গাড়ির কাচে ছোট ছোট কালো বিন্দু থাকে কেন

গাড়িতে বসার পর অনেকের চোখ স্বাভাবিকভাবেই সামনের বিশাল কাচের ওপর গিয়ে পড়ে। খুব খেয়াল করে দেখলে কাচের একেবারে চারপাশের কিনারায় একটি চওড়া কালো বর্ডার দেখতে পাবে। সেই বর্ডারে আবার ছোট ছোট কালো বিন্দু আঁকা। বিন্দুগুলো কিনারার দিকে খুব ঘন থাকে এবং ভেতরের দিকে আসতে আসতে ফাঁকা হয়ে মিলিয়ে যায়।

প্রথম দেখায় তোমার মনে হতে পারে, এটি হয়তো গাড়ির কাচকে সুন্দর ও স্টাইলিশ দেখানোর জন্য কোনো আধুনিক ডিজাইন। অনেকেই আবার ধারণা করেন, শীতপ্রধান দেশে কাচের ওপর জমে থাকা বরফ গলাতে হয়তো এই বিন্দুগুলো সাহায্য করে। কিন্তু আসল সত্যিটা জানলে তুমি অবাক হবে। এই ছোট ছোট কালো বিন্দুগুলোর সঙ্গে গাড়ির সৌন্দর্য বাড়ানো বা বরফ গলানোর কোনো সম্পর্ক নেই। বরং এই আপাতদৃষ্টে গুরুত্বহীন বিন্দুগুলো অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের এক অবিশ্বাস্য বিস্ময়, যা প্রতিদিন রাস্তায় তোমার জীবন রক্ষা করে চলেছে!

গাড়ির কাচের এই কালো বর্ডার এবং বিন্দুগুলোর একটি প্রযুক্তিগত নাম আছে। একে বলা হয় ফ্রিট। এটি কোনো সাধারণ রং বা স্টিকার নয়। ফ্রিট হলো সিরামিক ও এনামেল দিয়ে তৈরি একধরনের বিশেষ পেস্ট। কাচ তৈরির সময় যখন কাচকে বিশাল চুল্লিতে গলিয়ে আকার দেওয়া হয়, ঠিক তখনই এই প্রলেপটি কাচের ভেতরের দিকে (গাড়ির বাইরের দিকে নয়) সেঁকে দেওয়া হয়। তীব্র তাপে এই এনামেল কাচের সঙ্গে চিরতরে মিশে যায়। এগুলো আর কোনো দিন তোলা সম্ভব নয়।

আরও পড়ুন
সূর্যের আলো যদি সরাসরি ওই পলিউরেথেন আঠার ওপর এসে পড়ে, তবে আঠা শুকিয়ে ভঙ্গুর হয়ে যাবে এবং গাড়ির ফ্রেম থেকে কাচ আলাদা হয়ে যাবে।

এই ফ্রিট মূলত ছয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে, যার প্রতিটিই তোমার নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি জড়িত।

১. উইন্ডশিল্ডের শক্ত বাঁধন

আধুনিক গাড়িগুলোয় সামনের উইন্ডশিল্ড নিছক বসিয়ে রাখা হয় না, বরং অত্যন্ত শক্তিশালী পলিউরেথেন আঠা দিয়ে গাড়ির মূল ফ্রেমের সঙ্গে একে শক্তভাবে আটকে দেওয়া হয়। কিন্তু সমস্যা হলো, কাচের পৃষ্ঠ থাকে একদম মসৃণ। মসৃণ জায়গায় আঠা খুব একটা ভালো কাজ করে না। এই ফ্রিটের কালো বর্ডারটি কাচের ওই মসৃণ জায়গাকে অনেকটা সিরিশ কাগজের মতো অমসৃণ বা খসখসে করে তোলে। ফলে আঠা খুব শক্তভাবে কাচকে কামড়ে ধরে রাখতে পারে। এই ফ্রিট না থাকলে ব্রেক কষলে বা কোনো গর্তে চাকা পড়লে তোমার গাড়ির কাচ আস্ত খুলে ছিটকে বেরিয়ে যেত!

