চার শ বছর চিঠি বিলিয়ে অবসরে ডেনিশ ডাক বিভাগ

ডেনিশ ডাক বিভাগের লাল চিঠির বক্সগুলো অবসরে যাচ্ছেদ্য গার্ডিয়ান

তোমরা অনেকেই কিশোর আলোকে চিঠি পাঠাও ডাক বিভাগের মাধ্যমে। পোস্ট অফিসে চিঠি পোস্ট করলে কিআ কার্যালয়ে চিঠি পৌঁছে যায়। কিশোর আলোতে চিঠিটা ছাপা হলো কি না, তার জন্য তোমরা অপেক্ষা করো। তোমরা সেই বিরল কিছু মানুষের মধ্যে আছ, যারা এখনো কাগজ–কলমে চিঠি লেখে। পৃথিবীতে এখন খুব কম মানুষই চিঠি লেখে। দেশে দেশে ডাক বিভাগের মূল লক্ষ্য ছিল চিঠি বিলি করা। সেই দিন বুঝি ফুরিয়ে এল। ডাক বিভাগ এখন চিঠি–চালাচালির বদলে অন্য কাজে মন দিচ্ছে। এই যেমন ডেনমার্ক আর সুইডেনের মিলিত ডাক বিভাগ। চার শ বছরের বেশি সময় কাজ করেছে, মানুষের লেখা চিঠি ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছে। এখন তারা ঘোষণা দিয়েছে যে তারা অবসরে যাবে। আর চিঠি পৌঁছে দেবে না।

২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর ডেনিশ ডাক বিভাগ তাদের শেষ চিঠিটি পৌঁছে দেবে। এর মধ্য দিয়ে ১৬২৪ সালে শুরু হওয়া এক ঐতিহাসিক যাত্রার সমাপ্তি ঘটবে। ডেনমার্ক ও সুইডেনের ডাক বিভাগের একীভূত রূপ পোস্টনর্ড। এই প্রতিষ্ঠান চলতি বছর ঘোষণা দেয় যে তারা চিঠি বিতরণ করা বন্ধ করবে। কারণ হিসেবে বলা হয়, ডেনিশ সমাজে দ্রুত বাড়ছে ডিজিটালাইজেশন। অনলাইন কেনাকাটা বাড়ছে, কিন্তু হাতে লেখা চিঠির সংখ্যা কমছে ভয়াবহভাবে। সেই বাস্তবতায় প্রতিষ্ঠানটি ডেনমার্কে দেড় হাজার কর্মী ছাঁটাই করবে। তুলে ফেলবে দেড় হাজার ঐতিহ্যবাহী লাল পোস্টবক্স। চিঠির বদলে এখন পোস্টনর্ডের মূল মনোযোগ থাকবে পার্সেল ডেলিভারিতে।

আরও পড়ুন

পোস্টনর্ড ডেনমার্ককে পৃথিবীর সবচেয়ে ডিজিটাল দেশগুলোর একটি বলে দাবি করেছে। তাদের ভাষায়, চিঠির চাহিদা ‘নাটকীয়ভাবে’ কমে গেছে। গত ২৫ বছরে দেশটিতে চিঠি পাঠানোর হার কমেছে ৯০ শতাংশের বেশি। অথচ একসময় এই চিঠিই ছিল রাষ্ট্র, সমাজ ও ব্যক্তিগত জীবনের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম।

লাল পোস্টবক্সগুলো যখন বিক্রির জন্য নিলামে তোলা হয়েছে, তখনই বোঝা গেছে যে মানুষের আবেগ এখনো পুরোপুরি মুছে যায়নি। ভালো অবস্থার একটি পোস্টবক্সের দাম ধরা হয় দুই হাজার ডেনিশ ক্রোন। একটু পুরোনো হলে দেড় হাজার ক্রোন (এক ক্রোন = ১৯.২৭ টাকা)। বিক্রি শুরুর মাত্র তিন ঘণ্টার মধ্যেই এক হাজার পোস্টবক্স বিক্রি হয়ে যায়। জানুয়ারিতে আরও ২০০টি নিলামে তোলা হবে, যেন মানুষ স্মৃতি হিসেবে এটি জমিয়ে রাখতে পারে।

ডেনমার্কে চিঠি পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে না। ডেলিভারি কোম্পানি দাও (Dao) ১ জানুয়ারি থেকে চিঠি পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব নেবে। তবে চিঠি পাঠাতে হলে মানুষকে যেতে হবে দাওয়ের দোকানে, অথবা বাড়ি থেকে সংগ্রহ করাতে চাইলে দিতে হবে অতিরিক্ত টাকা। ডাকমাশুলও দিতে হবে অনলাইন বা অ্যাপের মাধ্যমে। অর্থাৎ চিঠি থাকবে, কিন্তু আগের সেই সহজ, স্বাভাবিক উপায়টি আর থাকবে না।

আরও পড়ুন

মজার বিষয় হলো, সব বয়সী মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি চিঠি পাঠাচ্ছেন ১৮ থেকে ৩৪ বছর বয়সী ব্যক্তিরা। গবেষণায় দেখা গেছে, তাঁরা অন্য বয়সী গোষ্ঠীর তুলনায় দুই থেকে তিন গুণ বেশি চিঠি পাঠান। ট্রেন্ড গবেষক ম্যাডস আরলিয়েন সোবর্গের মতে, তরুণেরা ডিজিটাল ক্লান্তির বিপরীতে একটি আশ্রয় খুঁজছেন। হাতে লেখা চিঠি এখনো তাঁদের মধ্যে টিকে আছে।

ডেনমার্কের আইন অনুযায়ী, চিঠি পাঠানোর সুযোগ রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতেই হবে। তাই দাও যদি কখনো এই দায়িত্ব ছাড়ে, সরকারকে অন্য কাউকে দায়িত্ব দিতে হবে। পরিবহন মন্ত্রণালয়ের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র বলছে, নতুন বছরে সাধারণ মানুষের জীবনে ‘ব্যবহারিকভাবে কোনো পার্থক্য’ তৈরি হবে না। শুধু কোম্পানি বদলাবে। পরিবর্তনটা নাকি মূলত আবেগের।

ডেনমার্কের এই গল্প আমাদের দেশের বাস্তবতার সঙ্গে মেলে। বাংলাদেশে এখনো ডাক বিভাগ সচল। বিশেষ করে শিশু-কিশোরেরা এখনো চিঠি লেখে। কিশোর আলোর পাঠকেরা প্রতি মাসেই চিঠি পাঠায় কিআ কার্যালয়ে। আমাদের গ্রামাঞ্চলে, প্রত্যন্ত এলাকায়, এমনকি শহরেও এখনো ডাকঘর কাজে লাগে। ডিজিটাল মাধ্যম যতই বাড়ুক, জরুরি প্রয়োজনে এখনো মানুষ চিঠি লিখছে। কারণ, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আবেগ।

আরও পড়ুন