পৃথিবীর ৯০ ভাগ মানুষ কেন ডানহাতি

\মানুষ বড়ই অদ্ভুত প্রাণী। মানুষের দুই পাশে দুটো হাত, অথচ সে সারা জীবন একটা হাতকেই বেশি খাটিয়ে মারে। তুমি যদি ডানহাতি হয়ে থাকো, তবে একবার বাঁ হাত দিয়ে তোমার নিজের নামটা লেখার চেষ্টা করে দেখো তো! কাগজে যে হিজিবিজি তৈরি হবে, তা দেখলে মনে হতে পারে কেউ যেন মৃত্যুভয়ে ভীত হয়ে কোনো আকুতি লিখে রেখেছে!

দুনিয়ার মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮৫ থেকে ৯০ ভাগ মানুষই ডানহাতি। অর্থাৎ প্রতি ১০ জনে ৯ জনই সব কাজে ডান হাত ব্যবহার করে। কিন্তু এমনটা কেন হলো? সবাই ডানহাতি কেন? অর্ধেক মানুষ কেন বাঁহাতি হলো না?

ডানহাতিদের একচেটিয়া পৃথিবী

তুমি হয়তো কখনো খেয়াল করে দেখোনি, কিন্তু আমাদের এই পুরো পৃথিবীটা আসলে ডানহাতিদের সুবিধা দেওয়ার জন্য বানানো। বাঁহাতিদের জীবনের কষ্ট ডানহাতিরা সহজে বুঝবে না। একটা সাধারণ কাঁচি দিয়ে কাগজ কাটার কথা ভাবো, কিংবা স্পাইরাল নোটবুকের ওই প্যাঁচানো তারগুলোর কথাও ভাবতে পারো। বাঁহাতিরা লিখতে গেলে ওই তারে কনুই আটকে যায়। আবার টিনের কৌটা খোলার ক্যান ওপেনার থেকে শুরু করে, ক্রেডিট কার্ড সোয়াইপ করার মেশিন, এমনকি ব্যাংকের কাউন্টারে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা কলম; সবকিছুই ডানহাতিদের ব্যবহারের কথা মাথায় রেখে বানানো। ক্লাসরুমের যেসব বেঞ্চের হাতল লেখার জন্য ডানদিকে বাড়ানো থাকে, সেখানে বসলে বাঁহাতিদের কনুই হাওয়ায় ভাসতে থাকে!

এখন প্রশ্ন হলো, এই ডানহাতি হওয়ার ব্যাপারটা শুরু হয় কখন? বিজ্ঞানীরা বলেন, তুমি যখন পৃথিবীতে ভূমিষ্ঠ হওনি, মায়ের পেটে ছিলে, তখন থেকেই এই ডান-বাঁয়ের হিসাব শুরু হয়ে যায়। আলট্রাসাউন্ড স্ক্যানে দেখা গেছে, মাত্র ১০ সপ্তাহ বয়সেই ভ্রূণ তার বাঁ হাতের চেয়ে ডান হাত বেশি নাড়াচাড়া করে। আর ১৫ সপ্তাহ বয়সে অনেকেই বাঁ আঙুল বাদ দিয়ে ডান হাতের বুড়ো আঙুল চুষতে শুরু করে দেয়! তার মানে, আমরা জন্ম নেওয়ার আগেই নিজেদের বেছে নিই আমরা ডানহাতি হবো নাকি বাঁহাতি।

আরও পড়ুন

কিন্তু মায়ের পেটে ভ্রূণ অবস্থায় থাকার সময় তো আমরা বলতে গেলে কিছুই বুঝি না। তাহলে কীভাবে ঠিক হয় আমরা কোন হাত বেশি ব্যবহার করব? এর পেছনে জিনগত একটা ব্যাপার তো আছেই। ডজনখানেক জিন মিলে আমাদের মস্তিষ্কের গঠন এমনভাবে তৈরি করে যে আমরা ডান হাতের প্রতি বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ি। তবে পুরোপুরি ছক বাঁধা নিয়মে সব হয় না। মস্তিষ্কের বিকাশের সময় খুব সামান্য হেরফেরের কারণে অনেকেই বাঁহাতি হিসেবে জন্ম নেয়। অনেক সময় হয় না, একই রেসিপি কিন্তু স্বাদ ভিন্ন; অনেকটা সে রকম!

