গণিতের সব সমীকরণ যেভাবে সমাধান করা যায়

সংখ্যা বা অঙ্ক না থাকলে আমাদের জীবনটা কেমন হতো? ভাবতেই পারো, ‘আহা! কী আনন্দ। আমাদের আর অঙ্ক করতে হবে না!’ কিন্তু এর পরিণতিটা একবার ভেবে দেখেছ?

আদিমকালের মানুষদের কথা ভেবে দেখো। শুরুতে তো তাদের কোনো সংখ্যা ছিল না। সারা দিন শিকার করার পর তারা যখন দিনের শেষে শিকার গোনা শুরু করল, তখন থেকেই মানুষ পৃথিবীকে বোঝার জন্য সংখ্যাকে সবচেয়ে জরুরি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। সেই আদিমকাল থেকে পৃথিবীকে সহজভাবে বোঝার জন্য সংখ্যা মানুষের দারুণ এক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। সময় যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের সভ্যতা যেমন উন্নত হয়েছে, তেমনি সংখ্যার দুনিয়াটাও হয়েছে আরও আধুনিক, আরও চমকপ্রদ। মানুষ যখনই নতুন কোনো সমস্যার মুখে পড়েছে, তখনই তারা আবিষ্কার করেছে একদম আনকোরা, নতুন ধাঁচের সব সংখ্যা। আজ আমরা শুনব সেই সংখ্যার জাদুকরি পরিবর্তনের গল্প!

সংখ্যার কাজ কী

সংখ্যার সবচেয়ে প্রথম ও প্রধান কাজ হলো গোনা। যেমন বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি, আয়তন ১ লাখ ৪৭ হাজার ৫৭০ বর্গকিলোমিটার ইত্যাদি। গোনার এই ধারণা মাথায় আসার পরই মানুষ সংখ্যা দিয়ে নানা সমস্যার সমাধান করতে শুরু করে। তবে গণনার এই যাত্রা কিন্তু সহজ ছিল না।

অনেক অনেক দিন আগের কথা। মানুষ তখনো গুহায় থাকে, বনে-জঙ্গলে শিকার করে। তখনো কিন্তু সংখ্যার দারুণ কদর ছিল। তবে তাদের সংখ্যাগুলো ছিল খুব সহজ। যেমন, একটা হরিণ, দুটি গাছ কিংবা আকাশের তিনটি তারা। এই যে গোনাগুনতি, এটা দিয়েই মানুষ প্রথম সমস্যার সমাধান করতে শিখল।

ধরো, তোমার পরিবারে চারজন সদস্য আছে এবং প্রতিদিন সবার দুই জগ করে পানি লাগে। আবার তোমার সুন্দর একটা সবজির বাগান আছে, সেখানে রোজ আরও তিন জগ পানি দিতে হয়। তাহলে সব মিলিয়ে তোমার মোট কত জগ পানি লাগবে? অঙ্কের ভাষায় আমরা এটাকে এভাবে লিখতে পারি: (৪ x ২) + ৩ = ?।

আজকের দিনের গণিতবিদেরা অজানা কোনো সংখ্যা বের করার জন্য x বা y-এর মতো ইংরেজি অক্ষর ব্যবহার করতে খুব পছন্দ করেন। কিন্তু আমাদের মাতৃভাষা যেহেতু বাংলা, তাই আমরা ইংরেজি শব্দ না লিখে বাংলায় ‘ক’ বা ‘খ’ লিখতে পারি।

তাহলে ওপরের সমস্যাটিকে আমরা লিখতে পারি (৪ x ২) + ৩ = ক। এটাই হলো একটা সমীকরণ! এটি সমাধান করার জন্য শুধু হিসাব করলেই উত্তর বেরিয়ে আসবে ক = ১১। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, সব সমীকরণ এত সহজে সমাধান করা যায় না।

