মহাকাশ স্টেশনকে যে কারণে সূর্যে ফেলে ধ্বংস করা হবে না
আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন (আইএসএস) দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানীরা এক অনন্য গবেষণাগার হিসেবে ব্যবহার করছেন। ২০০০ সালের ২ নভেম্বর থেকে এখন পর্যন্ত এই স্টেশনে মানুষ নিরবচ্ছিন্নভাবে বসবাস ও গবেষণা করে আসছে। কিন্তু এই মহাকাশ স্টেশনের মেয়াদ শেষ হয়ে এসেছে। নাসা ও তার সহযোগী দেশগুলো এখন এই স্টেশনের কার্যক্রম স্থায়ীভাবে বন্ধ করার পরিকল্পনা করেছে।
বিজ্ঞানের জগতের নিয়মিত খবর যারা রাখে, তাদের কাছে এই সিদ্ধান্তের কারণ অজানা নয়। ইতিমধ্যে পুরোনো এই মহাকাশযানে ছোট ছোট অনেক ফাটল দেখা দিয়েছে। আসলে আইএসএস তৈরি করা হয়েছিল মাত্র ১৫ বছর মহাকাশে টিকে থাকার জন্য। অথচ ২৬ বছর পার হয়ে যাওয়ার পরও এটি বিজ্ঞানীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এটি এখন এর কার্যক্ষমতার শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে।
এখন বিজ্ঞানীদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই বিশাল কাঠামোকে নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা। মহাকাশযান দিয়ে নিয়মিত ধাক্কা দিয়ে স্টেশনটির গতি ধরে রাখা না হলে এটি একসময় নিজের কক্ষপথ থেকে বিচ্যুত হয়ে সরাসরি পৃথিবীতে আছড়ে পড়বে।
এমনটি ঘটলে পৃথিবীর মানুষের বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি থাকে। তাই নাসা এই ঝুঁকি এড়াতে স্পেসএক্স কোম্পানিকে একটি বিশেষ যান তৈরির দায়িত্ব দিয়েছে। এই যানের কাজ হবে মহাকাশ স্টেশনটিকে একটি নিয়ন্ত্রিত উপায়ে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ঠেলে দেওয়া, যাতে এটি পুড়তে পুড়তে জনমানবহীন কোনো এক দুর্গম সাগরে গিয়ে পড়ে।
নিজে নিজে আছড়ে পড়ার চেয়ে এই নিয়ন্ত্রিত পতন অনেক বেশি নিরাপদ হলেও এটি নিয়েও পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হওয়া যাচ্ছে না। ‘দ্য ওশান ফাউন্ডেশন’ নামের একটি পরিবেশবাদী সংস্থা জানিয়েছে, এই বিশাল স্টেশনের ধ্বংসাবশেষ সাগরে ফেলার কারণে সামুদ্রিক পরিবেশ ও প্রাণীদের ওপর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম রেডিটের ব্যবহারকারীরা এ সমস্যার একটি অন্য রকম সমাধান দেওয়ার চেষ্টা করছেন। তাঁদের মতে, মহাকাশ স্টেশনটিকে সোজাসুজি সূর্যে ছুড়ে ফেলে দিলেই তো সব ঝামেলা মিটে যায়।
রেডিটের জ্যোতির্বিজ্ঞানবিষয়ক একটি গ্রুপের একজন ব্যবহারকারী প্রশ্ন করেছেন, ‘হয়তো এটা একটা বোকার মতো প্রশ্ন, কিন্তু আমরা কেন আইএসএসকে সরাসরি সূর্যের দিকে পাঠিয়ে দিতে পারছি না?’
