অনেক ফেসবুক ফ্রেন্ডের চেয়ে কি ২ জন বাস্তব বন্ধু বেশি ভালো
স্কুলে তোমার ক্লাসেই হয়তো এমন একজন আছে, যে পুরো স্কুলের সবাইকে চেনে। করিডর দিয়ে হাঁটার সময় ডানে-বাঁয়ে সবাইকে হাই-ফাইভ দেয়, জুনিয়র-সিনিয়র সবার সঙ্গেই তার দারুণ খাতির। আবার অন্যদিকে এমন কাউকে দেখবে, যে ক্লাসের পেছনের বেঞ্চে শুধু তার একমাত্র বেস্ট ফ্রেন্ডের সঙ্গে বসে টিফিন শেয়ার করছে আর দুনিয়ার তাবৎ অদ্ভুত বিষয় নিয়ে ফিসফিস করে গভীর আলোচনা করছে।
এখন তোমার মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, কোনটা আসলে ভালো? শ খানেক ‘হাই-হ্যালো’ বন্ধু থাকা, নাকি মাত্র দুজন ‘প্রাণের বন্ধু’ থাকা, যাদের কাছে মনের সব কথা বিনা দ্বিধায় বলা যায়?
আমাদের হাতে সময় এমনিতেই খুব কম। স্কুল, কোচিং, হোমওয়ার্ক, গেম খেলা, আর পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর পর নতুন বন্ধু বানানোর বা পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার সময় কই? তাই আমরা ধরে নিই, আমাদের যেকোনো একটা পথ বেছে নিতে হবে। হয় অনেক বন্ধু হতে হবে, নয়তো অল্প কিন্তু গভীর বন্ধুত্ব থাকতে হবে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, বিজ্ঞানীরা বলছেন আমাদের এ ধারণা একদম ভুল!
বন্ধুত্বের বেলায় আমরা একটু বেশিই ‘লোভী’
সম্প্রতি ইভল্যুশন অ্যান্ড হিউম্যান বিহেভিয়ার নামে বিখ্যাত জার্নালে একটি গবেষণা ছাপা হয়েছে। সেখানে বিজ্ঞানীরা বিশ্বের নানা প্রান্তের প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের ওপর রীতিমতো গোয়েন্দাগিরি চালিয়েছেন। তাঁরা জানতে চেয়েছিলেন, মানুষ আসলে কেমন বন্ধু চায়?
বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, মানুষ হয়তো বলবে, ‘আমার অনেক বন্ধু দরকার নেই, দু-একজন বিশ্বস্ত বন্ধুই যথেষ্ট।’ কিন্তু ফলাফল দেখে বিজ্ঞানীদের চোখ কপালে! দেখা গেল, মানুষ আসলে দুটোর মধ্যে কোনো একটা বেছে নিতে নারাজ। আমরা বন্ধুত্বের বেলায় বড্ড লোভী। আমরা চাই আমাদের বন্ধুদের বিশাল একটা নেটওয়ার্ক থাকুক, আবার একই সঙ্গে সেই নেটওয়ার্কের সবার সঙ্গেই যেন আমাদের সম্পর্কটা একদম বেস্ট ফ্রেন্ডের মতো গভীর হয়!
