পৃথিবীর সব মশা মেরে ফেললে কী হবে

এডিস ইজিপ্টাই প্রজাতির মশাকে ওলবাকিয়া নামের একটি ব্যাকটেরিয়া দিয়ে সংক্রমিত করা হলে এই প্রজাতির মশার সংখ্যা কমে যেতে পারে বা তারা ডেঙ্গু ভাইরাস ছড়াতে অক্ষম হয়ে পড়তে পারেছবি: এএফপি ফাইল ছবি

মানব ইতিহাসের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত অনেক যুদ্ধ ও সংঘাত হয়েছে। এসব লড়াইয়ে সব মিলিয়ে প্রায় ১০০ কোটি মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। তবে মশার কামড়ে মৃত্যুর তুলনায় এই সংখ্যা আসলে অনেক কম। বিখ্যাত ‘নেচার’ জার্নালের একটি গবেষণাপত্রে বলা হয়, গত ৫০ হাজার বছরে পৃথিবীতে যত মানুষ বেঁচে ছিল, তাদের প্রায় অর্ধেকই মারা গেছে মশার কারণে। আর এই বিপুলসংখ্যক মৃত্যুর পেছনে মূল দায়ী মশার মাধ্যমে ছড়ানো রোগ ম্যালেরিয়া।

ম্যালেরিয়া মূলত একটি এককোষী পরজীবীর কারণে হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুসারে, প্রতিবছর পৃথিবীতে ২৮ কোটির বেশি মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হয়। একই সঙ্গে ম্যালেরিয়ার কারণে বছরে ছয় লাখের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। এই মৃত্যুর সিংহভাগই ঘটে আফ্রিকান অঞ্চলে।

ম্যালেরিয়ার পাশাপাশি জিকা, ওয়েস্ট নাইল ও ডেঙ্গুর মতো মারাত্মক সব ভাইরাস ছড়ানোর মূল কাজটি করে মশা। ‘প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেস’ জার্নালে প্রকাশিত ২০২০ সালের একটি গবেষণা অনুযায়ী, আফ্রিকার গ্রামাঞ্চলে সচরাচর দেখা যাওয়া ‘অ্যানোফিলিস গ্যাম্বি’ মশা পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রাণীর প্রজাতি।

আরও পড়ুন

মশা যেহেতু মানবজাতির জন্য এত বড় এক হুমকির নাম, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই অনেকে মনে করেন, আমাদের কি পৃথিবীর সব মশাকে মেরে ফেলা উচিত? আর যদি সত্যিই এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তবে বাস্তুতন্ত্রের ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়বে?

মশা তাড়ানোর স্প্রে হাতে নেওয়ার আগে একটি জরুরি বিষয় জেনে রাখা ভালো। সব মশা কিন্তু আমাদের জন্য বিপজ্জনক নয়। মশা নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা ‘মসকুইটো জো’–এর তথ্য অনুযায়ী, যেসব মশা মাঝেমধ্যে আমাদের ক্ষতি করে, এরাও কিন্তু সাধারণত মানুষের রক্ত খায় না; বরং এরা গাছের রস ও ফুলের মধু খেতেই বেশি পছন্দ করে।

মশা
প্রতীকী ছবি

পৃথিবীতে মশার প্রজাতির সংখ্যা কত হতে পারে? স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সেন্টার ফর ভাইরাস রিসার্চ’–এর অধ্যাপক স্টিভেন সিনকিন্স জানান, বিশ্বে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ প্রজাতির মশা রয়েছে। তবে আশার কথা হলো, এর মধ্যে মাত্র ১০০টির মতো প্রজাতি মানুষকে কামড়ায় ও রোগ ছড়ায়।

‘এনটোমলজি টুডে’–এর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘কুলিসেটা’ নামের মশা প্রায়ই মানুষকে কামড়ায়, কিন্তু এদের মাধ্যমে কোনো মারাত্মক রোগ ছড়ানোর রেকর্ড নেই। অন্যদিকে ‘টক্সোরিঙ্কাইটিস’ নামের মশার প্রজাতিটি সারা বিশ্বেই খুব সাধারণ। এরা মূলত বনজঙ্গলে বাস করে। এই মশাগুলো রক্তের চেয়ে ফুলের মধু খেতেই বেশি ভালোবাসে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবী থেকে সব মশা মারার কোনো দরকার নেই। শুধু মানুষের ক্ষতি করে, এমন কিছু বিপজ্জনক মশা দূর করলেই চলবে। যেমন ‘এডিস ইজিপ্টি’ মশা ডেঙ্গু ও জিকার মতো রোগ ছড়ায়। এই মশা আগে শুধু আফ্রিকায় ছিল। কিন্তু প্রাচীনকালে দাস ব্যবসা, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সৈন্যদের যাতায়াতের কারণে এটি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। এ ছাড়া ‘অ্যানোফিলিস’ ও ‘কিউলেক্স’ নামের আরও দুটি মশার প্রজাতি ম্যালেরিয়ার মতো মারাত্মক রোগ ছড়ায়।