বিজ্ঞান নিয়ে জানার আগ্রহের যেকোনো প্রশ্নই আসলে চমৎকার। আর আমাদের সৌরজগতের কেন্দ্রে যখন প্রায় ২ ননিলিয়ন কেজি ওজনের এত বড় একটা জ্বলন্ত নক্ষত্র রয়েছে, তখন মনে হতেই পারে যে আমাদের মহাকাশের এই বিশাল আবর্জনা সেখানে ফেলে পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হোক।
কিন্তু আফসোসের বিষয় হলো, পদার্থবিজ্ঞানের কিছু কঠিন নিয়মের কারণে চাইলেই আমরা সূর্যকে এভাবে আবর্জনা ফেলার জায়গা বানাতে পারব না।
নাসার বিজ্ঞানীরা বিষয়টি চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। আমাদের পৃথিবী কিন্তু মহাকাশে স্থির নেই। এটি সূর্যের চারপাশে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৬৭ হাজার মাইল বেগে আড়াআড়িভাবে ছুটে চলেছে। যেহেতু মহাকাশ স্টেশনটি পৃথিবীর সঙ্গে ঘুরছে, তাই এর মধ্যেও এই একই গতি রয়েছে। এখন স্টেশনটিকে সূর্যে ফেলতে হলে সবার আগে এই বিশাল গতিকে পুরোপুরি শূন্য করতে হবে।
এই গতি শূন্য করা মোটেও সহজ কোনো কাজ নয়। একগুচ্ছ শক্তিশালী মহাকাশযান এনে যদি স্টেশনটিকে সূর্যের দিকে ধাক্কা দেওয়াও হয়, তবু কাজের কাজ কিছুই হবে না।
অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক মাইকেল জে আই ব্রাউন এই বিষয়ে বলেন, ‘পৃথিবীর আকর্ষণ ছেড়ে কোনো রকেট যখন মহাকাশে রওনা দেয়, তখন সেটি সূর্যের দিকে যাওয়ার চেয়ে বরং সূর্যের চারপাশেই আরও দ্রুত ঘুরতে শুরু করে। মহাকর্ষ বলের কারণে রকেটটি সোজা সূর্যের ভেতরে না গিয়ে একটি উপবৃত্তাকার বা ডিম্বাকার পথে এর চারপাশ দিয়ে ঘুরে চলে আসে। ফলে আমরা সূর্য থেকে প্রায় ১০ কোটি কিলোমিটার দূর দিয়ে একে এড়িয়ে চলে যাব।’
বিজ্ঞানীরা যদি কোনো মহাকাশযানকে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় সাত হাজার কিলোমিটার গতিতে ছুড়ে মারতে পারতেন, তবেই কেবল তাকে সোজা সূর্যের বুকে ফেলা সম্ভব হতো। কিন্তু বর্তমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগে মহাকাশ স্টেশনকে এত বিপুল গতি দেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তাই বিজ্ঞানীদের এই সুন্দর কল্পনা শেষ পর্যন্ত কল্পনাই রয়ে যাচ্ছে।
তবে মহাকাশে এমন সফর কিন্তু অসম্ভব নয়। নাসা ইতিমধ্যেই সূর্যকে গবেষণার জন্য ‘পার্কার সোলার প্রোব’ নামের একটি ছোট মহাকাশযান পাঠিয়েছে। এই যান শুক্র গ্রহের মাধ্যাকর্ষণ শক্তিকে ব্রেক হিসেবে ব্যবহার করে নিজের গতি ও দিক নিয়ন্ত্রণ করে সূর্যের কাছাকাছি পৌঁছায়।
পার্কার সোলার প্রোবের ওজন মাত্র ৬৮৫ কেজি হওয়ায় শুক্র গ্রহের মাধ্যাকর্ষণ ব্যবহার করে তাকে সূর্যের কাছে পাঠানো সম্ভব হয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের ওজন প্রায় ৪ লাখ ২০ হাজার কেজি। এত বিশাল ও ভারী স্টেশনকে এই উপায়ে সূর্যের দিকে ঠেলে দিতে যে বিপুল জ্বালানি ও শক্তির প্রয়োজন, তা বর্তমান প্রযুক্তির পক্ষে সম্ভব নয়।
তাই মহাকাশ স্টেশনটিকে সূর্যে ছুড়ে না মেরে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা অনেক সহজ। মহাকাশে থাকার সময় স্টেশনটি এমনিতেই পৃথিবীর টানে প্রতিনিয়ত নিচের দিকে নামতে থাকে। বিজ্ঞানীরা শুধু একে ধাক্কা দিয়ে ওপরে তোলার কাজটা বন্ধ করে দিলেই এটি ধীরে ধীরে নিচে নেমে আসবে। এরপর একটি নির্দিষ্ট সময়ে একে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে পুড়িয়ে সাগরে আছড়ে ফেলা হবে, যা আপাতত সবচেয়ে সহজ ও নিরাপদ উপায়।