সিংহ না বাঘ, কে বেশি শক্তিশালী

সিংহ না বাঘ, কে বেশি শক্তিশালী?মিডজার্নি

কারও সাহসের প্রশংসা করতে প্রায়ই বাঘ কিংবা সিংহের সঙ্গে তুলনা করা হয়। বিড়াল প্রজাতির যত প্রাণী আছে, সেগুলোর মধ্যে এই দুটিই সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী। তবে শক্তিশালী হলেও এরা কিন্তু দুটি আলাদা প্রজাতির প্রাণী। বনের এই দুই রাজকীয় প্রাণীর মধ্যে মিল যেমন আছে, তেমনি অনেক পার্থক্য রয়েছে। তবে সিংহ না বাঘ, কে বেশি শক্তিশালী? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমাদের আগে জানতে হবে এদের শারীরিক গঠন ও এরা এদের নিজেদের পরিবেশে কীভাবে জীবন যাপন করে।

সিংহ ও বাঘের মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো এদের গায়ের রং ও শরীরের গঠন। বাঘের সারা শরীরে কালো বা গাঢ় বাদামি রঙের ডোরাকাটা দাগ আছে। কিন্তু সিংহের গায়ে এমন কোনো দাগ নেই। এ ছাড়া পুরুষ সিংহের গলায় বিশাল কেশর থাকলেও স্ত্রী সিংহের তা থাকে না। অন্যদিকে পুরুষ ও স্ত্রী বাঘ দেখতে প্রায় একই রকম হয়।

বাঘের শরীরের এই ডোরাকাটা দাগগুলো এদের টিকে থাকতে সাহায্য করে। এশিয়ার ঘন বন আর লম্বা ঘাসের আলো ছায়ার মধ্যে এই দাগগুলো বাঘকে লুকিয়ে রাখতে সাহায্য করে। যদিও মানুষের চোখে কমলা রংটি উজ্জ্বল দেখায়। কিন্তু বাঘের শিকারেরা সাধারণত বর্ণান্ধ হয়। ফলে এদের কাছে কমলা রংটি সবুজের মতো দেখায় ও বাঘ খুব সহজেই বনের সঙ্গে মিশে যেতে পারে। মজার ব্যাপার হলো এই ডোরাকাটা নকশা কেবল বাঘের পশমে নয়, এদের চামড়াতেও থাকে। প্রতিটি বাঘের দাগের নকশা একদম আলাদা হয়। অনেকটা আমাদের আঙুলের ছাপের মতো।

আরও পড়ুন
বনের রাজা সিংহ
ছবি: শাটারস্টোক

সিংহের গায়ের তামাটে রংও এদের চমৎকার ছদ্মবেশ হিসেবে কাজ করে। আফ্রিকার বিশাল খোলা প্রান্তরের শুকনা ঘাসের সঙ্গে সিংহের গায়ের রং মিলে যায়। ফলে শিকার করার সময় এরা সহজেই লুকিয়ে থাকতে পারে।

বাইরে থেকে দেখতে আলাদা হলেও সিংহ আর বাঘের শরীরের ভেতরের গঠন বা কঙ্কাল কিন্তু প্রায় একই রকম। বিজ্ঞানীরা যখন এই প্রাণীদের জীবাশ্ম বা হাড় নিয়ে গবেষণা করেন, তখন তাঁরা প্রায়ই বলেন, বিড়াল জাতীয় সব প্রাণীই মূলত এক। এমনকি ঘরে যে পোষা বিড়ালটি আছে, ওর কঙ্কালের সঙ্গেও সিংহ বা বাঘের কঙ্কালের দারুণ মিল রয়েছে। এদের মধ্যে মূল তফাতটা আসলে শুধু আকারের।

দেখতে অনেকটা এক রকম হলেও সিংহ ও বাঘ কিন্তু একে ওপরের সবচেয়ে কাছের আত্মীয় নয়। বিজ্ঞানীরা গবেষণায় দেখেছেন, বাঘের সঙ্গে আসলে তুষার চিতার মিল বেশি। অন্যদিকে, সিংহের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় হলো চিতাবাঘ ও জাগুয়ার।

পৃথিবীতে বাঘ রয়েছে সিংহের অনেক আগে থেকে। বিজ্ঞানীদের পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে পুরোনো বাঘের জীবাশ্মের বয়স প্রায় ২০ লাখ বছর। সেই তুলনায় সিংহের জীবাশ্ম অনেক নতুন। ধারণা করা হয় পৃথিবীতে সিংহের বয়স ১০ লাখ বছরের বেশি নয়।

