পৃথিবীতে মোট কত হাজার টন স্বর্ণ আছে
স্বর্ণের গয়না বা স্বর্ণের বারের ঝকঝকে রূপ দেখে মুগ্ধ হয়নি, এমন মানুষ হয়তো খুঁজেই পাওয়া যাবে না। কিন্তু তুমি কি জানো, এই মহামূল্যবান ভারী ধাতুটি আমাদের পৃথিবীতে তৈরি হয়নি? মহাকাশের অসীম শূন্যতায় দুটি মৃত নক্ষত্রের ভয়ংকর সংঘর্ষের ফলেই জন্ম হয়েছিল এই জাদুকরি ধাতু!
মহাকাশ থেকে পৃথিবীতে আসা এই স্বর্ণ নিয়ে মানুষের উন্মাদনার শেষ নেই। কিন্তু কখনো কি তোমার মনে প্রশ্ন জেগেছে, এই পৃথিবীতে মোট কতটুকু স্বর্ণ আছে? আর তার কতটুকুই বা আমরা খুঁজে পেয়েছি? তুমি হয়তো জেনে থাকবে, পৃথিবীর সব স্বর্ণ এখনো মানুষ খুঁজে পায়নি। হয়তো ভবিষ্যতে কিছু কিছু পাবে।
মানুষ এ পর্যন্ত কতটুকু স্বর্ণ খুঁড়ে বের করেছে
হিসাবটা শুরু করা যাক মার্কিনদের অর্জন দিয়ে। ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভের মতে, মানব ইতিহাসের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত মানুষ পাথর ও নদী থেকে প্রায় দুই লাখ ছয় হাজার টন স্বর্ণ উত্তোলন করেছে।
তবে ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের হিসাবটি এর চেয়ে একটু বড়। তাদের মতে, আজ পর্যন্ত উত্তোলন করা স্বর্ণের পরিমাণ ২ লাখ ৩৮ হাজার ৩৯১ টন। তুমি হয়তো ভাবছ, এত এত টন স্বর্ণ একসঙ্গে রাখলে না জানি কত বড় পাহাড় হয়ে যাবে! মজার ব্যাপার হলো, মানুষের উত্তোলিত এই পুরো স্বর্ণটুকু গলিয়ে যদি তুমি একটি নিরেট ঘনক বা কিউব বানাও, তবে তার প্রতিটি পাশ হবে মাত্র ৭২ ফুট লম্বা! হ্যাঁ, এই ছোট্ট কিউবটিই হলো মানুষের হাজার বছরের সঞ্চয়।
উল্কার সঙ্গে মহাকাশ থেকে আসা এই স্বর্ণ আর পৃথিবীর কেন্দ্রে তলিয়ে যেতে পারেনি। কারণ, তত দিনে পৃথিবীর ওপরের স্তর ঠান্ডা হয়ে শক্ত পাথরে পরিণত হয়েছিল।
এর মধ্যে প্রায় ৪৫ শতাংশ স্বর্ণ দিয়ে গয়না বানানো হয়েছে, ২২ শতাংশ স্বর্ণের বার ও কয়েন হিসেবে মানুষের সিন্দুকে জমা আছে এবং ১৭ শতাংশ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ভল্টে কড়া নিরাপত্তায় বন্দী আছে।
মাটির নিচে আর কতটুকু স্বর্ণ জমা আছে
পৃথিবীর ওপরের স্তরে বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক যেসব স্বর্ণের খনি আছে, তার একটা বড় অংশই মানুষ খুঁড়ে ফেলেছে। তবে ইউএসজিএসের তথ্যমতে, বিশ্বজুড়ে এখনো প্রায় ৭০ হাজার ৫৫০ টন স্বর্ণ খনির নিচে মজুত আছে। একে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে রিজার্ভ।
সবচেয়ে বেশি না-খোঁড়া স্বর্ণের মজুত আছে রাশিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকায়। তবে ২০২৪ সালে অন্য সব দেশকে পেছনে ফেলে চীন সবচেয়ে বেশি স্বর্ণ উত্তোলন করে বাজারে এনেছে!
সমুদ্রে আর পাথরে লুকিয়ে থাকা স্বর্ণ
পৃথিবীর সব স্বর্ণ কিন্তু খনিতে পাওয়া যায় না। পৃথিবীর ভূত্বকে, ইগনিয়াস পাথর বা আগ্নেয় শিলা এবং সমুদ্রের পানিতে প্রচুর স্বর্ণের ক্ষুদ্র কণা মিশে আছে। ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটি, বার্কলের মতে, ভূত্বকে স্বর্ণের ঘনত্ব প্রতি বিলিয়নে মাত্র ৪ ভাগ। অর্থাৎ ১ মেট্রিক টন মাটিতে মাত্র ০.০০৪ গ্রাম স্বর্ণ থাকে!
