চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে পানির খোঁজে চীনের অভিযান পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে

চ্যাং’ই-৭ মহাকাশযানটি চীনের দক্ষিণাঞ্চলের হাইনান প্রদেশ থেকে উৎক্ষেপণের কথা ছিল

চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে পানি খুঁজতে যাচ্ছে চীন। চীনের এই অভিযান শুধু দূর থেকে পানির অস্তিত্ব খুঁজে দেখবে না। চাঁদের মাটিতে নেমে সেখানকার বরফ পরীক্ষা করারও পরিকল্পনা আছে। এ জন্য তৈরি করা হয়েছে চীনের চ্যাং’ই-৭ মহাকাশযান। কিন্তু আপাতত সেই অভিযান পিছিয়ে গেছে।

চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এ বছর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চ্যাং’ই-৭ উৎক্ষেপণ করা সম্ভব হবে না। ঠিক কবে আবার মহাকাশযানটি উৎক্ষেপণের চেষ্টা করা হবে, সেটি এখনো জানানো হয়নি।

চ্যাং’ই-৭ মহাকাশযানটি চীনের দক্ষিণাঞ্চলের হাইনান প্রদেশ থেকে উৎক্ষেপণের কথা ছিল। রোববার সন্ধ্যা কিংবা সোমবার সকালে উৎক্ষেপণের সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই পরিকল্পনা বাতিল করা হয়। চীনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মহাকাশযানটি এখনো উৎক্ষেপণের জন্য প্রয়োজনীয় সব শর্ত পূরণ করছে না। মিশনটি যেন নিরাপদে ও সফলভাবে সম্পন্ন হয়, সে কারণেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আগামী বছর আবার এই মিশন পাঠানোর চেষ্টা করা হতে পারে। সম্ভাব্য সময় হিসেবে আগামী বছরের বসন্ত কিংবা গ্রীষ্মের মাঝামাঝি সময়ের কথা বলা হচ্ছে।

আরও পড়ুন

চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে এত আগ্রহ কেন?

চাঁদের দক্ষিণ মেরু নিয়ে বিজ্ঞানীদের এত আগ্রহের কারণ, সেখানে জমাট পানি বা বরফ থাকার সম্ভাবনা আছে। এই অঞ্চলের কিছু গভীর গর্ত বা ক্রেটারে সূর্যের আলো প্রায় কখনোই পৌঁছায় না। ফলে সেখানে অনেক বছর ধরে বরফ জমে থাকতে পারে।

মহাকাশ অভিযানের জন্য পানি খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি সম্পদ। পানি পান করা যাবে, আবার পানি থেকে অক্সিজেন তৈরি করে শ্বাস নেওয়ার কাজে ব্যবহার করা যাবে। এমনকি পানি ভেঙে পাওয়া হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন দিয়ে রকেটের জ্বালানিও তৈরি করা সম্ভব।

এ কারণে চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে যদি সত্যিই প্রচুর পরিমাণে ব্যবহারযোগ্য বরফ পাওয়া যায়, তাহলে ভবিষ্যতে সেখানে মানুষের ঘাঁটি তৈরি করা অনেক সহজ হতে পারে।

চাঁদে কী করবে চ্যাং’ই-৭?

চ্যাং’ই-৭-এর কাজ শুধু চাঁদের ছবি তোলা নয়। এর লক্ষ্য চাঁদের দক্ষিণ মেরুর একটি বিশেষ এলাকায় গিয়ে সরাসরি গবেষণা করা।

মহাকাশযানটির সঙ্গে থাকবে একটি ছোট রোবট। সেটিকে বলা হচ্ছে ‘হপার’। চাঁদের মাটিতে নামার পর এই রোবটটি লাফিয়ে লাফিয়ে বা ছোট ছোট দূরত্ব পেরিয়ে দক্ষিণ মেরুর বিভিন্ন গর্তের কাছে যাবে। এরপর সেখানে থাকা বরফের সন্ধান করবে এবং চাঁদের মাটি খুঁড়ে পরীক্ষা করার চেষ্টা করবে।

কাজটি মোটেও সহজ না। চাঁদের দক্ষিণ মেরুর কোনো ক্রেটারের কিনারায় আগে কখনো কোনো মহাকাশযান অবতরণ করেনি। তাই এই মিশনকে বেশ কঠিন এবং একেবারেই নতুন ধরনের অভিযান বলা হচ্ছে।

থাইল্যান্ডের ন্যাশনাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক উইফু রুজোপাকর্নের মতে, চাঁদের এই অঞ্চলে অবতরণের জন্য প্রতিবছর খুব অল্প সময়ের সুযোগ পাওয়া যায়। ফলে সেই সময়ের মধ্যে আবহাওয়া বা অন্য কোনো সমস্যা দেখা দিলে অভিযান পিছিয়ে দিতে হয়।

