কিছু মানুষ কেন মাটি বা সাবান খায়
২০১২ সাল। ৩২ বছরের এক যুবক চিকিৎসকের কাছে এলেন অদ্ভুত এক সমস্যা নিয়ে। তিনি নাকি কাচ চিবিয়ে খান! না, তিনি কোনো জাদুকর নন। সার্কাসেও খেলা দেখান না। ১০ বছর ধরে এই যুবক নাকি কাচের টুকরা চিবিয়ে খেয়ে ফেলছেন।
ওই যুবক চিকিৎসকদের জানান, কাচ না খেলে তাঁর অস্থির লাগে, মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়। অনেকটা নেশার মতো। সারা দিন মুখে কাচের টুকরা রাখেন, তারপর সময়–সুযোগ বুঝে গিলে ফেলেন। চিকিৎসকেরা এমআরআই করে দেখলেন, তাঁর মস্তিষ্কে কিছু ক্ষত বা সমস্যা আছে। সমস্যার সমাধান পাওয়া গেল। মস্তিষ্কের সমস্যার কারণেই সে এমন অদ্ভুত আচরণ করেছে।
কাচ খাওয়া যুবকের ঘটনাটি বিরল হলেও একদম নতুন নয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই অদ্ভুত রোগটির নাম ‘পিকা’। এই রোগে আক্রান্ত মানুষ এমন সব জিনিস খেতে শুরু করে, যা আসলে কোনো খাবারই নয়। এসব খাবারে কোনো পুষ্টিগুণও থাকে না।
পিকা শব্দটি এসেছে লাতিন শব্দ ‘পিকা পিকা’ থেকে। এর মানে ম্যাগপাই বা একধরনের দোয়েল–জাতীয় পাখি। এই পাখিরা যা পায়, তা-ই খাওয়ার চেষ্টা করে। মানুষের এই অদ্ভুত স্বভাবের সঙ্গে মিল রেখেই এই রোগের এমন নামকরণ করা হয়েছে।
পিকা রোগীদের খাবারের তালিকা দেখলে তোমার চোখ কপালে উঠবে। মাটি, কাদা, রং, সাবান, শ্যাম্পু, কাগজ, চক, চাল, স্পঞ্জ, ঘাস, পাতা, পেনসিল, কয়েন, এমনকি সিগারেটের শেষ অংশ বা পোড়া দিয়াশলাইয়ের কাঠিও আছে সেই তালিকায়!
মজার ব্যাপার হলো কী খাচ্ছে তার ওপর ভিত্তি করে বিজ্ঞানে এগুলোর আলাদা নামও আছে। যেমন মাটি খাওয়াকে বলে ‘জিওফ্যাজি’। টানা কয়েক মাস ধরে প্রচুর বরফ চিবিয়ে খাওয়াকে বলে ‘প্যাগোফ্যাজি’। দিয়াশলাইয়ের পোড়া বারুদ খাওয়াকে বলে ‘কটোপাইরিওফ্যাজি’। যারা একাধিক অখাদ্য একসঙ্গে খায়, তাদের বলে ‘প পলিপিকা’।
ছোট বাচ্চাদেরও কিন্তু একই স্বভাব। ওরাও হাতের কাছে যা পায়, তা-ই মুখে দেয়। এটা ওদের বড় হওয়ার বা জগৎ চেনার একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া; কিন্তু পিকা আলাদা রোগ। কোনো মানুষের এই অখাদ্য খাওয়ার অভ্যাস যদি এক মাসের বেশি স্থায়ী হয় এবং তা তার বয়স বা সংস্কৃতির সঙ্গে বেমানান হয়, তবেই একে রোগ বলা যাবে।
অবশ্য কিছু দেশে গর্ভবতী নারী বা কিশোরীদের মধ্যে মাটি বা বিশেষ ধরনের কাদা খাওয়ার প্রথা আছে। বাংলাদেশের মানুষও কিন্তু মাটি খায়। প্রথম আলোর ‘জানেন কি সিলেট অঞ্চলের কিছু এলাকায় এখনো মানুষ মাটির বিস্কুট খায়’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিলেট অঞ্চলের কিছু মানুষ এখনো মাটির তৈরি বিস্কুট খায়। এই বিস্কুটকে তারা বলে ‘ছিকর’। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে এখন নাকি বিদেশেও বিক্রি হচ্ছে এই মাটির বিস্কুট। তবে এটা কিন্তু রোগ নয়, হয়তো ঐতিহ্য।
