০ কে শূন্য দিয়ে ভাগ করার চেষ্টা করো। ধরে নিই, ১০ ÷ ০ = ‘ক’।

ভাগের উল্টো নিয়ম অনুযায়ী, এই ‘ক’-এর সঙ্গে শূন্য গুণ করলে উত্তর ১০ হতে হবে (ক × ০ = ১০)।

কিন্তু আমরা সবাই জানি, পৃথিবীর যেকোনো সংখ্যাকে শূন্য দিয়ে গুণ করলে উত্তর সব সময় শূন্যই হয়। এমন কোনো সংখ্যা কি পৃথিবীতে আছে, যাকে শূন্য দিয়ে গুণ করলে ১০ পাওয়া যাবে? নেই! যেহেতু এমন কোনো সংখ্যা খুঁজে পাওয়া অসম্ভব, তাই গণিতবিদেরা সিদ্ধান্তে এসেছেন, শূন্য দিয়ে ভাগ করা অর্থহীন।

শূন্যকে শূন্য দিয়ে ভাগ করলে কী হবে

তোমার মাথায় এখন একটা দারুণ প্রশ্ন আসতে পারে। অন্য কোনো সংখ্যাকে শূন্য দিয়ে ভাগ করা যায় না বুঝলাম, কিন্তু শূন্যকে শূন্য দিয়ে ভাগ করলে কী হবে? মানে ০ ÷ ০ = কত?

চলো, আবার সেই গুণের উল্টো নিয়মে ফিরে যাই। ধরে নিই, ০ ÷ ০ = ‘খ’।

তাহলে নিয়ম অনুযায়ী, ‘খ’× ০ = ০ হতে হবে।

এবার একটু ভেবে দেখো, ‘খ’-এর জায়গায় তুমি যদি ৫ বসাও, তাহলেও উত্তর মিলে যায়। অর্থাৎ ৫ × ০ = ০। যদি ১০০ বসাও, তাহলেও মেলে-১০০ × ০ = ০। তুমি ‘খ’-এর জায়গায় পৃথিবীর যেকোনো সংখ্যা বসালেই এই সমীকরণটি মিলে যাবে।

গণিতের সবচেয়ে বড় শর্ত হলো, যেকোনো হিসাবের একটি নির্দিষ্ট এবং অনন্য (ইউনিক) উত্তর থাকতে হবে। ২ যোগ ২ সমান সব সময় ৪-ই হতে হবে। কিন্তু শূন্যকে শূন্য দিয়ে ভাগ করলে আমরা অনন্ত সংখ্যক উত্তর পাচ্ছি। নির্দিষ্ট কোনো উত্তর পাওয়া যাচ্ছে না বলে গণিতের ভাষায় একে বলা হয় অনির্ণেয়। অর্থাৎ এর মান নির্ণয় করা সম্ভব নয়।

আরও পড়ুন

ব্রহ্মগুপ্তের ভুল

শূন্যের ধারণা প্রথম আবিষ্কার হয়েছিল ভারতীয় উপমহাদেশেই। সপ্তম শতাব্দীতে বিখ্যাত গণিতবিদ ব্রহ্মগুপ্ত তাঁর ব্রাহ্মস্ফুটসিদ্ধান্ত বইয়ে প্রথমবারের মতো শূন্যের গাণিতিক নিয়মকানুন লিখেছিলেন। শূন্যের সঙ্গে যোগ, বিয়োগ বা গুণ করলে কী হয়, তা তিনি নিখুঁতভাবে দেখিয়েছিলেন।

কিন্তু শূন্য দিয়ে ভাগের বেলায় এসে তিনিও হোঁচট খান। ব্রহ্মগুপ্ত লিখেছিলেন, শূন্যকে শূন্য দিয়ে ভাগ করলে উত্তর শূন্যই হয়। মানে ০ ÷ ০ = ০। আমরা আগেই দেখেছি, এই ধারণা গাণিতিকভাবে ভুল।

এর প্রায় ৫০০ বছর পর আরেকজন বিখ্যাত ভারতীয় গণিতবিদ দ্বিতীয় ভাস্কর এই সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেন। তিনি বললেন, যেকোনো সংখ্যাকে শূন্য দিয়ে ভাগ করলে উত্তর হবে অসীম। তিনি এই অসীমের নাম দিয়েছিলেন খহর (Khahara)।

ভাস্করের এই ধারণা বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল। কিন্তু আধুনিক গণিত এসে প্রমাণ করে দিল, ভাস্করের ধারণাতেও একটু ঝামেলা আছে। কারণ, অসীম আসলে কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা নয়, এটি একটি ধারণা মাত্র।

অসীমের গোলকধাঁধা ও ক্যালকুলাসের সমাধান

ভাস্করের থিওরিটা কেন পুরোপুরি ঠিক নয়, তা বুঝতে হলে আমাদের ক্যালকুলাসের লিমিট বা সীমার ধারণাটি বুঝতে হবে।

