কুঁচিয়া: দেশে অনাদৃত, বাইরে ভীষণ জনপ্রিয়

বাংলাদেশের বহু এলাকায় এখনো কুঁচিয়াকে অদ্ভুত বা অপছন্দের প্রাণী হিসেবেই দেখা হয়ইউএসজিএস

ধানখেত, খাল কিংবা কাদামাটির পাশে হঠাৎ লম্বা ও পিচ্ছিল কিছু নড়াচড়া করতে দেখলে অনেকেই চমকে ওঠে। দূর থেকে দেখে প্রথমে সাপ মনে হয়। কেউ লাঠি নিয়ে এগিয়ে যায়, কেউ আবার ভয় পেয়ে দূরে সরে দাঁড়ায়। কিন্তু কাছে গেলে বোঝা যায়, এটা আসলে সাপ নয়। এটি কুঁচিয়া।

বাংলাদেশের বহু এলাকায় এখনো কুঁচিয়াকে অদ্ভুত বা অপছন্দের প্রাণী হিসেবেই দেখা হয়। অনেকেই এই মাছ খেতে চায় না। কেউ কেউ আবার ধরতেও ভয় পায়। অথচ এই কুঁচিয়াই বিদেশে বেশ জনপ্রিয় খাবার। চীন, কোরিয়া, জাপানসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে কুঁচিয়ার চাহিদা অনেক। রেস্তোরাঁয় এটি দিয়ে তৈরি হয় নানা ধরনের খাবার। যে প্রাণীকে বাংলাদেশের অনেকে ছুঁতেও চায় না, সেটাই বিদেশে বিক্রি হয় বেশ চড়া দামে।

দেখতে সাপের মতো, কিন্তু আসলে মাছ

কুঁচিয়াকে দেখলে ভয় পাওয়ার একটা কারণ আছে। এর শরীর লম্বা, পিচ্ছিল আর অনেকটা সাপের মতো। তবে এটি মাছ। বাংলাদেশে পরিচিত কুঁচিয়াগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো Asian swamp eel।

সাধারণ মাছের মতো এর শরীরে তেমন আঁশ দেখা যায় না। পাখনাও খুব স্পষ্ট নয়। রং সাধারণত বাদামি বা কালচে। এরা সাধারণত কাদা, বিল, জলাভূমি, ধানখেত কিংবা ছোট খালে থাকে। বর্ষাকালে পানি বাড়লে এদের বেশি দেখা যায়।

আরও পড়ুন

কুঁচিয়ার আরেকটি অদ্ভুত ক্ষমতা আছে। পানি কমে গেলেও এটি সহজে মরে না। কাদার নিচে গর্ত করে অনেক সময় লুকিয়ে থাকে। অন্য অনেক মাছ যেখানে টিকে থাকতে পারে না, কুঁচিয়া সেখানে দিব্যি বেঁচে থাকে। বিজ্ঞানীরা বলেন, এরা কম অক্সিজেনেও টিকে থাকতে পারে। এ কারণেই শুকিয়ে যাওয়া জলাভূমিতেও কখনো কখনো কুঁচিয়াকে বেঁচে থাকতে দেখা যায়।

কুঁচিয়া মাছ ধরার ফাঁদ রুহুঙ্গা কাঁধে নিয়ে ছুটছেন সমীরণ। মৌলভীবাজার শহরের শমসেরনগর সড়কে
ফাইল ছবি

গ্রামের অনেক মানুষ কাদা খুঁড়ে কুঁচিয়া ধরে। কোথাও কোথাও আবার বাঁশ দিয়ে বিশেষ ফাঁদও বানানো হয়। বর্ষার দিনে কুঁচিয়া ধরা অনেকের জন্য বাড়তি আয়ের পথ। কিছু এলাকায় ভোরবেলায় মানুষ টর্চলাইট নিয়ে কুঁচিয়া ধরতে বের হয়। বিশেষ করে বর্ষার রাত এদের ধরার ভালো সময় বলে মনে করা হয়।

বিদেশে কেন এত কদর

বাংলাদেশে কুঁচিয়া খুব জনপ্রিয় খাবার না হলেও বিদেশে এর কদর অনেক। বিশেষ করে পূর্ব এশিয়ার কিছু দেশে এটি বেশ দামি খাবার হিসেবে পরিচিত।

চীন ও কোরিয়ার বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় কুঁচিয়া দিয়ে ঝাল রান্না, স্যুপ, ভাজা কিংবা গ্রিল করা খাবার তৈরি হয়। কিছু জায়গায় এটি বিশেষ অতিথিদের খাবার হিসেবেও পরিবেশন করা হয়। অনেকে মনে করেন, এতে প্রচুর প্রোটিন আছে। তাই এটি শক্তিবর্ধক খাবার হিসেবেও জনপ্রিয়।

আরও পড়ুন

বাংলাদেশ থেকেও প্রতিবছর প্রচুর কুঁচিয়া বিদেশে রপ্তানি হয়। দেশের দক্ষিণাঞ্চল, হাওর এলাকা ও কিছু জলাভূমি অঞ্চলের মানুষ কুঁচিয়া সংগ্রহ করে ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করেন। পরে সেগুলো বিদেশে পাঠানো হয়। একসময় যেসব মানুষ কুঁচিয়াকে তেমন গুরুত্ব দিতেন না, এখন তাঁদের অনেকেই এটি ধরে বিক্রি করে আয় করছেন।

মজার বিষয় হলো, গ্রামের মানুষ যে প্রাণীটিকে প্রায়ই ‘সাপের মতো জিনিস’ বলে এড়িয়ে চলে, সেটাই বিদেশে অনেকের পছন্দের খাবার।

ধানের খেত থেকে কুঁচিয়া ধরতে তৎপর দুই ব্যক্তি। পীরগাছা, গাবতলী, বগুড়া, ১২ অক্টোবর
ছবি: সোয়েল রানা

কাদামাটির ভেতরের বাসিন্দা

কুঁচিয়া শুধু খাবার হিসেবেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, জলাভূমির পরিবেশের জন্যও দরকারি। এটি ছোট ছোট জলজ প্রাণী খেয়ে পরিবেশের ভারসাম্য রাখতে সাহায্য করে। প্রকৃতিতে প্রতিটি প্রাণীর যেমন আলাদা ভূমিকা আছে, কুঁচিয়ারও তেমন একটি ভূমিকা আছে।

কিন্তু বাংলাদেশে জলাভূমি কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কুঁচিয়ার সংখ্যাও কমছে। খাল ভরাট, দূষণ, অতিরিক্ত মাছ ধরা আর ধানখেতে অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহারের কারণে এদের বাসস্থান নষ্ট হচ্ছে।

আগে গ্রামের অনেক খাল–বিলে সহজেই কুঁচিয়া দেখা যেত। এখন অনেক এলাকাতেই আগের মতো পাওয়া যায় না। বিশেষ করে শহরের আশপাশের জলাভূমিতে কুঁচিয়া প্রায় হারিয়েই গেছে। পরিবেশবিদেরা বলছেন, জলাভূমি হারিয়ে গেলে কুঁচিয়ার মতো অনেক প্রাণীও ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে।

কুঁচিয়া এমন এক প্রাণী, যাকে আমরা বেশির ভাগ সময় ভুল বুঝি। শুধু দেখতে আলাদা বলে অনেকেই এটিকে ভয় পায় বা অপছন্দ করে। কিন্তু বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে এটি বেশ চমৎকার এক প্রাণী।

তথ্যসূত্র: অ্যানিমেলিয়া
আরও পড়ুন