আরও পড়ুন

সংখ্যা যখন ভাগাভাগি করতে হয়

এবার একটু অন্য রকম সমস্যার কথা ভাবি। ধরো, একজন শিকারির দুজন সন্তান আছে। কিন্তু তিনি সারা দিন শিকার করে মাত্র একটাই খরগোশ পেয়েছেন! এখন তিনি এই একটা খরগোশ দুই সন্তানের মধ্যে কীভাবে সমান ভাগে ভাগ করে দেবেন? একটা আস্ত খরগোশ তো আর দুজনকেই আস্ত দেওয়া সম্ভব না। গোটা সংখ্যার দুনিয়ায় এর কোনো সমাধান নেই।

ঠিক এ রকম সমস্যা থেকেই এক নতুন ধরনের সংখ্যার জন্ম হলো। একে আমরা বলি ভগ্নাংশ। গণিতবিদেরা একটু রাশভারী গলায় এদের ডাকেন র‍্যাশনাল নাম্বার। বাংলায় একে আমরা বলি মূলদ সংখ্যা। হয়তো আগে এই সংখ্যার নাম শুনেছ। কিন্তু কী এই মূলদ সংখ্যা? ধরো, ১/২ বা অর্ধেক। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, প্রাচীন মিসরীয়রা এই ভগ্নাংশ নিয়ে রীতিমতো মেতে ছিল! তাদের কাছে তো ১/২ বা অর্ধেক বোঝানোর জন্য আলাদা একটা চিত্রলিপিই ছিল।

কিন্তু সে ইতিহাস বাদ দিয়ে আগে একটু মূলদ সংখ্যা বোঝা যাক। ধরো, তোমার কাছে একটি পিৎজা আছে। ছোট পিৎজা, বেশি বড় না। তুমি সেটি ৪ টুকরো করলে। তুমি খেলে ৩ টুকরো। তাহলে তুমি কতটুকু খেয়েছ? ৪ ভাগের ৩ ভাগ খেয়েছ। গণিতের ভাষায় একে লেখা হয় এভাবে: ৩/৪ অংশ পিৎজা।

এখন প্রশ্ন হলো, ৩/৪ কি একটি সংখ্যা? হ্যাঁ, অবশ্যই সংখ্যা। এ ধরনের সংখ্যাকেই বলে মূলদ সংখ্যা। আরেকটু ভেঙে বলি। যে সংখ্যাকে দুটি পূর্ণসংখ্যার ভগ্নাংশ হিসেবে লেখা যায়, তাকে মূলদ সংখ্যা বলে। ওপরের আমরা লিখেছি ৩/৪। এখানে ৩ একটি পূর্ণসংখ্যা, ৪ পূর্ণসংখ্যা। তাই এটি একটি মূলদ সংখ্যা। তবে ভগ্নাংশের নিচে ০ থাকলে কিন্তু তা মূলদ সংখ্যা হবে না। আসলে কোনো সংখ্যাই হবে না। কারণ, কোনো কিছুকে শূন্য দিয়ে ভাগ করা যায় না। কেন যায় না, সে ব্যাপারে একটু পরে আসছি। তবে শূন্য ওপরে থাকলে কোনো সমস্যা নেই। যেমন, ০/৫ মূলদ সংখ্যা, কিন্তু ৫/০ লিখলে হবে না।

আবার দশমিক সংখ্যাও মূলদ সংখ্যা হতে পারে। যদি কোনো দশমিক সংখ্যা শেষ হয়ে যায় বা একই সংখ্যা বারবার চলতে থাকে, তাহলে সেটিও মূলদ সংখ্যা। যেমন ৩/৪ সংখ্যাটিকে দশমিক আকারে লিখলে হবে ০.৭৫। অর্থাৎ, দশমিক শেষ হয়ে গেছে, তাই এটি মূলদ সংখ্যা। আবার ১/৩ সংখ্যাটিকে দশমিক আকারে লিখলে হবে ০.৩৩৩৩৩…। শেষে দেখো তিনটা ডট (…) আছে। ডটের মানে এই সংখ্যার কোনো শেষ নেই। অর্থাৎ ০.৩৩৩৩৩৩৩৩৩৩৩৩৩৩৩৩… তুমি সারা জীবন লিখলেও শেষ হবে না। এটাও মূলদ সংখ্যা, কারণ দশমিকের পর একটা নির্দিষ্ট প্যাটার্ন মেনে চলছে। যদি কোনো প্যাটার্ন না থাকত, যেমন যদি ০.৩৫১৭৯৬২১৭৪…এমন হতো, তাহলে এটি মূলদ সংখ্যা না হয়ে অমূলদ সংখ্যা হতো। যেমন পাই একটি অমূলদ সংখ্যা।

