অ্যান্টার্কটিকা থেকে সব বরফ সরিয়ে ফেললে কেমন দেখাবে পৃথিবী
অ্যান্টার্কটিকা মানেই ধবধবে সাদা এক বিশাল প্রান্তর। মাইলের পর মাইল শুধু বরফ আর বরফ। পেঙ্গুইনদের রাজত্ব, সঙ্গে হাড়কাঁপানো শীত। চারদিকে বাড়িঘরের কোনো বালাই নেই। পৃথিবীর এই মহাদেশের প্রায় ৯৮ শতাংশই ঢাকা পড়ে আছে পুরু বরফের চাদরে। কিন্তু কখনো যদি কোনো জাদুমন্ত্রে এই বিশাল বরফের স্তূপ নিমেষেই গায়েব হয়ে যায়, তাহলে এর নিচের পৃথিবীটা দেখতে কেমন হবে? সেটি কি সমতল ভূমি হবে, নাকি সেখানেও আছে পাহাড়-পর্বত?
এই প্রশ্নের উত্তর বের করতে চান স্বয়ং বিজ্ঞানীরা। তাই তাঁরাও বসে নেই। প্রযুক্তির কল্যাণে তাঁরা বরফের চাদর সরিয়ে উঁকি দিয়েছেন অ্যান্টার্কটিকার গভীরে। আর সেখানে যা দেখেছেন, তা এককথায় বিস্ময়কর!
২০১৩ সালে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা ও ব্রিটিশ অ্যান্টার্কটিক সার্ভে মিলে তৈরি করে বেডম্যাপ-২। এটি মূলত বরফহীন অ্যান্টার্কটিকার একটি মানচিত্র। স্যাটেলাইট, বিমান ও মাটিতে বসে করা বিভিন্ন জরিপের বিশাল ডেটা জোড়া দিয়ে এই ম্যাপ তৈরি করা হয়েছে।
ম্যাপটি দেখায় অ্যান্টার্কটিকার মসৃণ বরফের নিচে লুকিয়ে আছে এক রুক্ষ ও কঠিন পৃথিবী। সেখানে আছে উঁচু পর্বতমালা, গভীর উপত্যকা, গিরিখাত ও এবড়োখেবড়ো ভূমি। ওপর থেকে দেখলে মনে হয়, সাদা চাদর বিছানো বিছানা। আর বিছানার নিচেই হয়তো আছে হিমালয়ের মতো কোনো পাহাড় কিংবা গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের মতো গভীর খাদ।
সবচেয়ে অবাক করা তথ্য হলো, ভিক্টোরিয়া ল্যান্ডের হিমবাহের নিচে এমন এক জায়গা খুঁজে পাওয়া গেছে, যা সমুদ্রপৃষ্ঠের চেয়ে প্রায় ২ হাজার ৮৭০ মিটার নিচে! এটি পৃথিবীর যেকোনো মহাদেশীয় প্লেটের মধ্যে সবচেয়ে নিচু জায়গা। সাগরের তলায় নয়, বরং মহাদেশের বুকেই এত গভীর খাদ লুকিয়ে আছে বরফের নিচে!
ভেতরের খবর কীভাবে জানা গেল
বিজ্ঞানীরা তো আর কোদাল দিয়ে বরফ খুঁড়ে নিচে যাননি। না, তা করেননি ঠিকই, কিন্তু তাঁরা একটা উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করেছেন। এর নাম ‘মাল্টিচ্যানেল কোহেরেন্ট রাডার ডেপথ সাউন্ডার’। এক বিশেষ ধরনের রাডার। এ রাডার বরফ ভেদ করে নিচে সংকেত পাঠায় এবং সেই সংকেত ফিরে আসার সময় ও ধরন দেখে বোঝা যায়, বরফের নিচে মাটি কোথায় উঁচু আর কোথায় নিচু। অনেকটা এক্স-রে করে শরীরের ভেতরের হাড়গোড় দেখার মতো ব্যাপার।
বরফের নিচের ভূমি সম্পর্কে জানা কেন জরুরি
নাসার গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারের বিজ্ঞানী সোফি নউইকি খুব সুন্দর একটা উপমা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, বরফ আসলে মধুর মতো। একটু কল্পনা করুন, আপনি একটা প্লেটে মধু ঢাললেন। প্লেটটা যদি একদম সমান হয়, তবে মধু একভাবে ছড়াবে। আর প্লেটটা যদি এবড়োখেবড়ো হয় বা আপনি প্লেটটা কাত করে ধরেন, তবে মধু অন্যভাবে গড়িয়ে পড়বে। অ্যান্টার্কটিকার বরফও ঠিক মধুর মতো নিজের ভারে ছড়িয়ে পড়ে। নিচের মাটি উঁচু-নিচু হওয়ার ওপর নির্ভর করে বরফ কত দ্রুত গলে সমুদ্রে মিশবে বা কীভাবে প্রবাহিত হবে। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বরফ গলা বুঝতে হলে আগে নিচের মাটির মানচিত্র বোঝা জরুরি।
সব বরফ গলে গেলে কী হবে
বেডম্যাপ-২-এর তথ্য বলছে, অ্যান্টার্কটিকায় প্রায় ২ কোটি ৭০ লাখ ঘনকিলোমিটার বরফ জমা আছে। এই বিশাল বরফভান্ডার যদি পুরোপুরি গলে যায়, তবে সারা পৃথিবীর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রায় ৫৮ মিটার বেড়ে যাবে! ৫৮ মিটার পানি বাড়লে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে বাংলাদেশ, মালদ্বীপ কিংবা ফ্লোরিডার মতো অনেক জায়গাই চিরতরে হারিয়ে যাবে।
অবশ্য বিজ্ঞানীরা বলছেন না যে কালই সব বরফ গলে যাবে। কিন্তু বর্তমানে যে হারে বরফ গলছে, তা উদ্বেগের বিষয়। জাতিসংঘের আইপিসিসির রিপোর্ট অনুযায়ী, অ্যান্টার্কটিকা ও গ্রিনল্যান্ডের বরফ গলার কারণে প্রতিবছর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ৪ মিলিমিটার করে বাড়ছে। এটি তাদের ভবিষ্যদ্বাণীর সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির সঙ্গে মিলে যাচ্ছে।
বরফের নিচের এই জগৎকে আরও নিখুঁতভাবে জানার জন্য বিজ্ঞানীরা এখন কাজ করছেন বেডম্যাপ-৩ নিয়ে। এটি হবে আরও আধুনিক ও বিস্তারিত। অ্যান্টার্কটিকা মানে শুধু পেঙ্গুইনের দেশ নয়, এটি পৃথিবীর হিমাগার। এই হিমাগারের নিচের ভূমি কেমন, তা জানাই এখন বিজ্ঞানীদের মূল লক্ষ্য। কারণ, এই বরফ গলার ওপরই নির্ভর করছে আমাদের এবং আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ। আমরা হয়তো অ্যান্টার্কটিকার রুক্ষ পাহাড়গুলো খালি চোখে দেখব না, কিন্তু সেই পাহাড়ের ওপর দিয়ে গড়িয়ে আসা বরফগলা পানি একদিন আমাদের বাড়ির উঠানে এসে হানা দিতে পারে। তাই সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
সূত্র: এইএফএল সায়েন্স