এবারও তেমন কিছু ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষিণ চীনের ওপর দিয়ে একটি আবহাওয়া ব্যবস্থা অতিক্রম করার কারণে উঁচু স্তরের বাতাসের গতি বেড়ে গেছে। সেটিই উৎক্ষেপণ পিছিয়ে দেওয়ার অন্যতম কারণ হতে পারে। তবে এর সঙ্গে অন্য কোনো বিষয়ও জড়িত থাকতে পারে বলে মনে করছেন তাঁরা।

আরও পড়ুন

যুক্তরাষ্ট্রও ছুটছে একই জায়গায়

চীনের এই অভিযান শুধু বৈজ্ঞানিক গবেষণার বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নতুন এক মহাকাশ প্রতিযোগিতাও।

চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে পৌঁছাতে যুক্তরাষ্ট্রও জোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। কারণ, দেশটির বিজ্ঞানীরাও মনে করেন, এই অঞ্চলে ভবিষ্যতের চন্দ্র অভিযানের জন্য প্রয়োজনীয় পানি পাওয়া যেতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে কক্ষপথে থাকা বিভিন্ন মহাকাশযানের সাহায্যে চাঁদের পানির বরফ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করেছে। কিন্তু এখনো চাঁদের মাটিতে গিয়ে বরফ খুঁড়ে পরীক্ষা করার মতো অভিযান সফলভাবে সম্পন্ন করতে পারেনি।

২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ কোম্পানি ইনটুইটিভ মেশিনস চাঁদে পানির সন্ধানে একটি ড্রিল পাঠিয়েছিল। কিন্তু চাঁদের দক্ষিণ মেরুর দুর্গম এলাকায় নামার সময় মহাকাশযানটি সমস্যায় পড়ে। ফলে বরফ খোঁজার মূল কাজটি আর করা সম্ভব হয়নি।

এবার আরও কয়েকটি মার্কিন মহাকাশযান চাঁদের দক্ষিণ মেরুর দিকে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাস্ট্রোবটিক টেকনোলজিস ২০২৬ সালের শেষ দিকে তাদের গ্রিফিন ল্যান্ডার চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে পাঠাতে পারে। আর জেফ বেজোসের মহাকাশ কোম্পানি ব্লু অরিজিন আগামী বছর চাঁদে দুটি পর্যন্ত রোবোটিক ল্যান্ডার পাঠানোর পরিকল্পনা করছে।

এর একটি অভিযানে নাসার তৈরি ভাইপার রোভারও থাকতে পারে। এই রোবটটি বিশেষভাবে চাঁদের পানির বরফ ও অন্যান্য সম্পদের খোঁজ করার জন্য তৈরি করা হয়েছে।

চাঁদের পানি নিয়ে এত প্রতিযোগিতা কেন?

একসময় চাঁদে কে আগে মানুষ পাঠাতে পারে, সেটাই ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মহাকাশ প্রতিযোগিতার বড় প্রশ্ন। এখন সেই প্রতিযোগিতা যেন নতুন দিকে মোড় নিয়েছে।

এবার প্রশ্ন হলো, চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে কে আগে পৌঁছাবে? আর সেখানে থাকা পানি ও অন্যান্য সম্পদকে আগে কাজে লাগাতে পারবে?

তবে চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে আসলে কতটা পানি আছে, আর সেই পানি ভবিষ্যতে মানুষের কাজে লাগানোর মতো অবস্থায় আছে কি না, তা এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। বিজ্ঞানীদের ধারণা, সেখানে বরফ থাকতে পারে। কিন্তু সেটি কতটা, কী অবস্থায় আছে এবং কীভাবে সংগ্রহ করা যাবে, এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি।

চ্যাং’ই-৭ সেই উত্তর খোঁজার কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের চন্দ্র ভূতত্ত্ববিদ ইউকি চিয়ানের মতে, চীনের চাঁদ অভিযান এখন শুধু চাঁদকে জানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ধীরে ধীরে তারা চাঁদের প্রাকৃতিক সম্পদ কীভাবে কাজে লাগানো যায়, সেই দিকেও এগোচ্ছে।

ভবিষ্যতে হয়তো পৃথিবী থেকে চাঁদে সবকিছু নিয়ে যাওয়ার বদলে চাঁদেই পাওয়া পানি, বরফ ও অন্যান্য সম্পদ ব্যবহার করে সেখানে গবেষণাকেন্দ্র বা মানুষের বসতি গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

সূত্র: সিএনএন
আরও পড়ুন