আরও পড়ুন

মাইনাসের আগমন

মানুষ যখন চাষবাস শুরু করল, তখন শুরু হলো আরেক ঝামেলা। ধীরে ধীরে মানুষ ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু করল। বাণিজ্যের ফলে মানুষ আলাদা কাজে দক্ষ হওয়ার সুযোগ পেল। ধরো, একজন শুধু মাছ শিকার করে, আরেকজন সবজি ফলায়, অন্যজন শুধু জুতা বানায়। এরপর তারা নিজেদের মধ্যে এসব জিনিস অদলবদল করে, যাতে সবার কাছেই মাছ, সবজি ও জুতা থাকে।

কিন্তু ব্যবসা করতে গেলে তো কখনো লাভ হয়, আবার কখনো লোকসান হয়। ধরো, তুমি তোমার ছোট বোনের কাছ থেকে ৫টি চকলেট ধার নিয়েছ। সে হয়তো হিসাবের খুঁটিনাটি খুব ভালো বোঝে, তাই তার পাওনা সে ঠিকই কড়ায়-গন্ডায় একটা খাতায় লিখে রাখে! এখন ধরো তোমার কাছে চকলেট আছে শূন্যটারও কম। এই যে ধারের হিসাব, এটা কীভাবে রাখা হবে? এখান থেকেই এল ঋণাত্মক সংখ্যা। যেমন -১, -২, -৩… ইত্যাদি। দেখো, প্রতিটি সংখ্যার আগে একটা মাইনাস চিহ্ন (-) আছে। এ জন্য এই সংখ্যাকে আমরা বলব মাইনাস সংখ্যা।

সমীকরণ সমাধানের ক্ষেত্রে এই নতুন পদ্ধতিটি এক বিশাল সুবিধা নিয়ে এল। ফলে শুধু যোগ ও বিয়োগ আছে, এমন যেকোনো সমীকরণ সমাধান করা সম্ভব হলো। আগে যদি কাউকে বলা হতো ক + ৪ = ৩ সমীকরণটি সমাধান করো, তবে সে হয়তো বলত, ‘এসব আজেবাজে কথার মানে কী? ৪-এর সাথে কিছু যোগ করলে তা তো ৪-এর চেয়ে বড় হবে, ৩ হয় কীভাবে? এর কোনো মানেই হয় না!’

কারণ, ক = ৩ - ৪ = -১ হয়। যেহেতু মাইনাস সংখ্যার সঙ্গে তারা পরিচিত ছিল না, তাই বলত এর কোনো মানে নেই। কিন্তু ব্যবসার হিসেবে এটা একদম পানির মতো সোজা! তুমি যদি ৪ টাকা আয় করার পরও দেখো দিন শেষে তোমার পকেটে ৩ টাকা আছে, তার মানে তুমি সকালে ১ টাকা ঋণ ছিলে। অর্থাৎ, ক = -১।

এতক্ষণে আমরা ঋণাত্মক সংখ্যা পেয়ে গেলাম। এখন আমাদের জানতে হবে, কীভাবে সাধারণ নিয়মে যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগ করতে হয়। যোগ করা খুব সহজ। ৫ + ৩ = ৮। মজার ব্যাপার হলো, দুটি মাইনাস সংখ্যা গুণ করলে গুণফল আর মাইনাস সংখ্যা থাকে না, ধনাত্মক সংখ্যা হয়ে যায়। কেন মাইনাসে মাইনাসে প্লাস হয়, সে ব্যাপারেও একটু পরে আলোচনা করব।