আরও পড়ুন

সিংহ, বাঘ, চিতাবাঘ, জাগুয়ার ও তুষার চিতা এই পাঁচ প্রজাতিই মূলত ‘প্যানথেরা’ (Panthera) নামক এক বড় পরিবারের সদস্য। জেনেটিক গবেষণায় দেখা গেছে, আজ থেকে প্রায় ৫৫ দশমিক ৭ লাখ বছর আগে এই ৫টি প্রাণীরই এক সাধারণ পূর্বপুরুষ ছিল। সেই আদি প্রাণীটি কিন্তু আজকের সিংহ বা বাঘের মতো এত বড় ছিল না, বরং আকারে বেশ ছোট ছিল।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সিংহ ও বাঘ আজকের এই বড় আকার ধারণ করেছে। প্রাণীদের বড় হয়ে ওঠার পেছনে অনেক কারণ থাকতে পারে। একটি বড় কারণ হতে পারে শীতল পরিবেশে টিকে থাকা। প্রাণীদের শরীর যত বড় হয়, এদের ভেতর থেকে তাপ তত কম বের হয়ে যায়, যা এদের উষ্ণ থাকতে সাহায্য করে। যদিও কেন এরা ঠিক এত বড় হলো, তার সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ এখনো বিজ্ঞানীদের কাছে নেই।

বন্য পরিবেশে সিংহ ও বাঘের জীবনযাপনের পদ্ধতি সম্পূর্ণ আলাদা। সিংহেরা মূলত দলবদ্ধ বা সামাজিক প্রাণী। এরা একটি নির্দিষ্ট দলে বাস করে। যেখানে একাধিক সিংহী এবং এক বা দুটি প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ সিংহ থাকে। পুরুষ সিংহের বিশাল কেশর কেবল সৌন্দর্যের জন্য নয়। এটি এদের লড়াইয়ের সময় সুরক্ষাও দেয়। যেহেতু দল বা এলাকা দখল নিয়ে পুরুষ সিংহদের মধ্যে প্রচুর মারামারি হয়, তাই এই ঘন কেশর এদের ঘাড়কে মারাত্মক চোট থেকে রক্ষা করে।

সিংহের তুলনায় বাঘ অনেক বেশি একা থাকতে পছন্দ করে। বাঘের ছানারা কেবল দুই বছর বয়স পর্যন্ত মায়ের সঙ্গে থাকে। এরপর এরা আলাদা হয়ে যায়।

আরও পড়ুন
রয়েল বেঙ্গল টাইগার বা বাংলার বাঘ
ছবি: সংগৃহীত

সিংহ ও বাঘের মধ্যে কে বেশি শক্তিশালী, তা নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। তবে ওজন, আকার ও পেশিশক্তির ভিত্তিতে বাঘ সাধারণত সিংহের চেয়ে বেশি শক্তিশালী। একটি পূর্ণবয়স্ক বাঘের ওজন ৩১০ কেজি পর্যন্ত হতে পারে। যেখানে সিংহের ওজন সর্বোচ্চ ২৫০ কেজি পর্যন্ত হয়। বাঘের পেশিবহুল শরীরের গঠন তাকে আরও বেশি ক্ষিপ্র ও শক্তিশালী করে তোলে। যদিও লড়াইয়ের সময় সিংহ এর ঘন কেশরের কারণে ঘাড়ের দিকে বাড়তি সুরক্ষা পায়। কিন্তু বাঘের থাবার এক একটি আঘাত সিংহের চেয়ে বেশি শক্তিশালী হয়।

শিকার ধরার ক্ষেত্রে বাঘ ও সিংহ উভয়েই এদের শক্তিশালী চোয়াল ব্যবহার করে। একটি প্রাপ্তবয়স্ক বাঘের কামড়ের শক্তি প্রায় ১ হাজার ৫০ পিএসআই, যা সিংহের তুলনায় অনেকটাই বেশি। অন্যদিকে, একটি পূর্ণবয়স্ক সিংহের কামড়ের শক্তি হলো প্রায় ৬৫০ পিএসআই। সহজ করে বললে, বাঘ চোয়াল দিয়ে যে পরিমাণ চাপ তৈরি করতে পারে, তা সিংহের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ শক্তিশালী হতে পারে।

তবে বন্য পরিবেশে এদের লড়াই হওয়ার আশঙ্কা প্রায় নেই বললেই চলে। কারণ, সিংহ বাস করে আফ্রিকার খোলা সাভানা অঞ্চলে। আর বাঘ থাকে এশিয়ার ঘন জঙ্গলে। তাই কার শক্তি বেশি, তা দেখার জন্য এদের এক জায়গায় এনে পরীক্ষা করা ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই।

সিংহ ও বাঘের মধ্যে সবচেয়ে বড় মিল হলো এরা দুজনেই এখন বিপদে আছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা আইইউসিএন (IUCN) জানিয়েছে, বাঘ বর্তমানে বিপন্ন ও সিংহ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। বন উজাড়, জলবায়ু পরিবর্তন ও মানুষের সঙ্গে সংঘাতের কারণে এই দুই শক্তিশালী প্রাণীর অস্তিত্বই আজ সংকটে। এদের বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাতে হলে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ ও বন সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।

সূত্র: লাইভ সায়েন্স

আরও পড়ুন