অনেক দেশের মানুষ মনে করে, (শুধু বাংলাদেশিরা নয়) মাটি খেলে শরীরের খনিজ ঘাটতি মেটে। ২০২৫ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ইথিওপিয়ায় যেসব নারী গর্ভাবস্থায় মাটি খেয়েছে, তাদের শরীরে মারাত্মক পরজীবী বা কৃমির সংক্রমণ হয়েছে।
কোন বয়সীদের এই রোগ বেশি হয়
১৮ মাস থেকে ৬ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে এই রোগ সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। তবে জাতি–ধর্ম–বর্ণনির্বিশেষে যেকোনো বয়সের মানুষেরই এটা হতে পারে। সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া কঠিন। কারণ, অনেকেই লজ্জায় এই অভ্যাসের কথা স্বীকার করতে চান না। তবে কিছু গবেষণার ফলাফল পাওয়া গেছে। ২০১৮ সালের এক সুইস গবেষণায় দেখা গেছে, ১ হাজার ৪৩০ জন শিশুর মধ্যে প্রায় ১০ শতাংশের মধ্যে পিকার লক্ষণ পাওয়া গেছে। ২০১৬ সালের একটি মেটা-অ্যানালাইসিস বলছে, প্রায় ২৮ শতাংশ গর্ভবতী নারী এই সমস্যায় ভুগেছেন।
এই রোগ কেন হয়
এর নির্দিষ্ট কোনো কারণ নেই। তবে বিজ্ঞানীরা প্রধান কিছু কারণ খুঁজে পেয়েছেন। যেমন পুষ্টির অভাবে এই রোগ হতে পারে। শরীরে আয়রন বা জিংকের মারাত্মক অভাব থাকলে মানুষ বরফ, কাগজ বা মাটি খেতে শুরু করতে পারে। রক্তশূন্যতা বা অ্যানিমিয়া এর বড় কারণ। চরম দারিদ্র্য, অবহেলা, ছোটবেলায় নির্যাতনের শিকার কিংবা অতিরিক্ত মানসিক চাপ থেকে শিশুদের মধ্যে পিকা দেখা দিতে পারে।
কাঁচ খাওয়া ওই যুবকের মতো মস্তিষ্কের কোনো গঠনগত সমস্যা বা বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধকতা থেকেও হতে পারে এই রোগ।
এই রোগে বিপদ কতটা
শুনতে মজার মনে হলেও পিকা কিন্তু প্রাণঘাতী হতে পারে। পেটের ভেতর অখাদ্য জমে অন্ত্র ফুটো হয়ে যেতে পারে বা ব্লক হতে পারে। রং বা সিসা–জাতীয় জিনিস খেলে হতে পারে বিষক্রিয়া। মাটি বা কাদা থেকে শরীরে ভয়ংকর সব জীবাণু ও পরজীবী ঢুকতে পারে। দীর্ঘদিন অখাদ্য খেলে শরীরে মারাত্মক অপুষ্টি দেখা দেয়।
এই রোগের চিকিৎসা কী
লজ্জা পেয়ে বিষয়টি লুকিয়ে রাখা বোকামি। পিকা ধরা পড়লে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। চিকিৎসার শুরুতে সাধারণত রোগীর আশপাশ থেকে ওই অখাদ্যবস্তুটি সরিয়ে ফেলা হয়। এরপর দেখা হয় সমস্যাটি কি শারীরিক, নাকি মানসিক। সেই অনুযায়ী পুষ্টিকর খাবার, সাপ্লিমেন্ট কিংবা সাইকোলজিক্যাল কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে রোগীকে সুস্থ করে তোলা হয়।
তাই তোমার আশপাশে কেউ যদি লুকিয়ে মাটি, চাল বা অদ্ভুত কিছু খায়; তাকে নিয়ে হাসাহাসি না করে ডাক্তারের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দাও। হয়তো আসলেই তার সাহায্যের দরকার!
(সতর্কীকরণ: এই লেখা কেবল সচেতনতার জন্য। যেকোনো শারীরিক সমস্যায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নাও।)
সূত্র: আইএফএল সায়েন্স