ধরো, দুটি মাইনাস সংখ্যা হলো -৫ ও -৩। এখন যদি তুমি এই দুটি সংখ্যা গুণ করো, তাহলে হবে (-৫) x (-৩) = ১৫। আবার বিয়োগের ক্ষেত্রে হবে (-৩) - (-৫) = ২। কারণ -৩ + ৫ = ২। এখানে কী করলাম? মাইনাসে মাইনাসে প্লাস হয়ে গেছে ৫, সেখান থেকে ৩ বিয়োগ করলে থাকল ২।

আরেকটা উদাহরণ দেওয়া যাক। ধরো, তুমি তোমার বন্ধুকে প্রতিদিন ২টি করে আপেল দাও। আজ থেকে ৩ দিন পরে তুমি মোট ৬টি আপেল দিয়ে ফেলবে। অর্থাৎ, ২ x ৩ = ৬।

এবার উল্টোভাবে ভাবো। আজ তোমার কাছে ১০টি আপেল আছে। জানো, তুমি প্রতিদিন ২টি করে আপেল বন্ধুকে দাও। তাহলে ৩ দিন আগে তোমার কাছে কতটি আপেল ছিল? অবশ্যই ১৬টি। কারণ, এই তিন দিনে তুমি ৬টি আপেল দিয়েছ।

এবার আরেকটি ঘটনা ভাবো। ধরো, প্রতিদিন কেউ তোমাকে ২টি করে আপেল দিয়ে যায়। ৩ দিন পরে তোমার কাছে ৬টি আপেল বেশি হবে। অর্থাৎ, (-২) x (-৩) = ৬।

আরও পড়ুন

অমূলদ সংখ্যার ফাঁকফোকর

মূলদ সংখ্যা পৃথিবীর অনেক বিষয়ই সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে। গাণিতিকভাবেও এটি দারুণ কাজ করে, কারণ আমরা এই সিস্টেমে যোগ, বিয়োগ, গুণ ও ভাগ করতে পারি। তা ছাড়া এই সংখ্যা কখনো ফুরিয়ে যায় না। এতটা পড়ে মনে হতে পারে, ব্যস, আমাদের আর কোনো সংখ্যার দরকার নেই। কিন্তু গণিতের গল্প এখানে শেষ হওয়ার নয়। জ্যামিতির একেবারে সাধারণ হিসাব করতে গিয়েই দেখা গেল এই সংখ্যাগুলো যথেষ্ট নয়!

ধরো, তুমি ১ সেন্টিমিটার দৈর্ঘ্য এবং ১ সেন্টিমিটার প্রস্থের একটা বর্গাকার ছক আঁকলে। এর এক কোনা থেকে আরেক কোনার দৈর্ঘ্য কত হবে? জ্যামিতির ভাষায়, বর্গের কোনাকুনি দূরত্বকে কর্ণ বলে। নিচের ছবিটি দেখো।

এখানে খঘ হলো কর্ণ। ধরে নিই, এই কর্ণের নাম ‘ল’। এখন পিথাগোরাসের সূত্র অনুযায়ী কর্ণ হবে ল = ১ + ১, বা ল= ২। অর্থাৎ, ল = √২ (রুট ২)। এই ফলাফল আমরা কীভাবে পেলাম? পিথাগোরাসের সূত্র মনে আছে? সংক্ষেপে, অতিভূজের বর্গ = বাকি দুই বাহুর বর্গের যোগফল। ওপরের চিত্র থেকে ‘কখঘ’ ত্রিভুজ দেখো। ত্রিভুজটা হবে নিচের ছবির মতো।

এখানে ‘খঘ’ হলো অতিভুজ, যেটা বর্গের ক্ষেত্রে আমাদের কর্ণ ছিল; নাম দিয়েছিলাম ‘ল’। এখানেও বোঝার সুবিধার্তে ‘খঘ’ বাহুকে আমরা ‘ল’ বলব। তাহলের এই অতিভুজের বর্গ সমান হবে বাকি দুই বাহু, মানে ‘কখ’ ও ‘কঘ’ বাহুর বর্গের যোগফল। আমরা আগেই ধরেছিলাম, বর্গের দৈর্ঘ্য বা প্রস্থ ১ সেন্টিমিটার। তাহলে ল২ = ১২ + ১২ = ১ + ১ = ২। তাহলে হলো ল = √২? জানো নিশ্চয়ই, বাঁ পাশ থেকে বর্গ বাদ দিলে ডান পাশে রুট হয়ে যায়। এখানে আমরা ‘ল’-এর ওপর থেকে বর্গ বাদ দিয়েছি, তাই ডান পাশে ২-এর ওপর রুট বসে গেছে।

