৩২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিসহ স্যার ডেভিড অ্যাটেনবরোকে নিয়ে ১০ তথ্য
স্যার ডেভিড অ্যাটেনবরো বর্তমান বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় প্রকৃতিবিদ ও তথ্যচিত্র নির্মাতা। প্রায় আট দশকের দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি লাইফ অন আর্থ ও দ্য ব্লু প্ল্যানেট–এর মতো বিশ্বখ্যাত সব তথ্যচিত্র তৈরি করেছেন। তাঁর কাজগুলো যেমন দর্শকপ্রিয়, তেমনি শিক্ষণীয়। এক শতাব্দীর এই দীর্ঘ জীবনে তিনি অর্জন করেছেন অসংখ্য সাফল্য। চলো, তাঁর জন্মশতবর্ষে তাঁর জীবনের এমন ১০ অজানা তথ্য জেনে নিই, যা হয়তো তোমরা আগে কখনো শোনোনি।
১. প্রাণীদের প্রতি ভালোবাসার শুরু যেভাবে
প্রকৃতির প্রতি তাঁর এই ভালোবাসা শুরু হয়েছিল শৈশবে পড়া একটি বই থেকে। মার্কিন লেখক আর্নেস্ট থম্পসন সেটনের লেখা ওয়াইল্ড অ্যানিমেলস আই হ্যাভ নোন বইটিই তাঁর মনে প্রাণিজগতের প্রতি আগ্রহ তৈরি করেছিল।
২. তাঁর প্রিয় প্রাণী কোনটি
স্যার ডেভিড অ্যাটেনবরোর প্রিয় প্রাণীর তালিকাটি বেশ দীর্ঘ ও তিনি প্রায়ই এটি পরিবর্তন করেন। একবার লন্ডনের কিংস্টনে এক অনুষ্ঠানের আলাপকালে তিনি জানিয়েছিলেন, সেই সময়ের জন্য তাঁর প্রিয় প্রাণী ছিল উইডি সিড্রাগন (Weedy Seadragon)। দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার উপকূলে তিনি এই অদ্ভুত সুন্দর প্রাণীটি নিয়ে গবেষণা ও চিত্রগ্রহণ করেছিলেন।
৩. ইঁদুর তাঁর মোটেও পছন্দ নয়
পুরো পৃথিবী যার কাছে অভয়ারণ্য, সেই অ্যাটেনবরো কিন্তু ইঁদুর একদম সহ্য করতে পারেন না। যদিও তিনি মনে করেন, সব প্রাণীরই সম্মান প্রাপ্য। কিন্তু ইঁদুর দেখলে তিনি অস্বস্তিতে পড়ে যান। এই ভয়ের শুরু হয়েছিল বহু আগে সলোমন দ্বীপপুঞ্জে এক অভিযানের সময়। প্রচণ্ড বজ্রবৃষ্টির রাতে একটি খড়ের কুঁড়েঘরে ঘুমানোর সময় তিনি অনুভব করেন, তাঁর পায়ের ওপর দিয়ে কিছু একটা চলে যাচ্ছে। টর্চ জ্বালিয়ে তিনি দেখেন কেবল একটি নয়, বিছানা আর মেঝেজুড়ে অনেকগুলো ইঁদুর ছোটাছুটি করছে। সেই রাতের অভিজ্ঞতা থেকে তাঁর মনে ইঁদুরের ভয়।
৪. তাঁর দেখা সবচেয়ে বিরল প্রাণী
স্যার ডেভিডের দেখা সবচেয়ে বিরল প্রাণীটি ছিল গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জের সেই বিখ্যাত কচ্ছপ লোনসাম জর্জ। ২০১২ সালের ২৪ জুন মারা যাওয়ার আগে এটিই ছিল এর প্রজাতির শেষ বেঁচে থাকা সদস্য। প্রায় ১০০ বছর ধরে এই প্রজাতির কচ্ছপকে বিলুপ্ত মনে করা হলেও বিজ্ঞানীরা হঠাৎ জর্জকে খুঁজে পান।
৫. তিনি লন্ডন ছাড়া অন্য কোথাও থাকেন না
পুরো জীবন বিশ্বজুড়ে ভ্রমণ করে কাটালেও স্যার ডেভিড অ্যাটেনবরো থাকতে পছন্দ করেন নিজের শহর লন্ডনে। ৭০ বছরের বেশি সময় ধরে তিনি এই শহরেই বসবাস করছেন। ওয়াইল্ড লন্ডন ডকুমেন্টারিতে তিনি লন্ডনের বৈচিত্র্যময় প্রকৃতিকে তুলে ধরেছেন। লন্ডনের প্রকৃতি নিয়ে তৈরি সেই তথ্যচিত্রেই তিনি প্রকাশ করেছেন তাঁর ভালো লাগার কথা।
৬. বিবিসি তাঁর জীবনের প্রথম চাকরির আবেদনই গ্রহণ করেনি
শুনলে অবাক লাগবে, আজ যিনি বিবিসির সবচেয়ে পরিচিত মুখ, ক্যারিয়ারের শুরুতে তাঁকেই এই সংস্থা ফিরিয়ে দিয়েছিল। ১৯৫২ সালে তিনি রেডিও প্রযোজক পদের জন্য আবেদন করেছিলেন। কিন্তু তাঁর হাতে লেখা আবেদনপত্রটি প্রত্যাখ্যাত সিল মেরে বাতিল করে দেওয়া হয়। অবশ্য বিবিসি খুব দ্রুতই তাদের ভুল বুঝতে পারে এবং সেই বছরের শেষ দিকেই তাঁকে চাকরিতে নিয়োগ দেয়। এর কয়েক বছর পর, ১৯৬৫ সালে তিনি বিবিসি-টু চ্যানেলের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পান।
