পাখি কীভাবে জানে, কখন ও কোথায় পরিযায়ী হতে হবে
শীত শুরু হতেই দেশের বড় বড় বিল, হাওর কিংবা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জলাভূমিগুলোয় নাম না জানা হাজারো অচেনা পাখির কিচিরমিচির শোনা যায়। এরা পরিযায়ী পাখি। সুদূর সাইবেরিয়া বা হিমালয়ের কনকনে হাড়কাঁপানো ঠান্ডা থেকে বাঁচতে হাজার হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে এরা আমাদের দেশে আসে। শীতের কয়েক মাস এ দেশে কাটিয়ে আবহাওয়া একটু গরম হতে শুরু করলেই এরা আবারও ফিরে যায় নিজের দেশে। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছ, কোনো ম্যাপ, জিপিএস কিংবা কম্পাস ছাড়াই পরিযায়ী পাখিরা কীভাবে দিক নির্ণয় করে হাজার হাজার মাইল পথ পারি দেয়?
প্রতিবছর কেবল আমাদের দেশেই নয়, বরং বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি পাখি টিকে থাকার জন্য উত্তর আমেরিকা থেকে শুরু করে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পাড়ি জমায়। হাজার হাজার মাইলের এই অবিশ্বাস্য যাত্রা এরা করে কেবল বৈরী আবহাওয়া থেকে বাঁচতে আর খাবারের খোঁজে। তবে সব পাখির মধ্যে উত্তর মেরুর ‘আর্কটিক টার্ন’পাখির গল্পটা সবচেয়ে বিস্ময়কর। ছোট্ট এই পাখিটি সারা জীবনে মোট যে পরিমাণ পথ ওড়ে, তা দিয়ে অনায়াসেই পৃথিবী থেকে চাঁদে গিয়ে আবার ফিরে আসা সম্ভব।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, পাখিদের কাছে আছে এক রহস্যময় ‘ইন্দ্রিয় ভান্ডার’। আমরা যেমন চোখ, কান বা নাক দিয়ে সবকিছু বুঝি। পাখিদের ক্ষমতা এর চেয়েও অনেক বেশি। কেবল চোখের দেখা বা ঘ্রাণশক্তি দিয়ে এরা হাজার মাইলের পথ চেনে না। এদের আছে এক অদৃশ্য কম্পাস। এই কম্পাসের সাহায্যে এরা পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র অনুভব করতে পারে, যা এদের সঠিক দিক চিনিয়ে দেয়। এমনকি গভীর রাতে আকাশের তারার অবস্থান দেখেও এরা একদম নিখুঁতভাবে গন্তব্য খুঁজে নেয়। পাখিদের এই নিখুঁত পথ চেনার রহস্য বিজ্ঞানীদের কাছে আজও এক বিস্ময়কর গবেষণার বিষয়।
পাখিরা এদের দীর্ঘ যাত্রায় পথ চিনতে মূলত চোখ আর নাকের ওপর নির্ভর করে। আগে যে পথে এরা একবার উড়েছে, সেই পথের নদী বা পাহাড়ের স্মৃতি এদের মাথায় অনেকটা ‘রোড সাইনের’ মতো গেঁথে থাকে। তবে যখন সামনে কোনো চেনা পথ থাকে না, যেমন বিশাল সমুদ্রের ওপর দিয়ে ওড়ার সময় তখন এরা ঘ্রাণশক্তির সাহায্য নেয়। বিজ্ঞানীদের একটি পরীক্ষায় দেখা গেছে, ‘স্কোপোলির শিয়ারওয়াটার’ নামক সামুদ্রিক পাখির নাকের পথ বন্ধ করে দিলে এরা সমুদ্রে দিক হারিয়ে ফেলে। যদিও স্থলভাগের ওপর দিয়ে এরা ঠিকই উড়তে পারে। এর থেকে বোঝা যায়, সমুদ্রের অচেনা পথে ঘ্রাণই এদের একমাত্র ভরসা।