পিথাগোরাসের সূত্র ছাড়াও আরেকভাবে এই মান বের করা যায়। সেটা হলো বর্গের কর্ণের দৈর্ঘ্য বের করার সূত্র ব্যবহার করে। সূত্রটা হলো: কর্ণ = বাহুর দৈর্ঘ্য × √২। বাহুর দৈর্ঘ্য ছিল ১ সেন্টিমিটার, এর সঙ্গে √২ গুণ করলেও ওই √২ হয়।

কিন্তু এই √২ সংখ্যাটা আসলে কত? এর একটি কাছাকাছি উত্তর হতে পারে ৭/৫। কিন্তু হতাশাজনক সত্যিটা হলো, এমন কোনো ভগ্নাংশ নেই, যা এই শর্তটি নিখুঁতভাবে পূরণ করতে পারে। আধুনিক গণিতের ভাষায়, √২-কে বলা হয় অমূলদ সংখ্যা। মানে, একে কখনোই একটি সুনির্দিষ্ট ভগ্নাংশ আকারে প্রকাশ করা যায় না। পাই (π) হলো এদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত সেলিব্রিটি! এ ব্যাপারেও আমরা পরে আরও বিস্তারিত আলোচনা করব।

এই অমূলদ সংখ্যার উপশিরোনাম দেওয়া অমূলদ সংখ্যার ফাঁকফোকর। এবার একটু সেদিকে নজর দিই। তুমি যদি একটি লম্বা লাইনে সব মূলদ সংখ্যাকে সাজাও, তবে দেখবে এদের মাঝখানে অনেক ফাঁকা জায়গা আছে। প্রথম দেখায় এটি বোঝা যায় না, কারণ মূলদ সংখ্যাগুলো একে অপরের খুব কাছাকাছি থাকে। তবু ২-এর জায়গায় একটি ফাঁকা জায়গা রয়েছে এবং আরেকটি ফাঁকা জায়গা আছে পাইয়ের জায়গায়। আশ্চর্যজনকভাবে, পুরো লাইনটিই আসলে এমন ফাঁকা জায়গায় ভরপুর। এখানেই বাস করে অমূলদ সংখ্যাগুলো।

উনিশ শতকে এসে এই ফাঁকা জায়গাগুলো পূরণ করার জন্য মূলদ সংখ্যার জগৎকে আরও বড় করার সঠিক উপায় খুঁজে পাওয়া গেল। এই নতুন আধুনিক ও শক্তিশালী সিস্টেমের নাম দেওয়া হলো বাস্তব সংখ্যা। গণিতবিদদের কাছে এটি ছিল একটি বিশাল পদক্ষেপ। এর ফলে অনেক জটিল সমীকরণের সমাধান বের করা সম্ভব হলো।

কিন্তু বাস্তব সংখ্যাটা আবার কী? তুমি যেকোনো একটা সংখ্যা কল্পনা করো। যা-ই কল্পনা করো না কেন, ওটাই বাস্তব সংখ্যা। একটি সংখ্যারেখাও কল্পনা করতে পারো। সংখ্যারেখার মধ্যে থাকে শূন্য, ডানে ধনাত্মক সংখ্যা এবং বাঁয়ে ঋণাত্মক সংখ্যা। এই সবই বাস্তব সংখ্যা। বাস্তব সংখ্যা আবার দুই ভাগে ভাগ করা যায়। মূলদ সংখ্যা ও অমূলদ সংখ্যা। এগুলো নিয়ে ইতিমধ্যে আমরা আলোচনা করে এসেছি।