দ্য রয়্যাল মিন্টের হিসাব বলছে, পৃথিবীর ওপরের স্তরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা এই স্বর্ণের কণা একসঙ্গে করলে তার ওজন দাঁড়াবে প্রায় ৪৪ কোটি ১০ লাখ টন! কিন্তু এই স্বর্ণ এতই ক্ষুদ্র যে এগুলো বাণিজ্যিকভাবে আলাদা করে বের করে আনা অসম্ভব।
পৃথিবীর পেটের ভেতরের গুপ্তধন
এতক্ষণ যে লাখ লাখ আর কোটি কোটি টন স্বর্ণের গল্প শুনলে, তা শুনে যদি তোমার চোখ কপালে ওঠে, তবে এবার আসল ধাক্কাটা খাওয়ার জন্য প্রস্তুত হও! ভূতত্ত্ববিদেরা বলছেন, পৃথিবীর ওপরের স্তরে থাকা এই সব স্বর্ণ মিলে পুরো পৃথিবীর মোট স্বর্ণের মাত্র ১ শতাংশ!
বাকি ৯৯ শতাংশ স্বর্ণ কোথায় জানো? সেগুলো বন্দী হয়ে আছে পৃথিবীর একদম কেন্দ্রে! অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ ইউনিভার্সিটির ভূতত্ত্ববিদ ক্রিস ভয়সি জানান, পৃথিবীর কেন্দ্রে এত বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ জমা আছে যে তা দিয়ে তুমি পুরো পৃথিবীকে ১.৬ ফুট পুরু নিরেট স্বর্ণের চাদরে মুড়িয়ে দিতে পারবে!
কিন্তু স্বর্ণ কেন কেন্দ্রে চলে গেল? পৃথিবী যখন তৈরি হচ্ছিল, তখন পুরো গ্রহটি ছিল বিশাল ফুটন্ত লাভার গোলক। যেহেতু স্বর্ণ অত্যন্ত ভারী এবং ঘন ধাতু, তাই মাধ্যাকর্ষণের টানে ভারী লোহা ও নিকেলের সঙ্গে বেশির ভাগ স্বর্ণই পৃথিবীর একেবারে গভীরে তলিয়ে যায়।
তাহলে আমরা মাটির ওপরে যে স্বর্ণ পাই, সেগুলো কোথা থেকে এল? আজ থেকে প্রায় ৪১০ থেকে ৩৮০ কোটি বছর আগে পৃথিবীতে মহাকাশ থেকে উল্কাপিণ্ডের এক ভয়ংকর বৃষ্টি শুরু হয়েছিল। একে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে লেট হেভি বম্বার্ডমেন্ট। উল্কাপাতের এই প্রচণ্ড হামলায় পৃথিবীর ভরের মাত্র ০.৫ ভাগ যুক্ত হয়েছিল।
মহাকাশ থেকে এখন আর নতুন করে স্বর্ণ আসার সম্ভাবনা প্রায় শূন্য। পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়াগুলোই এখন পুরোনো স্বর্ণকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরিয়ে খনি তৈরি করছে।
কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, উল্কার সঙ্গে মহাকাশ থেকে আসা এই স্বর্ণ আর পৃথিবীর কেন্দ্রে তলিয়ে যেতে পারেনি। কারণ, তত দিনে পৃথিবীর ওপরের স্তর ঠান্ডা হয়ে শক্ত পাথরে পরিণত হয়েছিল। অর্থাৎ আজ তুমি হাতের আংটি বা গলার চেইনে যে স্বর্ণ পরে আছ, তা আসলে কোটি কোটি বছর আগে মহাকাশ থেকে উল্কার পিঠে চড়ে আমাদের পৃথিবীতে এসে আছড়ে পড়েছিল!
ক্রিস ভয়সি বলেছেন, মহাকাশ থেকে এখন আর নতুন করে স্বর্ণ আসার সম্ভাবনা প্রায় শূন্য। পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়াগুলোই এখন পুরোনো স্বর্ণকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরিয়ে খনি তৈরি করছে।
পৃথিবীর কেন্দ্রে থাকা ওই অকল্পনীয় স্বর্ণের ভান্ডারে মানুষ কোনো দিনই পৌঁছাতে পারবে না। আর ভূত্বকে ঠিক কতটুকু স্বর্ণ এখনো মানুষের চোখের আড়ালে লুকিয়ে আছে, তা একেবারে নিখুঁতভাবে মাপাও সম্ভব নয়!