স্মার্টফোনের দিন কি শেষ, মাস্ক–গেটস–জাকারবার্গ যা বলছেন
খুব বেশি আগের কথা নয়, এই তো কিছুকাল আগে ফোন ছিল শুধু কথা বলার মাধ্যম। ধীরে ধীরে সেই ছোট যন্ত্রই হয়ে উঠল ক্যামেরা, ক্যালেন্ডার, মানচিত্র, বই, টিভি, ব্যাংক। এই বদল এনেছে মূলত স্মার্টফোন। গত তিন দশকে মানুষের ব্যক্তিগত প্রযুক্তির অভিজ্ঞতা সবচেয়ে বেশি বদলে দিয়েছে এই একটিমাত্র যন্ত্র।
এখন প্রযুক্তি দুনিয়ার সবচেয়ে প্রভাবশালী তিনজন হলেন ইলন মাস্ক, বিল গেটস ও মার্ক জাকারবার্গ। তাঁরা বলছেন, স্মার্টফোন যুগ হয়তো এর শেষ সীমায় এসে পৌঁছেছে। তাঁদের মতে, ভবিষ্যতের প্রযুক্তি আর ফোনের পর্দায় বন্দী থাকবে না। অন্যদিকে অ্যাপলের প্রধান নির্বাহী টিম কুক এ ধারণার সঙ্গে একমত নন। তাঁর বক্তব্য ঠিক বিপরীত। স্মার্টফোন হারিয়ে যাবে না, বরং এটি আরও রূপ বদলাবে, আরও শক্তিশালী হবে। নতুন যন্ত্রগুলোর পাশাপাশি টিকে থাকবে। এ লেখায় আমরা জানব, ঠিক কী বলছেন তাঁরা।
কেন স্মার্টফোনের ‘শেষ’ দেখছেন মাস্ক, গেটস ও জাকারবার্গ
এই তিনজনের কাজ, কোম্পানি ও লক্ষ্য একেবারেই আলাদা। তবু একটি জায়গায় তাঁরা প্রায় একমত—স্মার্টফোন ব্যক্তিগত প্রযুক্তির শেষ কথা নয়। ইতিহাস অন্তত সে কথাই বলে। প্রথম স্মার্টফোন হিসেবে ধরা হয় আইবিএম সাইমনকে, যা বাজারে আসে ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে। মানে প্রায় ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে আমরা একই ধরনের যন্ত্রের সঙ্গে বাস করছি। প্রযুক্তির ইতিহাসে প্রায়ই দেখা যায়, কোনো একটি ডিভাইস দীর্ঘদিন আধিপত্য বিস্তার করলে তার জায়গা নিতে শুরু করে নতুন কোনো প্ল্যাটফর্ম। তবে এই নতুন প্ল্যাটফর্মটা ঠিক কেমন হবে, সে বিষয়ে তিনজনের কল্পনা তিন রকম।
ইলন মাস্ক যা ভাবছেন
ইলন মাস্ক সবচেয়ে বৈপ্লবিক ধারণাটা সামনে আনছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠান নিউরালিংক কাজ করছে ব্রেন–কম্পিউটার ইন্টারফেস নিয়ে। এই প্রযুক্তিতে মানুষের মস্তিষ্ক সরাসরি কম্পিউটারের সঙ্গে যুক্ত হবে। মস্তিষ্কই হবে কম্পিউটার। বর্তমানে এই প্রযুক্তি পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে গুরুতর শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থাকা মানুষের জন্য। যেন তাঁরা চিন্তার মাধ্যমে মাউসের কার্সর নড়াতে পারেন বা যন্ত্র নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। কিন্তু মাস্ক বহুবার ইঙ্গিত দিয়েছেন, ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি সাধারণ মানুষের কাছেও পৌঁছাতে পারে।
তখন হয়তো মেসেজ পাঠাতে তোমাকে আঙুল দিয়ে বা ভয়েস টাইপ করতে হবে না। শুধু চিন্তা করলেই হবে। তোমাকে স্ক্রল করতে হবে না। চোখ বা চিন্তা করাই যথেষ্ট। ঘরের যন্ত্র চালু হবে মনে মনে নির্দেশ দিলেই। এই প্রশ্নই মাস্ক সামনে এনেছেন। যদি মস্তিষ্ক সরাসরি যন্ত্রের সঙ্গে কথা বলতে পারে, তাহলে আলাদা করে ফোনের দরকারটাই–বা কী?
