৮ বছর ধরে যুদ্ধে জড়িয়ে আছে শিম্পাঞ্জিরা, বিজ্ঞানীরা বলছেন গৃহযুদ্ধ

শিম্পাঞ্জিদের গৃহযুদ্ধসায়েন্স জার্নাল

উগান্ডার কিবালে ফরেস্ট ন্যাশনাল পার্কে ৩৬ বছর বয়সী এক পুরুষ শিম্পাঞ্জি ছিল, যার নাম বেসি। ২০১৯ সালের এক ভোরে সাধারণ দিনের মতোই গাছের ডালে ঘুম থেকে জেগে ওঠে। কিন্তু দিনের শেষ দিকে অন্য দলের ১৩টি শিম্পাঞ্জি ওর ওপর হামলা করে। প্রথমে তিনটি ও পরে আরও ১০টি শিম্পাঞ্জি তাকে ঘিরে ধরে কামড়াতে শুরু করে। এ হামলার ফলে বেসি মারা যায়।

অস্টিনের টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী অ্যারন স্যান্ডেল তখন শিম্পাঞ্জিগুলোকে পর্যবেক্ষণ করছিলেন। তা থেকে তিনি ফোনে ঘটনার বিবরণ লিখে রাখছিলেন। পরে তিনি জানান, সেই সময় তাকে অনেকটা যুদ্ধক্ষেত্রের প্রতিবেদকের মতো কাজ করতে হয়েছে। তিনি ঘটনাটি সরাসরি দেখে বোঝার চেষ্টা করছিলেন যে ঠিক কী ঘটছে। সায়েন্স জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় এ ঘটনার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে।

বিজ্ঞানীরা একে শিম্পাঞ্জিদের গৃহযুদ্ধ হিসেবে অভিহিত করেছেন। শিম্পাঞ্জিদের এই দল একসময় শান্তিতে থাকলেও আট বছর ধরে এদের মধ্যে সংঘাত চলছে। অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী জ্যাকব নেগ্রে জানান, এই লড়াই এখনো শেষ হয়নি। কীভাবে আগের বন্ধুরা একে অপরের মারাত্মক শত্রুতে পরিণত হয়, বিজ্ঞানীরা এখন সেটিই খোঁজার চেষ্টা করছেন।

আরও পড়ুন

শিম্পাঞ্জিরা কেন সংঘাতে জড়ায়

উগান্ডার বৃষ্টিপ্রবণ অরণ্যে বেসিদের দলে প্রায় ২০০টি শিম্পাঞ্জি ছিল। এরা বিশ্বের বৃহত্তম পরিচিত শিম্পাঞ্জি গোষ্ঠীগুলোর একটি। ২০ বছর ধরে মিলেমিশে থাকলেও হঠাৎ দলটি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। গবেষকেরা এদের পশ্চিমা ও কেন্দ্রীয়—এই দুই নাম দেন। পশ্চিমা দলটি ছোট হলেও এরা বেশি আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। প্রথমে এরা একে অপরকে এড়িয়ে চলত। কিন্তু পরে পশ্চিমা দলটি আক্রমণ শুরু করে। এখন পর্যন্ত এরা অন্তত ২৪টি শিম্পাঞ্জিকে হত্যা করেছে এবং আরও ১৪টি শিম্পাঞ্জি নিখোঁজ রয়েছে।

শিম্পাঞ্জিদের মধ্যে এমন গৃহযুদ্ধের ঘটনা ইতিহাসে এটি দ্বিতীয়। এর আগে ১৯৭০ সালে তানজানিয়ায় বিজ্ঞানী জেন গুডাল প্রথমবার শিম্পাঞ্জিদের মধ্যে এমন চার বছরের লড়াই দেখেছিলেন। তিনি একে শিম্পাঞ্জি স্বভাবের এক অন্ধকার দিক হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। উগান্ডার এই নতুন গবেষণা থেকে বিজ্ঞানীরা এখন বোঝার চেষ্টা করছেন, কেন এমন সংঘাত শুরু হয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু গুরুত্বপূর্ণ শিম্পাঞ্জির মৃত্যু, দলের নেতৃত্বে পরিবর্তন ও রোগের প্রাদুর্ভাবের কারণে এদের সামাজিক শৃঙ্খলা নষ্ট হয়ে যায়। এই বিশৃঙ্খলার ফলেই একসময়ের বন্ধুরা আলাদা হয়ে যায়। বিজ্ঞানী জ্যাকব নেগ্রে বলেন, যখন শিম্পাঞ্জিরা একে অপরের সঙ্গে মেলামেশা বন্ধ করে দেয়, তখন এরা আর নিজেদের একই দলের মনে করে না। এর ফলেই শুরু হয় ভয়াবহ শত্রুতা।

আরও পড়ুন
সাধারণত শিম্পাঞ্জিরা বাইরের অচেনা শিম্পাঞ্জিদের আক্রমণ করে
সায়েন্স জার্নাল

