হেভি মেটাল–ভক্তদের সহ্যশক্তি কি অন্যদের চেয়ে বেশি? কী বলছে নতুন গবেষণা
হেভি মেটাল কনসার্ট মানে, ড্রাম ও গিটারের তীব্র শব্দ আর মাথা ঝাঁকানো নাচ। প্রথম দেখায় মনে হতে পারে, এত আওয়াজ মানুষকে ক্লান্ত ও অস্থির করে ফেলে। তবে বিজ্ঞানীরা এ বিষয়ে এক অবাক করা তথ্য খুঁজে পেয়েছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, হেভি মেটাল গানের ভক্তরা সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেক বেশি মানসিক চাপ সহ্য করতে পারেন। কিন্তু হেভি মেটাল গানগুলো কীভাবে মানুষের মনের চাপ ও ব্যথা সহ্য করতে সাহায্য করে, তার কারণ খুঁজেছেন একদল বিজ্ঞানী।
জার্মানির ওয়াকেন ওপেন এয়ারকে বিশ্বের হেভি মেটাল গানের সবচেয়ে বড় উৎসব হিসেবে ধরা হয়। উত্তর জার্মানির ছোট্ট শান্ত শহরে ১৯৯০ সাল থেকে প্রতিবছর এই কনসার্ট হয়। বিশ্বের নানা প্রান্তের মেটাল সংগীতের ভক্তরা সেখানে যান। উৎসবে গান করেন মেটাল গানের শত শত নামীদামি শিল্পী। প্রতিবছর প্রায় ৮৫ হাজার গানপাগল মানুষ এখানে জড়ো হন। তবে তাঁদের সঙ্গে এই হইচইপূর্ণ উৎসবে মাঝেমধ্যে বিজ্ঞানীদের দেখা যায়। কিন্তু কেন?
বিজ্ঞানীরা কেন ওয়াকেন উৎসবে
জার্মানির ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর হিউম্যান কগনিটিভ অ্যান্ড ব্রেন সায়েন্সেসের সাবেক নিউরোসায়েন্স গবেষক লিডিয়া স্নাইডার। তিনি এ বিষয়টি নিয়ে কাজ করছেন। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে মানসিক কষ্টে ভোগা রোগীদের ভেতরে চেপে রাখা রাগ বা ক্ষোভ তাদের কষ্টের অনুভূতিকে অনেক বাড়িয়ে দেয়। সে কারণেই বিজ্ঞানীরা দেখতে চেয়েছিলেন, গানের প্রভাবে মানুষের শারীরিক ব্যথার অনুভূতিতে কোনো বদল আসে কি না। বিশেষ করে হেভি মেটালের মতো কড়া সুরের গান, যা সাধারণত রাগ কিংবা নানা অস্থির অনুভূতি প্রকাশ করে, তা ব্যথার ওপর কেমন প্রভাব ফেলে, সেটাই তাঁরা পরীক্ষা করে দেখতে চেয়েছেন। তাই তাঁরা জার্মানির ওয়াকেন ওপেন এয়ার কনসার্টে যান।
গবেষক লিডিয়া স্নাইডার ও তাঁর সহকর্মী টম ফ্রিটজ কনসার্টে আসা দর্শকদের জন্য একটি পরীক্ষার ব্যবস্থা করেন। গবেষকেরা দর্শকদের একটা পরীক্ষা দিতে বললেন। বরফ–ঠান্ডা পানিতে কে কতক্ষণ হাত ডুবিয়ে রাখতে পারেন, সেটাই দেখা হবে। এই বরফ পানিতে হাত ডোবানোর আগে স্বেচ্ছাসেবকদের হৃৎস্পন্দন ও রক্তের চাপ পরিমাপ করতে ইসিজি মনিটর ব্যবহার করা হয়। স্নাইডার ও ফ্রিটজ উৎসব চলাকালে মোট ১২২ গানপ্রেমীর ওপর এই পরীক্ষা চালান। এরপর এই ফলাফল তুলনা করা হয় একদল সাধারণ মানুষের সঙ্গে, যাঁরা মূল কনসার্ট শুরু হওয়ার আগেই সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
পরীক্ষার এই ফল দেখে গবেষকেরা বেশ অবাক হন। গবেষণাটি ‘সায়েন্টিফিক রিপোর্টস’ সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষকেরা ভেবেছিলেন, হেভি মেটাল কনসার্টের লাফালাফি আর চেঁচামেচিতে বুঝি মানুষের ব্যথা পুরোপুরি গায়েব হয়ে যাবে। কিন্তু তা হয়নি। তবে একটি অদ্ভুত ব্যাপার ঘটেছে। বরফ–ঠান্ডা পানির কনকনে ব্যথা সহ্য করা তাঁদের জন্য অনেক সহজ হয়ে গিয়েছিল। অর্থাৎ বিজ্ঞানীরা তাঁদের ধারণার একদম বিপরীত ফল পেলেন। দেখা গেল, যাঁরা কনসার্টের আনন্দ উপভোগ করছিলেন, তাঁরা সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেক বেশি সময় ধরে বরফ–ঠান্ডা পানিতে হাত ডুবিয়ে কষ্ট সহ্য করতে পেরেছেন।
গবেষণায় দেখা গেছে, কড়া সুরের বা রাগ প্রকাশের গান শারীরিক ব্যথার তীব্রতা কমায় না। তবে মানুষের ব্যথা সহ্য করার ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। গবেষকদের মতে, কনসার্টে যাওয়া মানুষদের সহ্যশক্তি বাড়ার পাশাপাশি এই আবিষ্কার চিকিৎসায়ও দারুণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে যেসব রোগী দীর্ঘদিন ধরে তীব্র ব্যথায় কষ্ট পাচ্ছেন, তাঁদের চিকিৎসার চিকিৎসাপদ্ধতি আরও সহজ করতে এটি সাহায্য করবে।
গবেষক টম ফ্রিটজ জানান, মানুষ সাধারণত মন ভালো করতে কিংবা প্রশান্তি পেতে গান শোনে। কিন্তু মনের ভেতরে জমে থাকা রাগ বের করার জন্য মোটেও শান্ত সুর কাজে আসে না। তখন দরকার হেভি মেটালের মতো কড়া ও তীব্র সুর।
জার্মানির ওয়াকেন ওপেন এয়ার ২০২২ আসরের অন্যতম জনপ্রিয় ব্যান্ড ‘স্লিপনট’–এর ক্ষেত্রেও এই কথা পুরোপুরি সত্য। ২০০৪ সালে মুক্তি পাওয়া তাদের অত্যন্ত জনপ্রিয় গান ‘ডুয়ালিটি’। এ গানটি মূলত ব্যান্ডের প্রধান গায়কের তীব্র মাইগ্রেনের মাথার ব্যথা নিয়ে লেখা হয়েছিল।