দিনের বেলা চলাচল করা পাখিরা সূর্যের অবস্থান দেখে দিক ঠিক করে। একে বলা হয় সূর্য কম্পাস। এটা শুধু চোখে দেখে হয় এমন নয়। এদের শরীরের ভেতর থাকা একটি জৈবিক ঘড়ির সঙ্গে সূর্যের অবস্থানের এক চমৎকার সমন্বয়ে তৈরি হয় এই ‘জীবন্ত সূর্যঘড়ি’। সূর্যের অবস্থান আর সময়ের এই হিসাব মিলিয়ে এরা ঠিক বুঝে নেয় কোন দিকে যেতে হবে। অনেকটা আমাদের প্রাচীন সূর্যঘড়ির মতো করেই এদের মস্তিষ্ক কাজ করে। গবেষণায় দেখা গেছে, কৃত্রিম আলো দিয়ে পাখিদের এই অভ্যন্তরীণ ঘড়ি ওলটপালট করে দিলে এরা আর সঠিক পথে চলতে পারে না।
তবে বেশির ভাগ পাখিই কিন্তু দিনের চেয়ে রাতে উড়তে বেশি পছন্দ করে। যখন সূর্য থাকে না, তখন এরা কী করে? বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, রাতের পাখিরা আকাশের তারার অবস্থান দেখে পথ চেনে। বিশেষ করে ধ্রুবতারাকে কেন্দ্র করে তারকারাজি যেভাবে ঘোরে, তা দেখে এরা নিখুঁতভাবে দিক নির্ণয় করে। হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ যেভাবে সমুদ্রপথে নক্ষত্র দেখে জাহাজ চালাত, পাখিরা ঠিক সেই একই মহাজাগতিক কম্পাস ব্যবহার করে আসছে লাখ লাখ বছর আগে থেকে।
আকাশ যখন মেঘে ঢাকা থাকে ও সূর্য বা তারা দেখা যায় না, তখনো পাখিরা পথ হারায় না। এর মূল কারণ এদের বিশেষ ক্ষমতা ‘ম্যাগনেটোরেসেপশন’। যার মাধ্যমে এরা পৃথিবীর অদৃশ্য চৌম্বকক্ষেত্র অনুভব করতে পারে। বিজ্ঞানীদের মতে, পাখিদের চোখের রেটিনায় থাকা ‘ক্রিপ্টোক্রোম’ নামক অণু এদের এই চৌম্বকশক্তিকে একধরনের রঙের আভা হিসেবে ‘দেখতে’ সাহায্য করে। এ ছাড়া এদের ঠোঁটে থাকা আয়রন সেন্সর ও মেঘলা আকাশেও সূর্যের অবস্থান বোঝার বিশেষ ক্ষমতা একদম নির্ভুল গন্তব্যে পৌঁছে দেয়। প্রকৃতির এই অদ্ভুত ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কারণেই কোনো যন্ত্র ছাড়াই এরা পৃথিবীর সেরা অভিযাত্রী হয়ে উঠেছে।
অনেকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে পাখিরা ঠিক কোন দেশে বা কোন গন্তব্যে যাবে, তা নির্ধারণ কীভাবে করে। অধিকাংশ পরিযায়ী পাখির মস্তিষ্কে একটি ‘জেনেটিক ম্যাপ’ বা বংশগত মানচিত্র আগে থেকেই প্রোগ্রাম করা থাকে। অর্থাৎ কোন ঋতুতে কোন দিকে উড়াল দিতে হবে, তা এরা জন্মগতভাবেই পায়। দীর্ঘ যাত্রার সময় এরা পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রকে কম্পাস হিসেবে ব্যবহার করে দিক ঠিক রাখে ও সূর্যের অবস্থান বা নক্ষত্র দেখে নিশ্চিত করে এরা সঠিক অক্ষাংশে আছে কি না। এ ছাড়া একবার কোনো দেশ বা স্থানে পৌঁছানোর পর এদের অসাধারণ স্মৃতিশক্তি কাজ শুরু করে। এরা নদী, উপকূল রেখা কিংবা পাহাড়ের মতো দৃশ্যমান চিহ্নগুলো মনে রাখে। অনেকটা আমাদের জিপিএস সিস্টেমের মতো করেই এরা চৌম্বকশক্তির সংকেত আর স্মৃতির মানচিত্র মিলিয়ে একদম নিখুঁতভাবে হাজার মাইল দূরের নির্দিষ্ট দেশটিতে পৌঁছে যায়।
সূত্র: লাইস সায়েন্স, ডিসকভার ওয়াইল্ডলাইফ