শিম্পাঞ্জিগোষ্ঠী যেভাবে ভেঙে পড়ে

বেসিকে যারা হত্যা করেছিল, এরা ছিল ওর ছোটবেলার বন্ধু। সাধারণত শিম্পাঞ্জিরা বাইরের অচেনা শিম্পাঞ্জিদের আক্রমণ করে। কিন্তু উগান্ডার বনের একসময়ের বন্ধুরাই নিজেদের মধ্যে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। গবেষকেরা গত ২০ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, কেন এমন বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক শত্রুতায় বদলে যায়।

বিজ্ঞানীদের মতে, এই বিভাজনের পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ রয়েছে। ২০১৪ সালে ওই দলের পাঁচটি প্রভাবশালী পুরুষ ও একটি স্ত্রী শিম্পাঞ্জি রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। এরা দলের বিভিন্ন উপদলের মধ্যে সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করত। এদের হঠাৎ মৃত্যুতে দলের ভেতরের সামাজিক বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ে। গবেষক জোসেফ ফেল্ডব্লামের মতে, বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখা এই শিম্পাঞ্জিরা না থাকলে দলের ভেতরে দূরত্ব আরও বেড়ে যায়।

একই সময়ে, ২০১৫ সালে দলের নেতৃত্বে বড় পরিবর্তন আসে। জ্যাকসন নামের একটি নতুন শিম্পাঞ্জি আগের নেতাকে সরিয়ে ক্ষমতা দখল করে। শিম্পাঞ্জিদের মধ্যে নেতৃত্বের এমন পরিবর্তন হিংস্রতা বাড়িয়ে দেয়। এরপর ২০১৭ সালে আরেকটি রোগে আরও ২৫টি শিম্পাঞ্জি মারা গেলে দলের বিভাজন চূড়ান্ত রূপ নেয়। পরের বছর থেকেই শুরু হয় ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড।

গবেষক এলিজাবেথ লনসডর্ফের মতে, নেতার পরিবর্তন, গুরুত্বপূর্ণ সদস্যদের মৃত্যু ও অসুস্থতা এ তিনটি বিষয় একসঙ্গে ঘটায় শিম্পাঞ্জিদের দীর্ঘদিনের ঐক্য ভেঙে যায়। যখন এরা নিয়মিত মেলামেশা বন্ধ করে দেয়, তখন একসময়ের পরিচিত সঙ্গীরাও একে অপরের শত্রু হয়ে ওঠে।

আরও পড়ুন

শিম্পাঞ্জিদের বন্ধুত্ব ও দয়া

শিম্পাঞ্জিদের জীবন সব সময় হিংস্রতায় ভরা থাকে না। দিনের বেশির ভাগ সময় এরা অলসভাবে বসে থাকে, একে অপরের শরীর থেকে পোকা বেছে দেয় এবং ডুমুর বা কলা খায়। কখনো কখনো অনেকগুলো শিম্পাঞ্জি একে অপরের গায়ে হাত–পা রেখে একসঙ্গে শুয়ে থাকে। এই সাধারণ কাজগুলোর মাধ্যমেই এদের মধ্যে শক্তিশালী সামাজিক বন্ধন ও বন্ধুত্ব তৈরি হয়।

যুদ্ধের মতো কঠিন সময়েও শিম্পাঞ্জিদের মধ্যে একে অপরের প্রতি যত্ন ও দয়া দেখা যায়। শিম্পাঞ্জি বেসি যখন আক্রান্ত হলো, তখন ৫৩ বছর বয়সী বিএফ নামের ওর এক পুরোনো বন্ধু এগিয়ে আসে। এদের মধ্যে ১০ বছরের বেশি সময়ের বন্ধুত্ব ছিল। বিএফ আহত বেসিকে সাহায্য করে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যায় এবং সারা রাত ওর পাশে বসে থাকে।

পরদিন স্যান্ডেল যখন ফিরে আসেন, তখন দেখেন বিএফ তখনো প্রায় মৃত বেসির পাশে বসে আছে। সে হাত বাড়িয়ে বেসিকে ওর সঙ্গে আসার জন্য ইশারা করছিল। বিজ্ঞানী নেগ্রে বলেন, শিম্পাঞ্জিরা যেমন একে অপরকে আক্রমণ করতে পারে, তেমনি এরা একে অপরের প্রতি অবিশ্বাস্য দয়াও দেখাতে পারে। এদের চরিত্রের এই দুটি দিকই গবেষণায় দেখা গেছে। তবে এটি একটি অত্যন্ত বিরল ঘটনা। বিজ্ঞানীদের অনুমান, শিম্পাঞ্জি সম্প্রদায়গুলো গড়ে প্রতি ৫০০ বছরে একবার এভাবে বিভক্ত হয়।

সূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক, সায়েন্টিফিক আমেরিকান, দ্য গার্ডিয়ান

আরও পড়ুন