সত্যিই কি ঠান্ডায় জমে যাচ্ছে নায়াগ্রা জলপ্রপাত
প্রকৃতির এক বিস্ময় নায়াগ্রা জলপ্রপাত। প্রতিবছর লাখ লাখ পর্যটক কানাডার অন্টারিওতে ভিড় জমান কেবল এই জলপ্রপাতের গর্জন আর বিশালতা উপভোগ করতে। কিন্তু শীত আসতেই নায়াগ্রা যেন এক ভিন্ন রূপ ধারণ করে। হাড়কাঁপানো ঠান্ডার তোয়াক্কা না করে হাজারো প্রকৃতিপ্রেমী সেখানে জড়ো হন সেই অদ্ভুত দৃশ্য দেখতে।
সম্প্রতি উত্তর আমেরিকার ওপর দিয়ে বিশাল মেরু ঘূর্ণিঝড় (Polar vortex) বয়ে গেছে। এর ফলে হাড়কাঁপানো শীতে নায়াগ্রা জলপ্রপাত এলাকার তাপমাত্রা হিমাঙ্কের অনেক নিচে প্রায় মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে আসে। জলপ্রপাতের পানি যখন প্রবল বেগে আছড়ে পড়ে, তখন তৈরি হওয়া কুয়াশা বাতাসের সংস্পর্শে আসামাত্রই বরফে পরিণত হতে শুরু করে। মুহূর্তের মধ্যেই চারপাশের পাহাড়, গাছপালা, নদীর তীর আর পাথরগুলো বরফের সাদা চাদরে ঢাকা পড়ে যায়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের করা ভিডিওতে দেখা যায় সেই সব দৃশ্য। যদিও জলপ্রপাতের মূল স্রোতটি এখনো বহমান। কিন্তু এর পাশের একটি অংশ এরই মধ্যে বরফে জমে গেছে। নিউইয়র্কের নায়াগ্রা জলপ্রপাত স্টেট পার্কের মুখপাত্র অ্যাঞ্জেলা বার্টি জানিয়েছেন, গত সপ্তাহের প্রচণ্ড শীত ও তুষারঝড়ের কারণে নায়াগ্রার ঢেউ খেলানো বিশাল জলরাশি এখন বরফের পাতলা স্তরে ঢাকা পড়ে গেছে।
কিছু ছবিতে দেখা যাচ্ছে, সেই জমে যাওয়া বরফের স্তর থেকে ধোঁয়া বা বাষ্পের মতো কুয়াশা কুণ্ডলি পাকিয়ে ওপরে উঠে আসছে। জলপ্রপাতের পাদদেশে বরফের বিশাল সব স্তূপ জমা হয়ে আছে। ওপর থেকে দেখলে মনে হয় যেন পুরো জলপ্রপাতটি পাথর হয়ে গেছে। কিন্তু আসলে এই স্বচ্ছ বরফের নিচে আড়ালেই পানির মূল স্রোতটি আপনগতিতে বয়ে চলেছে।
নায়াগ্রা জলপ্রপাত আসলে কোনো একক জলপ্রপাত নয়। এটি তিনটি বড় জলপ্রপাতের বিশাল সমষ্টি। এটি উত্তর আমেরিকা মহাদেশের যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্য এবং কানাডার অন্টারিও প্রদেশের ঠিক সীমান্তে অবস্থিত। নায়াগ্রা নদীর ওপরে থাকা এই তিনটি জলপ্রপাতের সবচেয়ে বড় অংশ হর্সশু ফলস। এর আকৃতি অনেকটা ঘোড়ার খুরের মতো বলে একে এই নামে ডাকা হয়। এটি মূলত কানাডা অংশে পড়েছে। আমেরিকান ফলস ও ব্রাইডাল ভেইল ফলস যুক্তরাষ্ট্র অংশে অবস্থিত।
নায়াগ্রা পার্কস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বর্তমানে জলপ্রপাতের ওপর বরফের যে মোটা আস্তরণ দেখা যাচ্ছে, এর নিচ দিয়ে পানি ঠিকই আগের মতো প্রবাহিত হচ্ছে। আসলে কয়েক সপ্তাহ ধরে মধ্য ও পূর্ব আমেরিকায় বয়ে যাওয়া প্রচণ্ড মেরু ঘূর্ণিঝড়ের কারণেই এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, যা কমার কোনো লক্ষণ আপাতত নেই।
এখন প্রশ্ন জাগতে পারে, নায়াগ্রা কি কখনো পুরোপুরি জমে বরফ হয়ে যেতে পারে? পার্কের মুখপাত্র অ্যাঞ্জেলা বার্টি জানান, এখন আর নায়াগ্রার পানি পুরোপুরি জমে যাওয়া অসম্ভব। যদিও নদীর ওপরের বরফ আর কুয়াশা মিলে এমন এক ভ্রম তৈরি করে যাকে দূর থেকে দেখলে মনে হয়, জলপ্রপাতটি বুঝি জমে গেছে।
ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, ১৮৪৮ সালে একবার কানাডা ও আমেরিকা—উভয় পাশের জলপ্রপাতই শক্ত হয়ে জমে গিয়েছিল। এরপর ১৯৩৬ ও ১৯৩৮ সালেও আমেরিকান অংশে এমন ঘটনা ঘটেছিল। তবে এখন আর তেমনটি হওয়ার সুযোগ নেই। কারণ হিসেবে বার্টি জানান, নদীতে এখন ‘আইস বুম’ (Ice Boom) নামে একটি বিশেষ যন্ত্র বসানো হয়েছে। এটি মূলত নদীতে ভাসমান বরফের চাঁইগুলোকে আটকে দেয় এবং পানির প্রবাহ ঠিক রাখে। ফলে তীব্র শীতেও জলপ্রপাত আর আগের মতো পুরোপুরি ঠান্ডা বরফে জমে যায় না। শীতের নায়াগ্রা জলপ্রপাতের এই অদ্ভুত সুন্দর দৃশ্য সত্যিই এককথায় চমৎকার।
সূত্র: ইউএস টুডে, রয়টার্স, দ্য নিউজ