বিল গেটসের ধারণা
বিল গেটস এখন আর সরাসরি প্রযুক্তি নির্মাতা নন। তিনি বিনিয়োগকারী ও দাতব্যকর্মী হিসেবে বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন স্বাস্থ্য ও মানবদেহকেন্দ্রিক প্রযুক্তিতে। তিনি এমন গবেষণায় সমর্থন দিচ্ছেন, যেখানে ত্বকের ওপর লাগানো যায় এমন ডিজিটাল ট্যাটু বা অতিপাতলা সেন্সর ব্যবহারের কথা ভাবা হচ্ছে। এ ধরনের সেন্সর তাত্ত্বিকভাবে মানুষের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। পরিচয়পত্র হিসেবে কাজ করতে পারে। তারবিহীন তথ্য আদান-প্রদানও করতে পারে। মানে ফোন থাকবে সরাসরি শরীরের ওপর। এই ভবিষ্যৎ কল্পনায় ফোন আর হাতে ধরে রাখা বস্তু নয়, বরং প্রযুক্তি থাকবে সরাসরি শরীরের সঙ্গে। যদিও ব্যাটারি, গোপনীয়তা ও দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার মতো বড় প্রশ্নগুলোর এখনো সঠিক উত্তর পাওয়া যায়নি।
মার্ক জাকারবার্গের চোখে ভবিষ্যৎ
মেটার প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গের বিশ্বাস, ভবিষ্যতের স্ক্রিন থাকবে চোখের সামনে। অগমেন্টেড রিয়ালিটি চশমার মাধ্যমে। এই চশমায় বাস্তব জগতের ওপর ভেসে উঠবে ডিজিটাল তথ্য। রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতেই স্ক্রিনে সব দেখা যাবে। কারও সঙ্গে কথা বলার সময় তার নাম বা প্রয়োজনীয় তথ্য চোখের সামনে ভেসে উঠবে। বিদেশে গিয়ে লেখা দেখলেই তা অনুবাদ হয়ে যাবে। এসব করতে আর পকেট থেকে ফোন বের করতে হবে না। জাকারবার্গের কাছে এটি শুধু প্রযুক্তির পরিবর্তন নয়, এটি অ্যাপল ও গুগলের ফোননির্ভর ইকোসিস্টেম থেকে বেরিয়ে নিজস্ব হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যারের জগত গড়ে তোলার কৌশল।
টিম কুকের ভিন্নমত
তিন প্রযুক্তি বিলিয়নিয়ারের ভবিষ্যৎ কল্পনার বিপরীতে টিম কুক বলছেন, স্মার্টফোনে গুরুত্ব এখনো শেষ হয়নি। বরং এটি আরও কেন্দ্রে চলে আসছে। অ্যাপলের আয়ের বড় অংশ এখনো আইফোন থেকেই আসে। কিন্তু কুকের যুক্তি শুধু ব্যবসার দিক দিয়ে নয়। অ্যাপলের কৌশল হলো নতুন প্রযুক্তিকে ধীরে ধীরে ফোনের ভেতরেই একীভূত করা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে ছবি ও ভিডিও উন্নত করা, ফোনেই অনুবাদ ও নিরাপত্তা বিশ্লেষণ চালানো, এমনকি স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য পর্যবেক্ষণ—সবই হচ্ছে স্মার্টফোনকে কেন্দ্র করে। অ্যাপল ওয়াচ, এয়ারপডস বা ভবিষ্যতের এআর চশমা—সব ডিভাইসই আইফোনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কাজ করবে। ফোন থাকবে কেন্দ্র হিসেবে। অন্যগুলো হবে এর সহযোগী।
ভবিষ্যতে কি মানুষ একটাই যন্ত্র ব্যবহার করবে, নাকি অনেকগুলো একসঙ্গে? এই বিতর্কের মধ্যে একটি প্রশ্ন খুব জরুরি। মানুষ কি হঠাৎ পরিচিত ও প্রিয় যন্ত্রটি ব্যবহার করা ছেড়ে দেবে, নাকি ধীরে ধীরে নতুন ডিভাইসগুলোর সঙ্গে মানিয়ে নেবে? টিম কুক বিশ্বাস করেন দ্বিতীয়টায়। তাঁর মতে, সামনে এমন এক সময় আসবে, যখন ফোন, ঘড়ি, ইয়ারফোন আর চশমা—সবাই মিলে একসঙ্গে কাজ করবে। কেউ একা সব দায়িত্ব নেবে না।
সূত্র: ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস ও রয়টার্স