বিজ্ঞানীদের কাছে এই ক্ষতিকর মশাগুলো ধ্বংস করার জন্য দারুণ কিছু উপায় আছে। বিজ্ঞানীরা ল্যাবরেটরিতে মশার শরীরে ‘ওলবাকিয়া’ নামের একটি বিশেষ ব্যাকটেরিয়া ঢুকিয়ে দেন, যা মানুষের জন্য একদম ক্ষতিকর নয়। এই ব্যাকটেরিয়া মশার পেটে ডেঙ্গু বা জিকা ভাইরাসের বংশবৃদ্ধি আটকে দেয়। ফলে ওলবাকিয়া থাকা মশাগুলো মানুষকে কামড়ালেও এদের শরীর থেকে কোনো ক্ষতিকর ভাইরাস মানুষের রক্তে ছড়াতে পারে না।

আইসল্যান্ড একসময় পৃথিবীর একমাত্র দেশ ছিল যেখানে কোনো মশা ছিল না
ছবি: বিবিসি

যদি শুধু ক্ষতিকর মশাগুলোকে আলাদা করে মারা সম্ভব না হয়, তবে পৃথিবীর সব মশাকে একবারে ধ্বংস করে দেওয়া কি ঠিক হবে? বিজ্ঞানীরা মনে করেন, নির্দিষ্ট প্রজাতি ধরে মশা মারাটাই সবচেয়ে ভালো উপায়। কারণ, আফ্রিকা, এশিয়া বা দক্ষিণ আমেরিকায় ম্যালেরিয়া ছড়ানোর জন্য আলাদা আলাদা প্রজাতির মশা দায়ী। তবে এই পদ্ধতি নিয়ে আরও অনেক গবেষণার প্রয়োজন।

তাহলে পৃথিবীর সব মশাকে যদি একবারে ধ্বংস করে দেওয়া হয়, তবে কী ঘটবে? এর সঠিক উত্তর বিজ্ঞানীরাও পুরোপুরি জানেন না। কারণ, মশা হলো ব্যাঙ, মাছ, পাখি, বাদুড় ও ফড়িংয়ের মতো অনেক প্রাণীর প্রধান খাবার। একটি ফড়িং দিনে প্রায় ১০০টি মশা খায়। সব মশা হঠাৎ গায়েব হয়ে গেলে এই প্রাণীগুলোর খাবারে অভাব হবে। এতে এদের টিকে থাকার জন্য অন্য খাবার খুঁজতে হবে। এতে পরিবেশের ক্ষতি হতে পারে।

আরও পড়ুন

পরিবেশের কিছুটা ক্ষতি হওয়ার ভয় থাকলেও বিশেষজ্ঞরা একটি বিষয়ে একমত। তাঁরা মনে করেন, সব মশা মারার ফলে যদি পৃথিবী থেকে ম্যালেরিয়ার মতো মারাত্মক রোগ চিরতরে দূর হয় এবং প্রতিবছর লাখ লাখ মানুষের প্রাণ বাঁচে, তবে সব মশাকে মেরে ফেলাই হবে মানবজাতির জন্য সবচেয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত।

ফড়িং মূলত মশা, মাছি, মৌমাছি, ছোট পোকামাকড় ইত্যাদি খেয়ে থাকে।
ছবি: হাফিজুন নাহার

মশাবিহীন একটি পৃথিবীর কথা ভাবলে অনেকেরই বেশ ভালো লাগতে পারে। ১৮২৬ সালের আগে হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে কোনো মশার অস্তিত্বই ছিল না। কিন্তু একটি বিদেশি জাহাজের মাধ্যমে সেখানে প্রথম মশা চলে আসে। বর্তমানে আইসল্যান্ডেও মশার দেখা মিলেছে। এত দিন পৃথিবীতে মশাহীন জায়গা ছিল মাত্র দুটি। বরফের দেশ অ্যান্টার্কটিকা ও আইসল্যান্ড। এখন মশাহীন জায়গা রইল শুধু অ্যান্টার্কটিকা। তবে মশা নেই, এমন দেশ কিন্তু আর রইল না।

তাই সব মশা যদি একবারে বিলুপ্ত হয়ে যায়, তবে প্রকৃতির খাদ্যশৃঙ্খলে একটা বড় ধাক্কা লাগবে। কারণ, অনেক প্রজাতির মশা মানুষের কোনো ক্ষতিই করে না, উল্টো এরা অন্য প্রাণীদের খাবার হয়ে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখে। শেষ পর্যন্ত মশা পুরোপুরি নির্মূল করা আদৌ সম্ভব কি না, তা নিয়ে এখনো বিজ্ঞানীদের অনেক কিছুই অজানা।

সূত্র: লাইভসায়েন্স, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক
আরও পড়ুন