৭. নেই কোনো গাড়ি, সে জন্য শেখা হয়নি ড্রাইভিং
টেলিভিশনের পর্দায় তাঁকে সারাক্ষণ দেখা গেলেও বাস্তব জীবনে স্যার ডেভিডের নিজের কোনো গাড়ি নেই। এর কারণটি বেশ মজার। তিনি কখনো ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষাতেই পাস করতে পারেননি। তাঁর মতে, তাঁর কখনো গাড়ি চালানোর প্রয়োজনই পড়েনি। কর্মজীবনের দীর্ঘ সময় তিনি বিমানে সাধারণ বা ইকোনমি ক্লাসে ভ্রমণ করতেন, যাতে তিনি তাঁর সহকর্মী ও ক্যামেরাম্যানদের সঙ্গে থাকতে পারেন। তবে বয়স ৭৫ বছর হওয়ার পর বিবিসি তাঁকে বিজনেস ক্লাসে ভ্রমণের সুযোগ দেয়।
৮. হৃদ্যন্ত্রে বসানো পেসমেকার
ক্লান্তিহীন মানুষটির শরীরও মাঝেমধ্যে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০১৩ সালে হার্টে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তাঁর শরীরে একটি পেসমেকার বসানো হয়। এর দুই বছর পর তাঁর দুই হাঁটুতেই অস্ত্রোপচার বা নিরিপ্লেসমেন্ট করতে হয়। তবু তিনি কাজ থামাননি। তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, ‘যদি আমাকে কয়লাখনিতে কাজ করতে হতো, তবে হয়তো অবসরের কথা ভাবতাম। কিন্তু আমি তো বিশ্বজুড়ে প্রকৃতির সব চমৎকার আর অদ্ভুত রহস্য দেখে বেড়াই, আমি কতই–না ভাগ্যবান।’
৯. ৩২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি
কেবল ১৯৮৫ ও ২০২২ সালে পাওয়া দুটি নাইট উপাধিতেই তাঁর অর্জন সীমাবদ্ধ নেয়। স্যার ডেভিড এ পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন নামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রেকর্ড ৩২টি সম্মানসূচক ডিগ্রি লাভ করেছেন। অক্সফোর্ড ও কেমব্রিজের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো তাঁর বিজ্ঞানের প্রচার ও শিক্ষাক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এই সম্মাননা দিয়েছে, যা অনেক নোবেল বিজয়ী বা বিশ্বনেতার অর্জনের চেয়ে বেশি।
১০. তাঁর নামে যত প্রাণী ও উদ্ভিদ
প্রকৃতি ও বিজ্ঞানে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে স্যার ডেভিড অ্যাটেনবরোর নামে এখন পর্যন্ত জীবিত ও বিলুপ্ত মিলিয়ে ৫০টির বেশি প্রজাতির নামকরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে যেমন আছে কয়েক কোটি বছর আগের ডাইনোসর ও প্রাগৈতিহাসিক মাছ, তেমনি আছে বর্তমান সময়ের নানা প্রজাপতি, মাকড়সা ও গাছপালা। বিশ্বের বিভিন্ন দুর্গম অঞ্চলে এসব বিচিত্র প্রাণের সন্ধান পাওয়া গেছে।
তাঁর নামে নামকরণ করা উল্লেখযোগ্য কিছু প্রাণী ও উদ্ভিদ:
অ্যাটেনবরোসরাস (Attenborosaurus)
জুরাসিক যুগের একধরনের বিশালাকার সামুদ্রিক সরীসৃপ।
অ্যাটেনবরো একিডনা (Attenborough's echidna)
এটি বিলুপ্তপ্রায় একধরণের স্তন্যপায়ী প্রাণী।
ইউপ্টিচিয়া অ্যাটেনবরোই (Euptychia attenboroughi)
অ্যামাজন জঙ্গলে পাওয়া এক বিশেষ প্রজাতির রঙিন প্রজাপতি।
নেপেন্থেস অ্যাটেনবরোই (Nepenthes attenboroughii)
ফিলিপাইনে পাওয়া একধরনের বিশালাকার পতঙ্গভুক গাছ।
হায়ারাসিয়াম অ্যাটেনবরোইয়ানাম (Hieracium attenboroughianum)
যুক্তরাজ্যের ওয়েলসে পাওয়া এক প্রজাতির বিশেষ উদ্ভিদ।
এ ছাড়া ইন্দোনেশিয়ার ছোট পোকা, অস্ট্রেলিয়ার গিরগিটি ও তাসমানিয়ার রঙিন শামুকের নামও তাঁর নামে রাখা হয়েছে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, তাঁর সম্মানে এই নামকরণগুলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে প্রকৃতি রক্ষায় উৎসাহিত করবে।