ব্যাপারটা অনেকটা দাওয়াতে বা রেস্টুরেন্টে গিয়ে খাওয়ার মতো। তুমি চাইছ কাচ্চি, রোস্ট, রেজালা, বোরহানি তোমার প্লেটে থাকুক, আবার প্রতিটা আইটেমের স্বাদ যেন একেবারে তোমার মায়ের হাতের রান্নার মতো নিখুঁত হয়! মানুষ আসলে নামে বন্ধু চায় না, তারা অনেক বন্ধু চায় এবং সবার সঙ্গেই মনের ভাব প্রকাশ করতে চায়। গভীর বন্ধুত্ব চায়।
গবেষণায় একটা দারুণ ব্যাপার উঠে এসেছে। যারা বলেছে যে তাদের অনেক বন্ধু দরকার, তারা বাস্তবে একটু মিশুক প্রকৃতির। তাদের আসলেই অনেক বন্ধু থাকে, আর বিপদে পড়লে সাহায্য করার মতো মানুষেরও অভাব হয় না।
কিন্তু অন্যদিকে যারা ভাবছে, আমার এত বন্ধু লাগবে না, আমার শুধু এমন বন্ধু চাই, যার সঙ্গে মনের কথা শেয়ার করা যায়, তাদের ভেতরের খবরটা একটু অন্য রকম। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই মানুষগুলো আসলে ভেতরে–ভেতরে একটু একাকিত্বে ভুগছে বা একা হয়ে যাওয়ার ভয়ে আছে। তাদের বর্তমান বন্ধুদের নিয়ে তারা খুব একটা সন্তুষ্ট নয়, আর তাই তারা এমন নতুন বন্ধু খুঁজছে, যাদের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক তৈরি করা যায়।
গাড়ির ড্যাশবোর্ডে যেমন ইঞ্জিন নষ্ট হওয়ার আগে সতর্কবাণীর লাল বাতি জ্বলে ওঠে, আমাদের মস্তিষ্কও ঠিক একইভাবে কাজ করে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই যে হঠাৎ করে আমাদের গভীর বন্ধুত্বের জন্য মন আনচান করে ওঠে, এটা আসলে আমাদের মস্তিষ্কের একটা অ্যালার্ম বেল।
যখন তোমার মনে হবে, ‘ইশ্! আমার তো মনের কথা বলার মতো কেউ নেই,’ তখন বুঝতে হবে তোমার মস্তিষ্ক তোমাকে সিগন্যাল দিচ্ছে যে তুমি একাকিত্বের দিকে এগোচ্ছ। তোমার এখন খোলস ছেড়ে বেরিয়ে নতুন মানুষের সঙ্গে মিশতে হবে। আর যাদের বন্ধুবান্ধবের সার্কেল ঠিকঠাক আছে, তারা এই অ্যালার্ম বেলের আওয়াজ শুনতে পায় না। তারা তাদের বর্তমান নেটওয়ার্ক নিয়েই দারুণ খুশি।
বিজ্ঞানীরা এখনো যা জানেন না
বন্ধু ছাড়া আমাদের এক দিনও চলে না, অথচ এই বন্ধু বানানোর বিজ্ঞানটা নিয়ে এখনো অনেক কিছু অজানা!
যেমন ধরো, আমরা সাধারণত ভাবি ছেলে ও মেয়েদের বন্ধু বানানোর স্টাইল হয়তো আলাদা। কিন্তু এই গবেষণায় দেখা গেছে, বন্ধু নির্বাচনের ক্ষেত্রে ছেলে ও মেয়েদের পছন্দের মধ্যে জাদুকরি কোনো পার্থক্য নেই! হয়তো বাইরে থেকে তাদের আড্ডার ধরন আলাদা মনে হয়, কিন্তু দিন শেষে সবাই বন্ধুদের কাছ থেকে একই রকম সাপোর্ট ও ভালোবাসা চায়।
আরেকটা মজার বিষয় হলো মানুষের স্বভাব। আমরা তো জানলাম মিশুক বা এক্সট্রোভার্ট মানুষেরা অনেক বন্ধু বানাতে পারে। কিন্তু মানুষের তো আরও অনেক স্বভাব আছে! যেমন ধরো, যারা খুব গোছানো, তারা কি বন্ধুদের নিয়ে বেশি সন্তুষ্ট থাকে? যারা নতুন কিছু গ্রহণ করতে ভালোবাসে, তারা কি বন্ধুদের অদ্ভুত সব শখ সহজে মেনে নেয়? যারা কথায় কথায় রেগে যায় বা মন খারাপ করে, তারা কি ঝগড়া হলে বন্ধুদের এড়িয়ে চলে?
এ প্রশ্নগুলোর উত্তর বিজ্ঞানীরা এখনো খুঁজছেন। তবে একটা ব্যাপার তো পরিষ্কার, বন্ধুত্বের কোনো নির্দিষ্ট গাণিতিক সূত্র নেই। তোমার যদি পুরো স্কুলে বন্ধু থাকে, সেটাও দারুণ। আর যদি তোমার শুধু একজন বেস্ট ফ্রেন্ড থাকে, যার সঙ্গে তুমি টিফিনের শিঙাড়াটা অর্ধেক করে ভাগ করে নাও, তা-ও অসাধারণ!
তাই বন্ধু কয়জন আছে, সেটা নিয়ে অঙ্ক না কষে, যে কজন আছে, তাদের সঙ্গে মন খুলে হাসতে শেখো। কারণ, দিন শেষে তোমার ওই হাসিমুখটাই বন্ধুত্বের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন!