মহাবিশ্বের আর কোথাও কেন পৃথিবীর মতো আগুন নেই
আগুন আমাদের অনেক পুরোনো সঙ্গী। মানবসভ্যতার ইতিহাসটাই বদলে দিয়েছে এই আগুন। আদিম মানুষেরা আগুন দিয়ে হিংস্র প্রাণী তাড়াত, খাবার ঝলসাত, আবার আগুনের চারপাশে গোল হয়ে বসে গল্প করত। এখনো আমাদের দৈনন্দিন জীবনে আগুন ছাড়া চলে না। কারখানার বিশাল চুল্লি বলো আর জন্মদিনের কেকের ওপর ছোট্ট মোমবাতি; আগুন সবখানেই লাগে।
আগুন দেখতে খুব পরিচিত, তাই না? কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছ, এই আগুন জিনিসটা আসলে কী? এটা কি কঠিন কিছু? নাকি তরল? নাকি গ্যাসীয়? এসো, উত্তরটা খোঁজার চেষ্টা করি।
প্রথম প্রশ্ন হলো, আগুন জ্বালাতে কী লাগে? মূলত আগুন জ্বালাতে তিনটি জিনিস দরকার হয়। জ্বালানি, অক্সিজেন ও তাপ। জ্বালানি মানে কাঠ, তেল বা গ্যাস। অক্সিজেন থাকে বাতাসের মধ্যে। আর তাপ মানে স্ফুলিঙ্গ। অর্থাৎ বিক্রিয়া শুরু করার প্রক্রিয়া।
এর যেকোনো একটা সরিয়ে নিলেই আগুন নিভে যাবে। যেমন আগুনের ওপর পানি ঢাললে তাপ কমে যায়। আবার পানি বাষ্প হয়ে আগুনের চারপাশে একটা আস্তরণ তৈরি করে। ফলে অক্সিজেন আর ঢুকতে পারে না। তখন আগুন নিভে যায়!
আর আগুন থেকে আমরা তাপ পাই। সঙ্গে পাই কার্বন ডাই-অক্সাইড ও জলীয় বাষ্প। কিন্তু আমরা আগুনের যে হলুদ বা কমলা রঙের শিখা দেখি, ওটা হলো ঝুল। মানে আধাপোড়া কার্বনের খুব ছোট ছোট কণা। প্রচণ্ড তাপে এই কণাগুলো জ্বলজ্বল করতে থাকে বলে আমরা আগুনের ওই রং দেখি। শিখার ওপরের দিকে এই কণাগুলো যখন ঠান্ডা হয়ে যায়, তখন আর আলো দেয় না। কিন্তু সেখানেও অদৃশ্য ইনফ্রারেড আলো থাকে, যা আমরা খালি চোখে দেখি না।
তাহলে প্রশ্ন আসে, আগুন কি কোনো পদার্থ? এটা নিশ্চয়ই কঠিন বা তরল পদার্থ নয়। আগুনের মধ্যে গ্যাস থাকে ঠিকই, কিন্তু আগুন নিজে গ্যাস নয়। কারণ, গ্যাসকে তুমি বোতলে ভরে রাখতে পারো, কিন্তু আগুনের শিখাকে কি বোতলে ভরে রাখা যায়? আগুন ততক্ষণই থাকে যতক্ষণ জ্বলতে থাকে।
তাহলে কি এটা প্লাজমা? প্লাজমা হলো পদার্থের চতুর্থ অবস্থা। সূর্য বা অন্যান্য নক্ষত্র প্লাজমা দিয়ে তৈরি। সেখানে এত তাপ থাকে যে অণু-পরমাণুগুলো ভেঙে আয়ন হয়ে যায়। আগুনের সবচেয়ে উত্তপ্ত অংশে হয়তো সামান্য কিছু প্লাজমা তৈরি হতে পারে, কিন্তু সাধারণ আগুন মোটেও প্লাজমা নয়। প্লাজমা চুম্বকের টানে নড়েচড়ে, কিন্তু মোমবাতির আগুন তা করে না।
তাহলে আগুন আসলে কী? আসলে আগুন কোনো পদার্থ বা বস্তু নয়। আগুন হলো একটা প্রক্রিয়া বা প্রসেস। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে দহন। এটি একটি রাসায়নিক বিক্রিয়া। জ্বালানি আর অক্সিজেনের মধ্যে যখন এই বিক্রিয়া চলে, তখন যে শক্তি, আলো ও তাপ বেরিয়ে আসে, সেটাকেই আমরা আগুন হিসেবে দেখি। অর্থাৎ আগুন কোনো জিনিস নয়, এটা একটা ঘটনা।
পুরো মহাবিশ্ব গ্যাস আর প্লাজমায় ভর্তি। নক্ষত্ররা দাউ দাউ করে জ্বলছে। কিন্তু আমরা পৃথিবীতে যে আগুন দেখি, অর্থাৎ অক্সিজেনের সাহায্যে জ্বলা শিখা; তা সম্ভবত পুরো মহাবিশ্বে একমাত্র পৃথিবীতেই আছে!
কারণ, আগুন জ্বলার জন্য চাই প্রচুর অক্সিজেন। আর এই অক্সিজেন আসে প্রাণ বা উদ্ভিদ থেকে। যেহেতু এখন পর্যন্ত শুধু পৃথিবীতেই প্রাণের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে, তাই আগুনের দেখা শুধু এখানেই মেলে। মহাবিশ্বের বাকি সব আলো আর তাপ মূলত প্লাজমা বা নিউক্লিয়ার বিক্রিয়া, আমাদের পরিচিত আগুন নয়।
বুঝতে পারছ আগুন কতটা বিরল জিনিস। পৃথিবীতে এটি সাধারণ হলেও মহাবিশ্বের আর কোথাও হয়তো আগুন পাওয়া যায় না!
সূত্র: সায়েন্স অ্যালার্ট