ধরো, আমরা ১-কে খুব ছোট কোনো সংখ্যা দিয়ে ভাগ করব।

১ কে ০.১ দিয়ে ভাগ করলে হয় ১০।

১ কে ০.০১ দিয়ে ভাগ করলে হয় ১০০।

১ কে ০.০০০১ দিয়ে ভাগ করলে হয় ১০,০০০।

দেখতেই পাচ্ছ, আমরা শূন্যের যত কাছাকাছি যাচ্ছি, উত্তর তত বড় হচ্ছে। এভাবে ভাগ করতে করতে ঠিক শূন্যের কাছে পৌঁছালে উত্তর অসীমের দিকে ছুটে যাবে। ভাস্কর ঠিক এটাই ভেবেছিলেন।

কিন্তু মুদ্রার আরেকটা পিঠও আছে। আমরা তো ঋণাত্মক দিক থেকেও শূন্যের দিকে এগোতে পারি!

১ কে- ০.১ দিয়ে ভাগ করলে হয় -১০।

১ কে- ০.০১ দিয়ে ভাগ করলে হয় -১০০।

১ কে- ০.০০০১ দিয়ে ভাগ করলে হয় -১০,০০০।

অর্থাৎ আমরা যদি ঋণাত্মক দিক থেকে শূন্যের দিকে এগোই, তবে উত্তর মাইনাস ইনফিনিটির দিকে ছুটবে।

একই বিন্দুতে পৌঁছানোর জন্য ধনাত্মক দিক থেকে এলে উত্তর যাচ্ছে পাহাড়ের চূড়ায়, মানে ইনফিনিটের দিকে; আবার ঋণাত্মক দিক থেকে এলে উত্তর চলে যাচ্ছে পাতালের অতলে, মানে নেগেটিভ ইনফিনিটি। যেহেতু দুই দিকের গন্তব্য এক জায়গায় মিলছে না, তাই আধুনিক গণিত ভাস্করের অসীম তত্ত্বকে বাতিল করে দিয়ে একে অসংজ্ঞায়িত ঘোষণা করেছে।

আরও পড়ুন

গণিতের সর্বনাশ

শূন্য দিয়ে ভাগ করাকে যদি গণিতে কোনোভাবে ছাড়পত্র দেওয়া হতো, তবে কী ভয়ংকর কাণ্ড ঘটত জানো? পুরো গণিতের ভিতটাই ধসে পড়ত! বীজগণিতের সামান্য মারপ্যাঁচ কষে তুমি প্রমাণ করে দিতে পারতে যে ১ এবং ২ আসলে সমান। চলো, মজাটা হাতেকলমে দেখি।

ধরে নিই, a এবং b দুটি সমান সংখ্যা। (a = b)

দুই পাশেই a দিয়ে গুণ করি। তাহলে পাব: a² = ab

এবার দুই পাশ থেকে b² বিয়োগ করি। তাহলে পাব: a² - b² = ab - b²

বীজগণিতের সূত্র অনুযায়ী ভাঙলে বাঁ পাশে দাঁড়ায়: (a + b)(a - b)

ডান পাশ থেকে b কমন নিলে দাঁড়ায়: b(a - b)

তাহলে সমীকরণটি হলো: (a + b)(a - b) = b(a - b)

এবার দুই পাশ থেকেই (a - b) বাদ দিই। তাহলে বাকি থাকে: a + b = b

যেহেতু আমরা শুরুতেই ধরেছিলাম a = b, তাই a-এর জায়গায় b বসিয়ে পাই:

b + b = b

বা, 2b = b

এবার দুই পাশ থেকে b কেটে দিলে কী থাকে?

২ = ১!

কী সাংঘাতিক ব্যাপার! ২ আর ১ কীভাবে সমান হয়?

ভুলটা আসলে কোথায় হয়েছে জানো? ওই যে আমরা দুই পাশ থেকে (a - b) কেটে দিয়েছিলাম, ভুলটা সেখানেই।

যেহেতু a এবং b সমান (a = b), তার মানে (a - b) এর মান আসলে শূন্য (০)! সমীকরণের দুই পাশ থেকে কোনো কিছু কেটে দেওয়া মানে হলো দুই পাশকে ওই সংখ্যা দিয়ে ভাগ করা। আমরা এখানে অজান্তেই পুরো সমীকরণকে শূন্য (০) দিয়ে ভাগ করে ফেলেছিলাম। আর শূন্য দিয়ে ভাগ করার কারণেই ২ আর ১ সমান হয়ে যাওয়ার মতো এমন অদ্ভুত ও হাস্যকর ফল তৈরি হয়েছে।

এ জন্যই গণিতবিদেরা বলেছেন, আর যা-ই করো, শূন্য দিয়ে ভাগ করার চেষ্টা করবে না। যদি করো, তবে গণিতের সব যুক্তি, প্রমাণ এবং সূত্র তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে।

আরও পড়ুন