২. জীবন রক্ষাকারী আলট্রাভায়োলেট শিল্ড

সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি বা আলট্রাভায়োলেট আলো যেকোনো রাসায়নিক বন্ধন ভেঙে ফেলার জন্য কুখ্যাত। সূর্যের আলো যদি সরাসরি ওই পলিউরেথেন আঠার ওপর এসে পড়ে, তবে আঠা শুকিয়ে ভঙ্গুর হয়ে যাবে এবং গাড়ির ফ্রেম থেকে কাচ আলাদা হয়ে যাবে। ফ্রিটের ওই নিরেট কালো অংশটি একটি বর্মের মতো কাজ করে এবং সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মিকে আঠা পর্যন্ত পৌঁছাতে দেয় না।

এর গুরুত্ব কতখানি? কোনো মারাত্মক দুর্ঘটনায় গাড়ি যখন উল্টে যায়, তখন আধুনিক গাড়ির ছাদ যেন দুমড়েমুচড়ে যাত্রীর গায়ের ওপর না পড়ে, তার ৮০ শতাংশ ভার বহন করে এই উইন্ডশিল্ড! এ ছাড়া সামনের সিটের যাত্রীর এয়ারব্যাগ এই কাচের ওপর ধাক্কা খেয়েই মানুষের দিকে ফুলে ওঠে। আঠা দুর্বল হলে এয়ারব্যাগের ধাক্কায় কাচই বাইরে ছিটকে যাবে। ফলে এয়ারব্যাগ কোনো কাজেই আসবে না।

আরও পড়ুন
রোদেলা দিনে গাড়ি চালানোর সময় চালক ও সামনের যাত্রীর সিটের ওপর থাকা সান-ভাইজরগুলো নামিয়ে দেওয়া হয়।

৩. তাপের ভারসাম্য রক্ষা

মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, শুধু নিরেট কালো বর্ডার দিলেই তো হতো, বিন্দুগুলোর কী দরকার ছিল? এখানেই লুকিয়ে আছে পদার্থবিজ্ঞানের দারুণ এক হিসাব।

নিরেট কালো রং খুব দ্রুত সূর্যের তাপ শুষে নিয়ে গরম হয়ে যায়। কিন্তু স্বচ্ছ কাচ অতটা গরম হয় না। এখন কালো বর্ডার ও স্বচ্ছ কাচের মধ্যে যদি কোনো মেলবন্ধন না থাকে, তবে কাচের এক অংশ প্রচণ্ড গরম আর অন্য অংশ ঠান্ডা থাকবে। তাপমাত্রার এই বিশাল পার্থক্যের কারণে কাচের ভেতর প্রচণ্ড চাপের সৃষ্টি হবে এবং রোদের মধ্যে কাচ এমনিতেই ফেটে বা বেঁকে যাবে।

এই কালো বিন্দুগুলো তাপমাত্রার সেই ভারসাম্য রক্ষার কাজটি করে। বিন্দুগুলো ঘন থেকে ক্রমশ হালকা হয়ে যাওয়ার কারণে তাপ খুব সুন্দরভাবে পুরো কাচে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে প্রচণ্ড গরমে বা হঠাৎ তাপমাত্রার পরিবর্তনেও কাচ সুরক্ষিত থাকে।

আরও পড়ুন

৪. চোখের ধোঁকা রোধ

কাচ যখন অসমানভাবে গরম হয়, তখন আলো কাচের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় কিছুটা বেঁকে যায়। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় লেন্সিং। এই লেন্সিংয়ের কারণে রাস্তার সোজা দাগগুলোকেও চালকের কাছে ঢেউ খেলানো বা বাঁকা মনে হতে পারে। এই অপটিক্যাল ইলিউশন চালকের জন্য ভীষণ বিভ্রান্তিকর হতে পারে। ফ্রিটের বিন্দুগুলো তাপমাত্রার ভারসাম্য বজায় রেখে এই লেন্সিং প্রক্রিয়াকে বাধা দেয়। ফলে তুমি রাস্তা একদম পরিষ্কার দেখতে পাও।

৫. চালকের তৃতীয় সানগ্লাস!

