মাটিতে খেলাধুলা করলে কি শিশুদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ে

শহরে বাস করা পরিবারগুলো মাটির ছোঁয়া তেমন পায় না। মা-বাবারা শিশুদের নিয়ে ভাবনায় থাকেন। অনেকে মনে করেন, শিশু মাটিতে না খেললে শিশুর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে উঠবে না। শৈশবে আমরা অনেকেই শুনেছি, বড়রা বলতেন, ‘যাও বাইরে গিয়ে মাটিতে খেলো। মাটিতে খেললে শরীর ভালো থাকে, রোগ কম হয়।’ আসলেই কি মাটিতে খেললে ইমিউন সিস্টেম ভালো হয়? এটা কি কেবল মানুষের মধ্যে প্রচলিত ধারণা, নাকি এর পেছনে বিজ্ঞান আছে?

বাইরে দৌড়ঝাঁপ শিশুর ইমিউন সিস্টেম ভালো রাখতে সাহায্য করবেছবি: সুমন ইউসুফ

বৈজ্ঞানিক ভিত্তি

আধুনিক গবেষণা বলছে, এই কথার পেছনে সত্যিই কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আছে। যদিও বিষয়টা যতটা সহজে বলা হয়, ততটা সহজ নয়। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, জীবনের শুরুতে মাটিসহ প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত হওয়া শিশুদের মধ্যে অ্যালার্জি ও অটোইমিউন রোগের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম হতে পারে। অটোইমিউন রোগ হলো এমন অবস্থা, যেখানে শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা ভুল করে নিজের টিস্যুকেই শত্রু মনে করে আক্রমণ করে। মানে, খুব ছোট বয়সে নানা ধরনের ক্ষতিকর নয় এমন ব্যাকটেরিয়ার সঙ্গে পরিচয় হলে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা অপ্রয়োজনে সক্রিয় হয় না।

শিশুর ইমিউন সিস্টেম জন্মের পর ধীরে ধীরে শেখে যে কাকে শত্রু হিসেবে আক্রমণ করতে হবে আর কাকে করা যাবে না। শরীরের ভেতরের কোষ আর বাইরের নিরীহ ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে পার্থক্য করে এই প্রক্রিয়া। ইমিউন সিস্টেমে ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাসের মতো রোগজীবাণুকে চিনে আক্রমণ করা যেমন জরুরি, তেমনি নিরীহ ব্যাকটেরিয়ার প্রতি অযথা প্রতিক্রিয়া না দেখানোও গুরুত্বপূর্ণ।

আরও পড়ুন

এই শেখার প্রক্রিয়ায় বড় ভূমিকা রাখে আমাদের অন্ত্রের ভেতরে থাকা অগণিত ব্যাকটেরিয়া, যাদের একসঙ্গে বলা হয় গাট মাইক্রোবায়োম। ইমিউন সিস্টেমের নিয়ন্ত্রক অংশকে সক্রিয় করার অনেক সংকেত আসে অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়াগুলো থেকে। এরা শুধু রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে না, আমাদের জন্য প্রয়োজনীয় কিছু ভিটামিন তৈরি করে এবং খাবার হজমেও সাহায্য করে।

শিশুর জীবনের প্রথম বছরটি এই মাইক্রোবায়োম গঠনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। স্বাভাবিক প্রসবের সময় শিশুরা মায়ের শরীর থেকে ব্যাকটেরিয়া পায়। বুকের দুধ থেকেও নানা উপকারী ব্যাকটেরিয়ার সংস্পর্শে আসে। এরপর বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা চারপাশের পরিবেশে নানা ব্যাকটেরিয়ার সঙ্গে পরিচিত হয়। মাটি, গাছ, পশুপাখি, এমনকি পোষা প্রাণীর মাধ্যমেও এই পরিচিতি ঘটে।

আরও পড়ুন

তত্ত্ব কী বলে

২০০৩ সালে প্রস্তাবিত একটি তত্ত্ব হলো, ‘পুরোনো বন্ধু তত্ত্ব’। এই তত্ত্ব অনুযায়ী শৈশবে যত বেশি বিচিত্র ও নিরীহ ব্যাকটেরিয়ার সংস্পর্শে আসা যায়, মাইক্রোবায়োম তত সমৃদ্ধ হয়, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তত ভালোভাবে বন্ধু আর শত্রুর পার্থক্য করতে শেখে। এখানে ‘পুরোনো বন্ধু’ বলতে বোঝানো হচ্ছে সেই সব কমেনসাল ব্যাকটেরিয়াকে, যারা আমাদের শরীরের ভেতর বা ওপরে বাস করে, কিন্তু ক্ষতি করে না।