টিকে থাকার লড়াই

শুধু জিনতত্ত্ব দিয়ে এর পুরোটা ব্যাখ্যা করা যায় না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের পূর্বপুরুষদের টিকে থাকার লড়াই।

প্রাচীনকালের কথা ভাবো। মানুষ তখন দল বেঁধে থাকে। একজন আরেকজনকে দেখে পাথর দিয়ে হাতিয়ার বানানো শিখছে, বর্শা ছোড়া শিখছে। এখন দলের সবাই যদি একই হাত ব্যবহার করে, তবে কাজটা শেখা এবং অনুকরণ করা অনেক সহজ হয়ে যায়। ২০১১ সালের এক গবেষণায় অন্তত পাঁচ লাখ বছর পুরোনো পাথরের হাতিয়ার পরীক্ষা করে দেখা গেছে, সেগুলোতেও ডানহাতি মানুষের ব্যবহারের প্রমাণ রয়েছে।

আরেকটা চমকপ্রদ থিওরি হলো যুদ্ধ। মানুষের হৃৎপিণ্ড থাকে বুকের বাঁ দিকে। তুমি যদি ডানহাতি হও, তবে মারামারির সময় তোমার প্রতিপক্ষের বাঁ দিকে আঘাত করা তোমার জন্য স্বভাবতই সহজ হবে। হাজার হাজার বছর ধরে চলা এই সামান্য সুবিধা হয়তো মানবজাতিকে ডানহাতি হতে সাহায্য করেছে।

আরও পড়ুন

তাহলে বাঁহাতিরা হারিয়ে গেল না কেন

হ্যাঁ, প্রশ্নটা যৌক্তিক। তবে বাঁহাতিদেরও দারুণ কিছু সুবিধা আছে। তারা সব সময় একটা চমক দিতে পারে। তুমি সারা জীবন ডানহাতি মানুষের সঙ্গে লড়াই করে বা পাল্লা দিয়ে অভ্যস্ত, হঠাৎ একজন বাঁহাতি প্রতিপক্ষ সামনে এলে তার গতিবিধি বোঝা বেশ কঠিন হবে। খেলাধুলার জগতেও এই সুবিধা দেখা যায়। বেসবলের বেব রুথ, টেনিস তারকা রাফায়েল নাদাল কিংবা বাস্কেটবল কিংবদন্তি বিল রাসেলের মতো বাঁহাতি খেলোয়াড়েরা এর বড় প্রমাণ। ক্রিকেটে তো এর প্রমাণ আছে ভূরি ভূরি।

স্যার গারফিল্ড সোবার্স, ব্রায়ান লারা, কুমার সাঙ্গাকারা, সৌরভ গাঙ্গুলী, সাকিব আল হাসান, অ্যাডাম গিলক্রিস্ট, ডেভিড ওয়ার্নারসহ আরও কত ক্রিকেটার আছেন! মজার ব্যাপার হলো, শুধু আমরা হোমো স্যাপিয়েন্সরাই নই, বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া নিয়ানডারথালরাও মূলত ডানহাতি ছিল।

আমরা নিজেদের যতটা প্রতিসম ভাবি, আসলে আমরা তা নই। প্রত্নতাত্ত্বিকেরা নিয়ানডারথালদের হাড়গোড় পরীক্ষা করে দেখেছেন, তাদের ডান হাতের হাড় বাঁ হাতের চেয়ে বেশি মজবুত ও মোটা ছিল। মানে তারা ডান হাতটাই বেশি খাটাত।

আরও পড়ুন

অর্থাৎ মানুষের ডানহাতি হওয়ার পেছনে জিন, মস্তিষ্কের বিকাশ এবং হাজার বছরের পরিবর্তন মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে। বিশ্বের ৮৫–৯০% মানুষ ডানহাতি। পৃথিবীর অনেক সরঞ্জাম, কাঁচি, নোটবুক—সবই ডানহাতিদের সুবিধায় তৈরি। মায়ের পেটে ১০ সপ্তাহ বয়স থেকেই ভ্রূণ ডান হাত বেশি নাড়ায়। জিন ও মস্তিষ্কের গঠন এর কারণ।

পূর্বপুরুষদের টিকে থাকার লড়াইয়েও ডানহাত সুবিধা দিয়েছিল। তবে বাঁহাতিরাও খেলাধুলায় চমক তৈরি করে, যেমন সাকিব, সাঙ্গাকারা। বিলুপ্ত নিয়ানডারথালেরাও মূলত ডানহাতি ছিল। জিন, বিবর্তন ও মস্তিষ্কের বিকাশ মিলে এই বৈষম্য তৈরি করেছে।

সূত্র: পপুলার সায়েন্স

আরও পড়ুন