রোদেলা দিনে গাড়ি চালানোর সময় চালক ও সামনের যাত্রীর সিটের ওপর থাকা সান-ভাইজরগুলো নামিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু খেয়াল করে দেখবে, ঠিক মাঝখানে রিয়ারভিউ মিররের পেছনে একটি ফাঁকা জায়গা থেকে যায়, যেখান দিয়ে রোদ সোজা চোখে এসে পড়ে। ওই জায়গাটিতে ফ্রিটের বিন্দুগুলো এমনভাবে দেওয়া থাকে, যা অনেকটা তৃতীয় সান-ভাইজরের মতো কাজ করে এবং রোদের তীব্রতা কমিয়ে চোখকে আরাম দেয়। পাশাপাশি বাইরের উজ্জ্বল আলো থেকে ভেতরের দিকে তাকানোর সময় আলোর তীব্রতা ধাপে ধাপে কমাতেও এটি সাহায্য করে।

আরও পড়ুন
১৯৫০ বা ’৬০-এর দশকের আগের গাড়িগুলোয় এই বিন্দুগুলো ছিল না। তখন কাচ আটকানোর জন্য আধুনিক পলিউরেথেন আঠার বদলে মেটাল ক্লিপ বা রাবারের গ্যাসকেট ব্যবহার করা হতো।

৬. রোবটের পথপ্রদর্শক

আধুনিক বিশাল সব কারখানায় মানুষের বদলে রোবট গাড়ির কাচ লাগানোর কাজ করে। এই কালো বিন্দুগুলো সেই রোবটের সেন্সরের জন্য রাস্তার সিগন্যালের মতো কাজ করে। বিন্দুগুলোর অবস্থান মেপে রোবটের কম্পিউটার একদম মিলিমিটারের হিসাবে নিখুঁতভাবে কাচ বসায় এবং ওয়াইপার কোথায় বসবে, তার জায়গা নির্ধারণ করে দেয়।

সব কাচে কি এই বিন্দু থাকে?

না, থাকে না। গাড়ির যে কাচগুলো ফ্রেমের সঙ্গে আঠা দিয়ে চিরতরে আটকে দেওয়া হয়, শুধু সেগুলোতেই এই ফ্রিট থাকে। কিন্তু দরজার যেসব কাচ আমরা বোতাম চেপে বা হাতল ঘুরিয়ে ওঠাতে-নামাতে পারি, সেগুলো রাবারের চ্যানেলের ভেতর দিয়ে ওঠানামা করে। সেখানে কোনো আঠার দরকার হয় না, তাই দরজার কাচে ফ্রিট বা কালো বিন্দুও থাকে না।

ইতিহাসের পাতা থেকে

১৯৫০ বা ’৬০-এর দশকের আগের গাড়িগুলোয় এই বিন্দুগুলো ছিল না। তখন কাচ আটকানোর জন্য আধুনিক পলিউরেথেন আঠার বদলে মেটাল ক্লিপ বা রাবারের গ্যাসকেট ব্যবহার করা হতো। কিন্তু গাড়ি যখন আরও দ্রুতগামী হতে শুরু করল এবং নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে এল, তখন কাচকে সরাসরি ফ্রেমের সঙ্গে আঠা দিয়ে কাঠামোগতভাবে আটকে দেওয়াটা বাধ্যতামূলক হয়ে পড়ে। আঠা ব্যবহার শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই জন্ম নেয় এই ফ্রিট বা কালো বিন্দুগুলোর।

সাবধানতা ও সতর্কতা

এই বিন্দুগুলো যেহেতু কাচের ভেতরের দিকে থাকে, তাই বাইরের রোদ বা বৃষ্টি এর কোনো ক্ষতি করতে পারে না। কিন্তু তুমি নিজে ভেতর থেকে কোনো কিছু দিয়ে আঁচড় কাটলে এটি নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

তবে হ্যাঁ, তোমার গাড়ির উইন্ডশিল্ডের কিনারায় যদি কখনো সাদাটে বা মেঘলা রঙের কোনো দাগ দেখতে পাও, তবে সতর্ক হতে হবে। এর মানে, কাচ এবং আঠার মধ্যকার বন্ধনটি দুর্বল হয়ে গেছে এবং সেখানে পানি বা আর্দ্রতা ঢুকে পড়ছে। এমনটা দেখলে দ্রুত কোনো বিশেষজ্ঞ মেকানিক বা কাচ মেরামতের দোকানে গাড়িটি নিয়ে যাওয়া উচিত। কারণ, আঠা দুর্বল হয়ে যাওয়া মানে তোমার জীবনের নিরাপত্তাও দুর্বল হয়ে যাওয়া!

সূত্র: রিডার্স ডাইজেস্ট

আরও পড়ুন