যে অদ্ভুত উপায়ে পৃথিবীর কক্ষপথ পরিষ্কার করার কথা ভাবছেন বিজ্ঞানীরা
পৃথিবীর কক্ষপথে ঘুরে বেড়াচ্ছে মানুষের তৈরি হাজার হাজার টন ময়লা। বাতিল স্যাটেলাইট, রকেটের ভাঙা অংশ কিংবা মহাকাশে নভোচারীদের কাজ করার সময় হাত থেকে পড়ে যাওয়া নাট-বল্টু। এসব জমা হচ্ছে সেখানে। এগুলো কিন্তু এক জায়গায় বসে নেই। প্রতি সেকেন্ডে প্রায় আট কিলোমিটার গতিতে চক্কর দিচ্ছে পৃথিবীর চারপাশে।
বর্তমানে ১ সেন্টিমিটারের চেয়ে বড় অন্তত ১২ লাখ আবর্জনার টুকরা মহাকাশে ভাসছে। এগুলো গুলির চেয়েও কয়েক গুণ বেশি গতিতে ছুটছে। এই একটা ছোট টুকরাও যদি কোনো চলন্ত স্যাটেলাইট বা মহাকাশ স্টেশনে গিয়ে লাগে, তবে সেটি নিমেষেই চুরমার হয়ে যাবে। ফলে মোবাইল নেটওয়ার্ক, জিপিএস আর আবহাওয়ার তথ্য পাওয়ার ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
এই ভয়াবহ বিপদ থেকে মহাকাশকে বাঁচাতে বিশ্বজুড়ে গবেষকেরা কাজ করছেন। তাঁরা আবর্জনা সরানোর বেশ কিছু দারুণ ও অদ্ভুত উপায় বের করেছেন। চলো সেই উপায়গুলো জেনে নিই।
অদ্ভুত স্যাটেলাইট
মহাকাশের আবর্জনাগুলো এমনভাবে তৈরি নয় যে সেগুলোকে সহজে হাত দিয়ে ধরে ফেলা যাবে। তাই মহাশূন্যে ভেসে থাকা এসব টুকরা সংগ্রহ করা বেশ কঠিন কাজ। এ সমস্যার সমাধান খুঁজতে জার্মানির একদল বিজ্ঞানী গিরগিটির পায়ের পাতার বিশেষ ক্ষমতার সাহায্য নেওয়ার কথা ভাবছেন।
গেঁকো গিরগিটি একধরনের সূক্ষ্ম বৈদ্যুতিক আকর্ষণের সাহায্যে খুব সহজেই খাড়া দেয়ালের গায়ে আটকে থাকতে পারে। গবেষকদের পরিকল্পনা হলো, গিরগিটির পায়ের মতো আঠালো কৃত্রিম চামড়া দিয়ে একটি স্যাটেলাইট তৈরি করা হবে। এই স্যাটেলাইটটি মহাকাশে ঘুরে বেড়ানো আবর্জনার গায়ে গিয়ে শক্ত হয়ে আটকে যাবে।
আরেকটি মজার উপায় হলো, আঠালো উপাদানটি একটি লম্বা দড়ির মাথায় বেঁধে মহাকাশে ছুড়ে মারা। গিরগিটি লম্বা জিব দিয়ে দূরে থাকা পোকা ধরে খায়। ঠিক একই ভাবে দড়ি দিয়ে আবর্জনা আটকে ফেলা হবে। তারপর স্যাটেলাইটটি সেই আবর্জনাকে টেনে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে নামিয়ে আনবে। আর বাতাসের ঘর্ষণে আগুনে পুড়েই ধ্বংস হয়ে যাবে সব ময়লা।
রোবোটিক শুঁড়
মহাকাশের বর্জ্য ধরে আনার জন্য রোবোটিক হাত বা শুঁড় ব্যবহারের চেষ্টা চলছে। ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা ৫০০ কেজির একটি মহাকাশযান বানাচ্ছে, যাতে ৪টি শুঁড়ের মতো রোবোটিক হাত থাকবে। ২০২৯ সালে এটি মহাকাশে গিয়ে অচল হয়ে পড়া ‘প্রোবা-১’ স্যাটেলাইটকে চেপে ধরে নিচে নামিয়ে আনবে।
মহাকাশ হারপুন
আরেকটি পদ্ধতি হলো স্যাটেলাইটে শিকার করার ধারালো বর্শা বা হারপুন বসানো। এটি প্রতি সেকেন্ডে ২০ মিটার গতিতে ছুটে গিয়ে আবর্জনাকে গেঁথে ফেলবে। যুক্তরাজ্যের সারে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা মহাকাশে একটি কৃত্রিম লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে এই হারপুন ব্যবস্থার সফল পরীক্ষা চালিয়েছেন। তবে সফল পরীক্ষা হলেও আসল মহাকাশ বর্জ্য সরানোর কাজে এখনো এই হারপুন ব্যবহার করা হয়নি।
লেজার কামান
আবর্জনা দূর থেকে ধ্বংস করার কথা ভাবছেন বিজ্ঞানীরা। এ ক্ষেত্রে লেজার প্রযুক্তি হতে পারে এক চমৎকার সমাধান। ২০১৫ সালে জাপানের গবেষকেরা একটি বিশেষ স্যাটেলাইটের প্রস্তাব দেন। এতে ৫ লাখ ওয়াটের একটি শক্তিশালী লেজার বসানো থাকবে। এটি পৃথিবীর কাছাকাছি কক্ষপথে ঘুরে ঘুরে টহল দেবে। আর আবর্জনা লক্ষ্য করে লেজার মারবে। লেজারের আঘাতে আবর্জনাগুলো ভেঙে ছোট ছোট টুকরা হয়ে যাবে। পরে এগুলো বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে দ্রুত পুড়ে ছাই হয়ে যাবে।
অন্যদিকে ২০১১ সালে নাসার গবেষকেরা একটি বিকল্প উপায় খুঁজে বের করেন। তাঁদের মতে, মহাকাশে লেজার না পাঠিয়ে পৃথিবী থেকেই শক্তিশালী লেজার ব্যবহার করা সম্ভব। এই লেজারের সাহায্যে সচল স্যাটেলাইটের দিকে ধেয়ে আসা আবর্জনার গতিপথ সামান্য বদলে দেওয়া যাবে। যাতে বড় কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে।
আরেক অদ্ভুত উপায়
ভবিষ্যতের স্যাটেলাইটে ব্যবহারের জন্য জাপান মহাকাশ সংস্থা ৭০০ মিটার দীর্ঘ বিশেষ পরিবাহী তার তৈরি করছে। স্যাটেলাইটের মেয়াদ শেষ হলে এই তারটি একা একাই খুলে যাবে। এরপর পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের টানে স্যাটেলাইটটি নিচে নেমে আসবে এবং বায়ুমণ্ডলে পুড়ে ধ্বংস হয়ে যাবে।