আরও পড়ুন

কল্পনার ডানায় ভুতুড়ে সংখ্যা

বাস্তব সংখ্যা তো পেলাম, কিন্তু সব সমীকরণের কি সমাধান হলো? না, বাস্তব সংখ্যাতেও সব সমীকরণের সমাধান নেই। তুমি যদি কোনো ধনাত্মক সংখ্যাকে নিজের সঙ্গে গুণ করো, তবে উত্তর ধনাত্মকই আসবে। আবার ঋণাত্মক সংখ্যাকে নিজের সঙ্গে গুণ করলেও উত্তর ধনাত্মকই হয়। তার মানে, এমন কোনো বাস্তব সংখ্যা নেই, যাকে নিজের সঙ্গে গুণ করলে উত্তর ঋণাত্মক হবে। অর্থাৎ ক = -১ সমীকরণের কোনো বাস্তব সমাধান নেই।

বাস্তব সংখ্যা না থাকলে কাল্পনিক সংখ্যা থাকবে! ভেবো না মজা করে বলছি, আসলেই কাল্পনিক সংখ্যা আছে! ১৬ শতকের ইতালীয় পণ্ডিতেরা প্রথম কাল্পনিক সংখ্যা নিয়ে ভাবতে শুরু করেন। সে যুগে জটিল সমীকরণ সমাধানের একটি বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিযোগিতা হতো। গণিতবিদেরা প্রকাশ্যে এই সমীকরণ সমাধানের লড়াইয়ে নামতেন। এই লড়াইয়ে অঙ্ক করতে গিয়ে অনেক সময় √-১ (রুট মাইনাস ১) চলে আসত। কিন্তু এমন কোনো সংখ্যা কি দুনিয়ায় আছে, যাকে নিজের সঙ্গে গুণ করলে ফলাফল মাইনাস সংখ্যা হবে? বাস্তবে এমন কোনো সংখ্যা নেই। তাই রুট চিহ্নের মধ্যে -১ লেখা যায় না। কেন লেখা যায় না, সেটাও বিস্তারিত আলোচনার বিষয়।

যাহোক, ১৬ শতকের সেই গণিতবিদদের অনেকেই এটাকে অর্থহীন ভেবে অঙ্ক করা বাদ দিয়ে দিতেন। কিন্তু কিছু মানুষ এর মানে নিয়ে আরও ভাবলেন। তাঁরা দেখলেন, শেষে গিয়ে এই কাল্পনিক পদগুলো একে অপরকে বাতিল করে দেয়। ফলে সমীকরণের একটি বাস্তব সমাধান পাওয়া যায়! যেহেতু সমাধান পাওয়া যায়, সেহেতু এর একটা নাম দেওয়া দরকার! নাম দেওয়া হলো ইমাজিনারি নাম্বার বা কাল্পনিক সংখ্যা। একে প্রকাশ করা হলো i চিহ্ন দিয়ে। অর্থাৎ, i = √-১। বাস্তব সংখ্যায় এর কোনো জায়গা নেই, কিন্তু জটিল সংখ্যায় আছে!

এই জটিল সংখ্যাটা আবার কোথা থেকে এল? বাস্তব সংখ্যা এবং কাল্পনিক সংখ্যা মিলে তৈরি হলো জটিল সংখ্যার জগৎ। যেমন ধরো, একটি বাস্তব সংখ্যা ৪। এর সঙ্গে একটি কাল্পনিক সংখ্যা ৩i যোগ করলে হবে ৪ + ৩i। এগুলো যেকোনো সাধারণ সংখ্যার মতোই যোগ এবং গুণ করা যেতে পারে।

সবচেয়ে দারুণ খবর কি জানো? ১৯ শতকে এসে বিখ্যাত গণিতবিদ কার্ল ফ্রেডরিখ গাউস প্রমাণ করে দেখালেন, এই জটিল সংখ্যা দিয়ে দুনিয়ার যেকোনো বহুপদী সমীকরণ সমাধান করা সম্ভব। অর্থাৎ, সমীকরণ মেলানোর জন্য আমাদের আর নতুন কোনো সংখ্যা বানানোর দরকার নেই!

হাজার হাজার বছর ধরে মানুষের যে সংখ্যার খোঁজে ছিল, অবশেষে তার একটা দুর্দান্ত সমাপ্তি ঘটল!

আরও পড়ুন