বাংলাদেশ ডুবছে, না পলি জমে তৈরি হচ্ছে নতুন ভূমি
জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার বাংলাদেশ। এই দেশের ভূমি কি সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় তলিয়ে যাচ্ছে, নাকি প্রকৃতির বিস্ময়কর এক প্রক্রিয়ায় জেগে উঠছে নতুন ভূমি?
বাংলাদেশ ডুবছে, না পলি জমে তৈরি হচ্ছে নতুন ভূমি
দীর্ঘদিন ধরে জলবায়ু পরিবর্তনের আলোচনায় বাংলাদেশ একটি 'অসহায় দেশ'। জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় বাংলাদেশ প্রথমদিকে থাকছে। ক্লাইমেট রিক্স ইনডেক্সসহ বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের ১৭ থেকে ২০ শতাংশ ভূমি সমুদ্রে তলিয়ে যাবে।
নাসার উপগ্রহ চিত্র এবং অন্যান্য বৈজ্ঞানিক গবেষণা বলছে, ব্যাপারটি এতটা সরল না। সমুদ্রের উচ্চতা বাড়ায় বাংলাদেশ যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, একইভাবে হিমালয় থেকে আসা পলির সাহায্যে প্রতিমুহূর্তে নতুন ভূমি গঠন করছে।
হিমালয় থেকে আসা পলি দিয়ে নতুন ভূমি
বাংলাদেশ মূলত গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদী ব্যবস্থার এক বিশাল সক্রিয় বদ্বীপ। প্রতিবছর এই নদীগুলো হিমালয় থেকে প্রায় ১০০ কোটি টন পলি বয়ে আনে।
সায়েন্টিফিক আমেরিকানে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ একটি সক্রিয় ডেল্টা বা জীবন্ত বদ্বীপ। এটি কেবল একটি নিচু ভূমি না। সমুদ্রের পানির উচ্চতা বাড়ার কারণে বদ্বীপটি তলিয়ে যাবে এমন না, বরং এটি এমন এক বদ্বীপ, যা সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজের ভূমি উঁচু করতে সক্ষম। এ কারণেই বাংলাদেশ এখনও তলিয়ে যায়নি।
উপগ্রহ চিত্র যা বলছে
নাসার দীর্ঘমেয়াদি স্যাটেলাইট তথ্য এবং বাংলাদেশের গবেষকদের সংগ্রহ করা তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক দশকে বাংলাদেশ নদী ভাঙনে যতটুকু জমি হারিয়েছে, তার চেয়ে বেশি জমি বঙ্গোপসাগরের মোহনায় জেগে উঠেছে।
নাসা আর্থ অবজারভেটরির তথ্য মতে, উপগ্রহ থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র বদ্বীপের স্থলভাগ আসলে বাড়ছে। নদী থেকে আসা পলির পরিমাণ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির হারের চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে বেশি।
মোট ১০০০ বর্গকিলোমিটার নতুন জমি
বাংলাদেশের সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস) গত ৪০ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে এক অভাবনীয় ফল পেয়েছে। ১৯৭৩ থেকে ২০১৩/২০১৪ সাল পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য মতে, বাংলাদেশ প্রায় ১৭০০ বর্গকিলোমিটার নতুন ভূমি পেয়েছে। প্রায় ৭০০ বর্গকিলোমিটার ভূমি হারিয়েছে। যার ফলে মোট ১০০০ বর্গকিলোমিটার ভূমি যুক্ত হয়েছে।
সায়েন্টিফিক আমেরিকানের প্রতিবেদনে সিইজিআইএস-এর প্রধান গবেষক ড. মমিনুল হক সরকারকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, তিনি বলেছেন, ‘আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে, গত চার দশকে বাংলাদেশে প্রায় ১০০০ বর্গকিলোমিটারেরও বেশি নিট ভূমি যুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ ভাঙনের চেয়ে নতুন ভূমি গড়ার হার অনেক বেশি।’
প্রকৃতির সুরক্ষা পাচ্ছে বাংলাদেশ
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে এটি সত্য। কিন্তু একই সঙ্গে নদীর পলি জমে জমি উঁচু হচ্ছে। একে বলে 'ভার্টিক্যাল অ্যাক্রিশন'। সমুদ্রের পানির উচ্চতা যখন এক সেন্টিমিটার বাড়ে, পলি জমে ভূমি যদি এক সেন্টিমিটার বা তার বেশি উঁচু হয়, তবে সেই ভূমি ডুবে যাওয়ার ভয় থাকে না।
গবেষকদের মতে, প্রকৃতি নিজেই এখানে বাঁধ তৈরি করছে। যদি নদীর পলির প্রবাহকে আমরা বাধাগ্রস্ত না করি, তবে এই বদ্বীপ প্রাকৃতিক নিয়মেই সমুদ্রের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে টিকে থাকবে। তবে বাস্তবে লবণ পানি ঠেকানোর জন্য বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকায় বাঁধ দেওয়া হচ্ছে। ফলে এসব অঞ্চলের নিচু ভূমিগুলো ডুবছে।
ডেল্টা প্ল্যান ২১০০
ভূমি পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে বাংলাদেশ সরকার গ্রহণ করেছে 'বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০'। এই মহাপরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো পলি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নতুন ভূমি উদ্ধার করা এবং সমুদ্রের লবণাক্ততা রোধ করা।
ডেল্টা প্ল্যান ২১০০-এ বলা হয়েছে, সঠিক পলি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আমরা শুধু বর্তমান ভূমি রক্ষাই করব না, বরং সমুদ্রের বুক থেকে আরও নতুন ভূখণ্ড উদ্ধার করব। যা দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার আবাসন ও কৃষিতে বড় ভূমিকা রাখবে।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ ধীরে ধীরে ডুবছে এটা সত্যি। নিচু এলাকাগুলো ঝুঁকির মুখে আছে। কিন্তু বাংলাদেশ নতুন ভূমি পাচ্ছে কি না, এই প্রশ্নের উত্তর হলো, বাংলাদেশ নতুন নতুন ভূমি পাচ্ছে। হিমালয়ের পলি আর বঙ্গোপসাগরের ঢেউয়ের বিপরীতমুখী বল প্রয়োগে প্রাকৃতিকভাবে এই বদ্বীপে জেগে উঠছে নতুন ভূমি।
সূত্র: নাসা ও সায়েন্টিফিক আমেরিকান