বাংলাদেশের বুনো আম বালাম কোথায় পাওয়া যায়
লিচু বা সর্বোচ্চ ডিমের সমান একটা ফল। রংটা সবুজাভ, খোসা পাতলা, ভেতরে আমের মতোই একটা ছোট আঁটি। তবু একে আম বলে কেউ চেনেই না সহজে। এর নাম মাইলাম, কোথাও মালিআম, কোথাও উড়িআম, আর পার্বত্য চট্টগ্রামের অনেক জায়গায় এটা পরিচিত বালাম নামে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের জঙ্গলে এই গাছ আজও টিকে আছে, খুব বেশি মানুষের নজরে না পড়েই। বৈজ্ঞানিক নাম Mangifera sylvatica। আর তোমার বাড়ির পাশের আমগাছ, যার ফল হিমসাগর বা ল্যাংড়া নামে বাজারে বিক্রি হয়, তার বৈজ্ঞানিক নাম Mangifera indica। দুটো একই পরিবারের, এমনকি বলা যায় একই শিকড়ের। আমের প্রকৃত জন্মভূমি খুঁজতে গিয়ে গবেষকেরা পৌঁছে যান চট্টগ্রামের পার্বত্য এলাকা, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, আর মিয়ানমারের পাহাড়ি বনভূমিতে। মানে তুমি যে আমটা প্রতিদিন খাও, তার পূর্বপুরুষ এই দেশেরই মাটিতে জন্মেছিল, হাজার বছর আগে।
স্বাদটা ভয়ংকর টক। কাঁচা আমে কামড় দিলে যতটা টক লাগে, এর চেয়েও কয়েক ডিগ্রি বেশি টক। প্রথমবার মুখে দিলে চোখে পানি চলে আসার মতো অবস্থা হয়, এমনটাই বলেন যাঁরা খেয়ে দেখেছেন। তা সত্ত্বেও পাহাড়ি মানুষের কাছে এটা পরিচিত খাবার। কাঁচা অবস্থায় যেমন খাওয়া হয়, পাকলেও তেমন। ঢাকায় এই গাছ খুঁজে পাওয়া কঠিন, রমনা পার্কের আশপাশে কিছু গাছ এখনো আছে বলে জানা যায়, এর বাইরে মূলত পার্বত্য চট্টগ্রামের গ্রামীণ এলাকাতেই এর দেখা মেলে।
গাছটা দেখতেও পুরোপুরি আমগাছের মতো নয়। পাতা একটু সরু, ডালপালা ছড়ানো, আর ফুল আসে থোকায় থোকায়। ঠিক বুনো গাছের মতো। এখন পর্যন্ত এই গাছ মূলত বনেই জন্মায়, কেউ লাগায় না, কেউ পরিচর্যা করে না। তবে কৃষিবিজ্ঞানীদের একটা অংশ বলছেন, এই বুনো গাছটাকে আস্তে আস্তে চাষের আওতায় আনার চেষ্টা শুরু হয়েছে। কারণটা সহজ, এত পুরোনো একটা প্রজাতি হারিয়ে যাওয়ার আগেই তাকে বাঁচিয়ে রাখা দরকার। আম চাষের ইতিহাসে এ ধরনের আদি বা বুনো জাত খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, নতুন কোনো রোগ এসে যদি চাষের আমগুলো আক্রমণ করে, তখন এই বুনো জাতের জিনই হয়তো কাজে লাগতে পারে নতুন প্রতিরোধী জাত তৈরিতে। অর্থাৎ মাইলাম শুধু একটা পুরোনো ফল নয়, ভবিষ্যতের আম চাষের জন্য একটা জিনগত ভান্ডারও বলা যায় তাকে।
পাগলা কুকুরে কামড়ালে যে রোগ হতে পারে, তার নাম জলাতঙ্ক, চিকিৎসা না পেলে যার পরিণতি মৃত্যু। আজ এর একমাত্র নিরাপদ চিকিৎসা টিকা, হাসপাতাল। তবু পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রবীণদের মুখে একটা পুরোনো চল শোনা যায়, কুকুরে কামড়ানোর পর মাইলাম দিয়ে বানানো একধরনের স্থানীয় ওষুধ খাওয়ানো হতো।
এই বিশ্বাসটা টিকে রইল বছরের পর বছর। কারণ, একটা সহজ মনস্তত্ত্ব এর পেছনে কাজ করে। আগে হাসপাতাল হাতের নাগালে ছিল না বলে মানুষ হাতের কাছে যা পেয়েছে, তা দিয়েই বিপদ সামলানোর চেষ্টা করেছে। কেউ বেঁচে গেলে সেই বাঁচার কৃতিত্ব দেওয়া হয়েছে ফলটাকে, যদিও আসল কারণ হতে পারত কামড়টা গভীর না হওয়া বা ভাইরাস না ছড়ানোই। একটা কাকতালীয় ঘটনা, তার একটা সরল ব্যাখ্যা, আর তারপর মুখে মুখে সেই ব্যাখ্যাই সত্যি হয়ে যাওয়া, লোকবিশ্বাস গড়ে ওঠে অনেকটা এভাবেই।
মাইলাম নিয়ে এই বিশ্বাস কতটা সত্যি ছিল, তা নিশ্চিতভাবে বলার মতো গবেষণা আজও নেই হাতে। যা নিশ্চিত, জলাতঙ্কের ঝুঁকি থাকলে দেরি না করে হাসপাতালে যাওয়াই একমাত্র নিরাপদ পথ।
হাজার বছরের কলম আর নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এই ছোট্ট টক ফলটাই একদিন রূপ বদলে আজকের মিষ্টি ক্ষীরশাপাতি, ল্যাংড়া বা গোপালভোগ হয়ে উঠেছে, এমনটাই মনে করেন আমবিশারদেরা। এই বদলের পেছনে কাজ করেছে কলম পদ্ধতি, যেখানে একটা ভালো জাতের গাছের ডাল কেটে অন্য গাছে জুড়ে দেওয়া হয়, ফলে নতুন গাছেও আগের গাছের গুণ চলে আসে। শত শত বছরের এই কলম আর বাছাইয়ের ধারাবাহিকতায় আজ বাংলাদেশেই তিন শতাধিক জাতের আম পাওয়া যায়, অথচ এর সবকিছুর শুরুটা ছিল এই একটাই ছোট্ট জঙ্গলি ফল থেকে। আর সেই মূল গাছ, যেখান থেকে সবকিছুর শুরু, তা এখনো দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়ের গভীরে। প্রায় অদেখা, প্রায় ভুলে যাওয়া এক নাম নিয়ে টিকে আছে এই গাছ।