আরেকটি তত্ত্ব হলো ‘হাইজিন হাইপোথিসিস’। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, অতিরিক্ত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কারণে শিশুরা ব্যাকটেরিয়ার সংস্পর্শে আসে না এবং পরে অ্যালার্জিতে বেশি ভোগে। তবে গ্রাহাম রুক ও তাঁর সহকর্মীরা জোর দিয়ে বলেছেন, এটি শুধু কম বা বেশি ব্যাকটেরিয়ার বিষয় নয়, বরং কোন ধরনের ব্যাকটেরিয়ার সংস্পর্শে আসা হচ্ছে, সেটাই আসল কথা। নিরীহ ও প্রাকৃতিক ব্যাকটেরিয়া উপকারী হতে পারে, কিন্তু সংক্রামক রোগের ব্যাকটেরিয়া উপকারী নয়।

বাস্তবে কী ঘটে, গবেষণায় যা পাওয়া গেল

গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রামে বা খামারে বড় হওয়া শিশুদের মধ্যে অ্যালার্জির হার তুলনামূলক কম। পোষা প্রাণী আছে, এমন পরিবারে বড় হওয়া শিশুদের মধ্যেও একই প্রবণতা দেখা যায়। আবার জীবনের শুরুতে অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার, যা অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে, কিংবা সিজারিয়ান ডেলিভারি হওয়া শিশু, যারা মায়ের জন্মনালির ব্যাকটেরিয়ার সংস্পর্শ পায় না, এসবের সঙ্গেও অ্যালার্জির ঝুঁকি বাড়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

আরও পড়ুন

ফিনল্যান্ডে করা একটি পরীক্ষায় শহুরে শিশুদের নিয়ে বিজ্ঞানীরা ভিন্ন ধরনের একটি উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তাঁরা বনাঞ্চলের মাটি ও ঘাস এনে শিশুদের খেলার জায়গায় ব্যবহার করেন। মাত্র এক মাসের মধ্যেই দেখা যায়, যারা এই মাটিতে খেলেছে, তাদের ত্বকে নিরীহ ব্যাকটেরিয়ার বৈচিত্র্য বেড়েছে এবং রক্তে ইমিউন সিস্টেমকে নিয়ন্ত্রণকারী কোষ ও সংকেত দেওয়ার উপাদানও বেশি পাওয়া গেছে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে মাটির ব্যাকটেরিয়া রোগ প্রতিরোধক্ষমতাকে পরিণত হতে সাহায্য করতে পারে।

২০২৪ সালে সুইডেনে প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় দেখা যায়, যারা দুগ্ধখামারে বড় হয়েছে বা যাদের পোষা প্রাণী ছিল, তাদের মধ্যে অ্যালার্জির হার কম। একই সঙ্গে এদের অন্ত্রেও উপকারী ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা বেশি ছিল। গবেষকেরা মনে করেন, এই দুটি বিষয় পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত।

সতর্কতা হিসেবে যা জানা উচিত

তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন যে মাইক্রোবায়োমই সব নয়। জেনেটিকস–সহ আরও অনেক বিষয় অ্যালার্জি বা ইমিউন সমস্যার ঝুঁকিকে প্রভাবিত করে। জনস হপকিনস মেডিসিনের শিশুবিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. রবার্ট উডের মতে, সামগ্রিকভাবে শিশুদের বাইরে খেলাধুলায় উৎসাহিত করা ভালো, কিন্তু এটাকে কোনো ‘নিশ্চিত প্রতিরোধের উপায়’ হিসেবে দেখা ঠিক নয়। যেমন কুকুর পুষলে অ্যালার্জির ঝুঁকি কিছুটা কমতে পারে। এই তথ্যের মানে এই নয় যে সবাইকে অ্যালার্জি ঠেকাতে কুকুর পালতে হবে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, সব মাটি নিরাপদ নয়। দূষিত এলাকার মাটিতে সিসা বা অন্যান্য ক্ষতিকর রাসায়নিক থাকতে পারে, এমনকি পরজীবীও থাকতে পারে। এমন মাটির সংস্পর্শ শিশুদের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই শিশুদের মাটি খাওয়া বা শ্বাসের সঙ্গে ধুলা টেনে নেওয়া থেকে বিরত রাখতে হবে।

তাই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার সঙ্গে প্রকৃতির সংস্পর্শের ভারসাম্য রাখতে হবে। মাঝেমধ্যে মাটিতে হাত লাগানো, বাইরে দৌড়ঝাঁপ করা ইত্যাদি হয়তো শিশুর ইমিউন সিস্টেম ভালো রাখতে খানিকটা সাহায্য করবে। তবে এটিই একমাত্র উপায় নয়।

সূত্র: লাইভ সায়েন্স

আরও পড়ুন